আপনি ভীষণ অসভ্য! পরের চিঠি দেখতে আছে বুঝি?
ঠিক সেই মুহূর্তে তোমার আবির্ভাব হয়েছিল ঘরের মধ্যে ৷ সেদিন বুঝিনি— কিন্তু আজ বুঝতে পারি— আমাদের ওভাবে দেখে তোমার মনে একটা নোংরা সন্দেহ উঁকি দিয়েছিল ৷ সন্দেহের সঙ্গে ছিল ঈর্ষা ৷ তাই অস্বাভাবিক গম্ভীর গলায় বলেছিলে, পাপিয়া— আজ লেখাপড়া নেই?
আছে তো ৷ দেখ না দিদি— সুদীপ্তদা আমার চিঠি দিচ্ছে না ৷
সুদীপ্ত, চিঠিখানা দিয়ে দাও পাপিয়াকে ৷
সেদিন তোমার এই আদেশকে আমি খুব স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছিলাম ৷ তাই চিঠিটা ফেরত দিতে-দিতে বলেছিলাম, নেহাত তোমার দিদির আদেশ— তাই দিলাম— নইলে না-পড়ে কিছুতেই দিতাম না ৷
পাপিয়া এক হাতে বুকের কাপড় ঠিক করতে করতে অপর হাত দিয়ে খামখানা আমার হাত থেকে নিল ৷
তুমি আবার বললে, পাপিয়া— যাও— গিয়ে পড়াশুনো করো ৷
পাপিয়া তোমার দিকে অপলক তাকিয়ে ঘর থেকে চলে গেল ৷ বোধহয় তোমার কণ্ঠস্বরের অস্বাভাবিক রূঢ়তায় সে চমকে উঠেছিল ৷
পাপিয়া চলে যেতে আমি চেয়ার থেকে উঠে এসে বলেছিলাম, কোথায় গিয়েছিলে? আমি এদিকে সন্ধে থেকে এখানে বসে আছি ৷
সন্ধে থেকে এসে বসে আছ?
সন্ধে থেকেই তো! পাপিয়াকে জিগ্যেস করে দ্যাখো ৷
থাক— আর জিগ্যেস করতে লাগবে না ৷ তোমাকে দেখেই বুঝতে পারছি ৷
আমি একটু হেসে বলেছিলাম, জানো—কাল তোমার বাবাকে বলেছিলাম— ৷
তুমি উত্তর দিলে, পরে শুনব’খন, সুদীপ্ত— আজ আমি বড় টায়ার্ড ৷
আমি আর তোমাকে জোর করিনি ৷ সেদিন যদি ঘুণাক্ষরেও অনুমান করতে পারতাম যে, ওটা তোমার ক্লান্তি নয়— সন্দেহ—তাহলে হয়তো তোমাকে আমি বোঝাবার চেষ্টা করতাম ৷ কিন্তু সেটুকু অনুমান করার মতো সুযোগ তুমি আমাকে দাওনি ৷ তাই তোমাকে বিশ্রাম করবার অবকাশ দিয়ে আমি চলে এসেছিলাম ৷
এই ঘটনার পর বেশ কয়েকটা দিন কেটে গেল ৷ আপতদৃষ্টিতে তুমি আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিলে ৷ লেকে বেড়াতে-বেড়াতে তুমি বলেছিলে, জানো— আমার ভারী ভালো লাগে ভাবতে— বেশ সুন্দর একটা এল-শেপের বাড়ি হবে ৷ সামনে থাকবে ছোট একটা গেট ৷ গেটের ওপর থাকবে মাধবীলতা ৷ সেখান থেকে লাল সুরকি ঢালা রাস্তাটা সোজা চলে যাবে বাড়িটার পায়ের কাছে ৷ রাস্তার দু-দিকে থাকবে ফুলের বাগিচা ৷ একদিকে সাদা, আর একদিকে রঙিন ফুলের মেলা৷ গেটের কাছে একটা লেটার বক্স ৷ সবুজ রঙের ৷ তার ওপর হলুদ রঙে ঠিকানা লেখা থাকবে ৷
সেদিনই মনে-মনে ঠিক করে ফেলেছিলাম, পরীক্ষাটা হয়ে গেলে তোমার মনের মতো করে একখানা বাড়ি তৈরি করব ৷ উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া কিছু টাকা আমার ছিল ৷ সেই টাকা দিয়ে তোমার স্বপ্ন আমি সফল করে তুলব ৷ কিন্তু তুমি তখন সন্দেহের দোলায় দুলছ ৷ ঈর্ষার জ্বালায় জ্বলছ ৷ পাপিয়া আর আমাকে একসঙ্গে দেখলেই তোমার চোখদুটো জ্বলে উঠত ৷
