সেদিন আর পড়া হল না ৷ নিস্তব্ধতার মধ্যে বেশ কিছুটা সময় কাটিয়ে আমি চলে এলাম ৷ এর আগে বহুদিন আমি রাত্রে ঘুমোতে পারিনি, কিন্তু সেদিন না ঘুমোতে পারার মধ্যে এক স্বর্গীয় আনন্দ উপভোগ করেছিলাম ৷ মনে হয়েছিল, এ-জীবনে বেঁচে থাকার একটা অর্থ আছে, একটা আনন্দ আছে ৷ একজন নারীর কাছে নিজেকে উজাড় করে দেওয়ার মধ্যে যে এত সুখ আছে, তা কে জানত!
তারপর থেকে তোমাদের বাড়িতে আমার যাওয়াটা খুব স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে গেল ৷ তোমার বাবা ভাবলেন, আমি বুঝি পড়াশোনায় অধিক মনোযোগী হয়েছি ৷ কিন্তু তোমার মুখে সবসময় একটা দুষ্টু হাসি খেলা করত ৷ সকলের চোখ এড়িয়ে তুমি ইশারায় আমাকে একটু বেশিক্ষণ থাকতে বলতে ৷ আমি যখন রসিকতা করে তোমার সঙ্গে আমার বর্তমান সম্পর্কের কথা বলতাম, তুমি কটাক্ষ করে আমাকে শাসন করার ভঙ্গি করতে— আমার খুব ভালো লাগত ৷ ভালো লাগত, বোধহয় তুমি বলেই ৷
এমনিভাবে আমরা আরও কিছু এগোলাম ৷ বাড়ির সীমানার বাইরেও আমাদের দেখা হতে লাগল ৷ কোনোদিন হেদুয়া, কোনোদিন কলেজ স্কোয়ার, কোনোদিন বা আরও একটু দূরে— বালিগঞ্জ লেকে ৷ মাঝে একদিন তোমার সঙ্গে তোমার বোন পাপিয়াও এসেছিল ৷ পাপিয়াকে আমার খুব ভালো লাগত ৷ অমন বোন যদি আমার একটা থাকত! পাপিয়া মাঝে-মাঝে তোমার সামনে আমাকে ‘জামাইবাবু’ বলে সম্বোধন করত ৷ তুমি নকল রাগে তার চুল টেনে দিতে ৷
একদিন তুমি বলেছিলে, সুদীপ্ত, এভাবে আর থাকতে পারছি না ৷ একটা কিছু করা দরকার ৷
আমি বুঝতে না পেরে বলেছিলাম, কীসের কী করা দরকার?
অসভ্য! যেন জানে না!
সত্যি বলছি বুঝতে পারছি না ৷
জানি— তার মানে আমার মুখ থেকে কথাটা শুনতে চাও ৷ বেশ বাবা— তাই বলছি ৷ —বলে তুমি আনমনে ঘাসের শিষ চিবোতে লাগলে ৷ সেদিনের আবহাওয়াটা ভারী সুন্দর ছিল ৷ সকাল থেকেই দিনটা মেঘলা ৷ দুপুরের দিকে একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে ৷ বিকেলে কিছুক্ষণের জন্যে সূর্যের মুখও দেখা গেছিল ৷ আকাশে নীল মেঘের খেলা ৷ বালিগঞ্জ লেকটাকে সেদিন সুন্দরী তরুণীর মতো মনে হচ্ছিল ৷
আমি বললাম, কই— বলো ৷
তুমি আধো-আধো স্বরে বললে, এভাবে আর তোমার অপেক্ষায় বসে থাকতে ভালো লাগে না ৷ কখন তুমি আসবে আর আমি সারাদিন ধরে ঘড়ির কাঁটা দেখতে-দেখতে পাগল হয়ে যাই ৷ দুপুরটাকে কী বড় লাগে!
.
আমি কী করব বলো ৷ তবুও তো এখন আমি পড়াশোনার নামে রোজই যাই ৷ আগে যে সপ্তাহে দু-তিনদিন যেতাম— তখন ভালো লাগত কী করে?
আহা— তখন আমি এসব ভাবতাম! তখন তো তুমি শুধু বাবার ছাত্র ছিলে ৷
আর এখন?
