ঘরে পা দিতেই পাপিয়া বলল, বসুন ৷
আমি বসলাম ৷ পাপিয়া দরজা ভেজিয়ে দিল ৷ তারপর বলল, কেন ডেকেছি বুঝতে পারছেন?
বললাম, ওই যে কী একটা দেখাবে বললে ৷
ছাই দেখাব ৷— বলে আঙুল দিয়ে বালিশের ওপর দাগ কাটতে লাগল ৷ আমি বেশ অসহায় বোধ করলাম ৷ ঠিক এইভাবে এত রাতে অনাত্মীয়া কোনো যুবতী মেয়ের সঙ্গে দরজা বন্ধ করে কথা বলতে আমি অভ্যস্ত নই ৷ নিজের চঞ্চলতা ঢাকার জন্যে পাশবালিশটা কোলের ওপর টেনে নিলাম ৷
আমি চুপ করে রইলাম ৷ মনের উত্তেজনা বাড়তে লাগল ৷
পাপিয়া বলল, আমার কথাগুলো শুনে আপনি যদি আমাকে একটা খারাপ মেয়ে ভাবেন— তাহলে দোষ দেওয়ার মতো কিছু নেই ৷ কিন্তু অনেক ভেবে দেখলাম— আপনি ছাড়া আমার কোনো গতি নেই ৷ কথা দিন— আমাকে সাহায্য করবেন ৷
ভেতরে-ভেতরে আমি ঘামতে শুরু করলাম ৷ তবুও যথাসম্ভব শান্ত কণ্ঠে বললাম, আগে সব কথা খুলে বলো ৷
আপনি বাবাকে বলে আমার আর চন্দনের বিয়ের ব্যবস্থা করে দিন ৷
পাপিয়ার স্পষ্ট কথায় একটু চমকে উঠেছিলাম ৷ কিন্তু ব্যাপারটা জানা ছিল বলে বেশ স্বাভাবিকভাবেই বললাম, বেশ তো— তার জন্যে এত তাড়া কেন? ধীরে-সুস্থে একদিন বললেই হবে ৷
না— আর দেরি করা যায় না ৷
কেন? দেরি করা যায় না কেন! আগে তোমার দিদির বিয়ে হোক— তারপর তো— ৷
দিদির কথা জানি না ৷ কিন্তু আমার এখুনি বিয়ে হওয়া উচিত ৷
মনের মধ্যে একটা ছোট্ট সন্দেহ দানা বেঁধে উঠল ৷ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পাপিয়ার দেহটা দেখতে লাগলাম ৷
পাপিয়া মাথা নিচু করল ৷ বলল, হ্যাঁ, আপনি ঠিকই বুঝেছেন— আমি মা হতে চলেছি ৷
বালিশ ফেলে দিয়ে তড়িদাহতের মতো উঠে দাঁড়িয়েছিলাম : কী বলছ তুমি পাপিয়া?
আপনি আমাকে বাঁচান, সুদীপ্তদা ৷
চন্দন জানে?
হ্যাঁ ৷
কী বলছে ও?
ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে চায় ৷
স্কাউন্ড্রেল ৷
একটা তীব্র ঘৃণায় সারা দেহটা রি-রি করে উঠল আমার ৷ ভাবতে লজ্জা হল— চন্দন আমারই ঘনিষ্ঠ বন্ধু ৷ পাপিয়াকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্যে বললাম, তুমি কিছু ভেবো না পাপিয়া, আমি এখুনি চন্দনকে ডেকে সব বুঝিয়ে বলছি ৷
ঠিক সেই মুহূর্তে দরজা খুলে চন্দন ঘরে ঢুকল ৷
আমাকে বুঝিয়ে বলার কিছু নেই সুদীপ্ত ৷ পাপিয়া যদি আমার কথা শুনত— তাহলে এসব কিছুই হত না ৷ আমি ওকে অনেক বলেছি— ডাক্তার সরকার আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু— কাকপক্ষীতেও টের পাবে না ৷
পাপিয়া গর্জে উঠল, থাক— তোমাকে আর বীরত্ব দেখাতে হবে না ৷ যদি ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারতাম যে, শুধুমাত্র ক্ষণিক আনন্দের জন্যে তুমি— ৷
আর বলতে পারল না পাপিয়া— ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল ৷
চন্দন আমাকে বলল, তুই নীচে যা, সুদীপ্ত— আমি ওকে একটু বোঝানোর চেষ্টা করি ৷
চন্দনের দিকে অপলক তাকিয়ে বারান্দায় পা দিলাম আমি ৷ ওদের ব্যাপার— ওদের মধ্যে বোঝাপড়া হওয়াই ভালো ৷ কয়েক পা এগিয়েছি, চন্দনের কণ্ঠস্বর কানে এল, কেন তুমি সুদীপ্তকে এ-কথা বললে?