তারপর একদিন সেই ভয়ঙ্কর দিনটা এগিয়ে এল ৷ মনে আছে, কী-একটা উপলক্ষে সেদিন আমাদের সবাইয়ের নেমন্তন্ন ছিল তোমাদের বাড়িতে ৷ হইহই করে আমরা সন্ধ্যার মধেই এসে পড়েছিলাম ৷ তোমার আবৃত্তি, পাপিয়ার গান আসরটাকে বেশ জমিয়ে রেখেছিল ৷ তারপর খাওয়ার সময় এল ৷ আমরা চার বন্ধু একসঙ্গে খেতে বসেছিলাম ৷
চন্দন তোমাকে বলেছিল, আপনারাও আমাদের সঙ্গে বসে পড়ুন ৷ মিথ্যে রাত বাড়িয়ে লাভ কী ৷
তুমি উত্তর দিয়েছিলে, মেয়েদের এখন খেতে নেই ৷ সবাইকে খাইয়ে তারপর খেতে হয় ৷
চন্দন বলল, আপনি দেখছি এখনও সেই পুরাকালে পড়ে আছেন ৷
তুমি হেসে জবাব দিলে, ভুলে যাবেন না, খাওয়ার ব্যাপারটা সেই পুরাকালেও ছিল ৷
অস্বীকার করছি না ৷ তবে পুরাকালে তো অনেক কিছুই ছিল, তার সবগুলোই কি আপনি মানেন?
তুমি ঈষৎ কটাক্ষে বলেছিলে, যেমন?
পুরাকালে তো মেয়েরা পরপুরুষের সঙ্গে কথা বলত না ৷
সেটা মানতে পারলে ভালোই হত দেখছি— তাহলে এভাবে ঝগড়া করতে হত না ৷
আমরা সকলে হেসে উঠলাম ৷ চন্দন বলল, তাহলে হার স্বীকার করলেন তো?
এখনও করিনি ৷ ঝগড়াটা মুলতুবি রইল ৷ পরে একদিন বোঝাপড়া করা যাবে’খন ৷
তোমার নিশ্চয় মনে আছে, আর আমার তো চিরকাল মনে থাকবে, সেদিন তুমি আমার সঙ্গে একটা কথাও বলোনি ৷ ইচ্ছে করেই বলোনি ৷ নিজেকে জোর করে কাজের মধ্যে ব্যস্ত রেখেছিলে ৷ এমনকী, পরিবেশন করার সময় একবারও মুখ ফুটে জিগ্যেস করোনি, আমার কোনওকিছুর প্রয়োজন আছে কিনা ৷ ব্যাপারটা সকলেরই চোখে পড়েছিল ৷ পরের দিন পাপিয়ার মৃত্যুর খবরটা দিতে এসে চন্দনও আমাকে বলেছিল ৷ আর সেইজন্যেই আমার সঙ্গে তোমার কথা-না-বলাটা আরও বেদনাদায়ক হয়ে উঠেছিল আমার কাছে ৷
পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠতে বেশ দেরি হয়েছিল ৷ আর ঘুম ভাঙার পর তোমার কথাই প্রথম মনে পড়েছিল ৷ এরকম প্রায়ই হয় আমার ৷ ঘুম ভাঙার পরেও যখন বিছানায় পড়ে থাকি— তখন শুধু তোমার কথাই মনে হয় ৷ সেদিনও হয়েছিল ৷ আগের রাত্রে তোমার কথা-না-বলা থমথমে মুখখানা বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল ৷
আগের রাতে খাওয়ার শেষে যখন পাপিয়া আমায় ডাকল, সুদীপ্তদা— আসুন, আপনাকে একটা জিনিস দেখাব ৷ তখন মুহূর্তের জন্যে তোমার চোখদুটো জ্বলে উঠেছিল ৷ আমিনা-দেখার ভান করে পাপিয়ার সঙ্গে ওর ঘরে গিয়েছিলাম ৷ তোমরা দু-বোন একই ঘরে শুতে ৷ দেখেছিলাম খুব সুন্দর সাজানো-গোছানো মেয়েলি ঘর একখানা ৷ আর ঢুকতেই নাকে একটা অপরিচিত গন্ধ এসে লেগেছিল ৷ হতে পারে ওটা তোমাদের চুলের গন্ধ, হতে পারে ওটা পুরোনো কোনো সেন্টের গন্ধ ৷ এমনকী শুকনো ফুলের গন্ধ হলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই ৷