এখন— আমারও ছাত্র হয়েছ ৷
তাহলে আমাকে কী করতে হবে আদেশ করুন, মাস্টারমশাই ৷
তোমাকে যাতে সবসময় দেখতে পাই— সেই ব্যবস্থা করো ৷
অর্থাৎ?
তুমি বাবার কাছে যাও ৷
সেদিনই রাত্রে তোমার বাবাকে আমি সব কথা খুলে বলেছিলাম ৷ বলেছিলাম, আপনার জ্যেষ্ঠা কন্যাটিকে আমি চাই ৷ তোমার বাবা আপত্তি করেননি ৷ বলেছিলেন, বেশ তো— তার জন্যে এত তাড়া কীসের! পরীক্ষা হয়ে যাক— তারপর একদিন এ-বিষয়ে আলোচনা করা যাবে’খন ৷
কিন্তু সেই সুযোগ আর এল না ৷ একটা মৃত্যুকে কেন্দ্র করে তুমি আমাকে দূরে সরিয়ে দিলে ৷ একবার জিগ্যেস করবার প্রয়োজনও অনুভব করলে না ৷ তুমি হয়তো জানতে না যে, তোমার বোন পাপিয়ার সঙ্গে চন্দন সোমের ঘনিষ্ঠতা অনেক দূর পর্যন্ত এগিয়েছিল ৷ পড়াশোনার ফাঁকে-ফাঁকে আমরা যেমন একসঙ্গে থাকবার সুযোগ খুঁজতাম— ওরাও তাই করত ৷ কিন্তু নিজেদের নিয়ে আমরা বড় বেশি ব্যস্ত ছিলাম বলে ওদের ঘনিষ্ঠতা আমাদের চোখে পড়েনি ৷ চোখে না পড়লেও পাপিয়া চন্দন সোমকে ভালোবাসত, ভালোবাসত গভীরভাবেই ৷
তোমার হয়তো ব্যাপারটা বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে ৷ গোড়া থেকেই বলি ৷ একদিন সন্ধ্যার সময় তোমাদের বাড়িতে গিয়ে দেখি, তুমি বাড়ি নেই ৷ পাপিয়া একটা চেয়ারে বসে ম্যাগাজিনের পাতা ওলটাচ্ছে ৷ আমায় দেখে একগাল হেসে বলল, বসুন, সুদীপ্তদা— দিদি একটু বেরিয়েছে ৷
কোথায় গেছে?
আসবে এখুনি ৷ বসুন না ৷
বসলাম ৷ অপেক্ষা করতে-করতে ক্রমে ধৈর্যহারা হয়ে পড়লাম ৷ পাপিয়া বুঝতে পেরে বলল, একটা গল্প বলুন, সুদীপ্তদা— গল্প বলতে-বলতে দিদি এসে যাবে নিশ্চয়ই ৷
একটা গল্প বলতে শুরু করলাম ৷ গল্প বলতে-বলতে হঠাৎ টেবিলের তলায় একটা খাম নজরে পড়ল ৷ নিচু হয়ে তুলে নিলাম ৷ পাপিয়া দেখতে পেয়ে তড়িৎগতিতে উঠে এল : ওটা আমার চিঠি— দিয়ে দিন, সুদীপ্তদা ৷
মজা করার জন্যে বললাম, দাঁড়াও— কে দিয়েছে দেখি ৷
ভালো হচ্ছে না কিন্তু— ওটা আমার পারসোনাল লেটার— আপনি পড়বেন না ৷
পারসোনাল লেটার! তাহলে তো একবার পড়ে দেখা দরকার ৷
পাপিয়া আমার হাত থেকে খামখানা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করল ৷ আমিও একবার এ-হাতে একবার ও-হাতে নিয়ে সেটাকে ঘোরাতে লাগলাম ৷
প্লিজ, সুদীপ্তদা— দিয়ে দিন ৷
কে লিখেছে বলো?
আগে দিন— তারপর বলছি ৷
উঁহু— অত বোকা আমি নই ৷ আগে বলো— তারপর দেব ৷
কথা বলতে-বলতেই ছোঁ মেরে আমার হাত থেকে খামখানা কেড়ে নিতে গেল পাপিয়া ৷ আমি সেই মুহূর্তে হাতটা পেছনদিকে সরিয়ে নিলাম ৷ টাল সামলাতে না পেরে পাপিয়া আমার বুকের ওপর পড়ে গেল ৷
পারলে না তো! — আমি হো-হো করে হেসে উঠলাম ৷