আর দাঁড়ালাম না ৷ হনহন করে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামতে লাগলাম ৷ সিঁড়ির মুখে তোমার সঙ্গে দেখা ৷ তুমি মুখ ঘুরিয়ে নিলে ৷ আমি চলে এলাম ৷
.
পরের দিন সকালে চন্দন এসে খবর দিল— পাপিয়া আত্মহত্যা করেছে ৷ চমকে উঠলাম খবরটা শুনে ৷ কয়েক মিনিট আমি কোনো কথা বলতে পারিনি ৷ ঘৃণিত দৃষ্টিতে চন্দনের দিকে তাকিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিলাম ৷
চন্দন বলল, নিজেকে বড্ড অপরাধী মনে হচ্ছে, সুদীপ্ত ৷ কিন্তু পাপিয়া যে এতখানি ছেলেমানুষি করে ফেলবে ভাবতেও পারিনি ৷
গম্ভীর গলায় বললাম, পাপিয়ার আত্মহত্যাকে তাহলে তুমি নিছক একটা ছেলেমানুষি ভাবছ?
তা ছাড়া আর কী ভাবব বলো ৷ ওর মতো বুদ্ধিমতী মেয়ে— এভাবে হঠাৎ— ৷
আরও অনেক কথা বলেছিল চন্দন ৷ কিন্তু সেসব শোনার মতো মনের অবস্থা আমার ছিল না ৷ চন্দনের সঙ্গে তোমাদের বাড়িতে যখন এসে পৌঁছলাম— তখন পুলিশ এসে পড়েছে ৷ তোমার বাবা পাথর হয়ে একটা সোফায় বসে আছেন ৷ চারিদিকে এক নিদারুণ স্তব্ধতা ৷
পুলিশ গতানুগতিক পদ্ধতিতে সবাইকে কিছু-কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করে পাপিয়ার দেহ নিয়ে চলে গেল শবব্যবচ্ছেদের জন্যে ৷
সকলে জানল— পাপিয়া আত্মহত্যা করেছে ৷ চন্দনের কাছেই শুনলাম, তোমার ধারণা পাপিয়ার আত্মহত্যার জন্যে পরোক্ষভাবে আমিই দায়ী ৷ আমিই নাকি তাকে অকাল মাতৃত্বদানে কলঙ্কিত করেছি ৷ আমাদের এতদিনের মেলামেশা— এত ভালোবাসার পর তুমি যে আমার সম্বন্ধে এরকম একটা বিশ্রী ধারণা করে বসবে বিশ্বাস করতে পারিনি ৷ তাই সেই মুহূর্তেই ছুটে এসেছিলাম তোমার কাছে ৷ সেদিনও তোমাদের বাইরের ঘরের দরজাটা বন্ধ ছিল ৷ মনের মধ্যে তীব্র একটা উত্তেজনা নিয়ে কলিংবেল বাজিয়েছিলাম ৷ তুমি এসে দরজা খুলে দাঁড়িয়েছিলে ৷
তোমাকে দেখে একরাশ আশা নিয়ে কথা শুরু করলাম, এই যে, শিউলি— শুনলাম তুমি নাকি চন্দনের কাছে বলেছ— ৷
আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই তুমি রূঢ়ভাবে বলেছিলে, তোমার সঙ্গে আমার কোনো কথা নেই ৷ বলে সশব্দে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল ৷
দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দে কয়েক সেকেন্ডের জন্যে আমার হৃৎপিণ্ড বুঝি স্তব্ধ হয়ে গেছিল ৷ চোখের সামনে থেকে তোমাদের বাড়িটা মুছে গিয়ে একরাশ গাঢ় অন্ধকার জমা হয়ে গেছিল ৷ কয়েক সেকেন্ড মাত্র ৷ তারপর পা চালালাম মেসের উদ্দেশে ৷ তোমাদের বাড়ির দরজা থেকে আমার মেস— পাঁচ মিনিটের পথও নয়— কিন্তু মনে হয়েছিল ওইটুকু পথ পেরোতে আমার বেশ কয়েক বছর সময় লেগে গেল ৷
