তোমার নিশ্চয়ই মনে আছে— আমরা কয়েকজন ছাত্র তোমার বাবার কাছে পড়তে আসতাম ৷ তোমার বাবা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার ছিলেন ৷ আর আমরা একটা ডিগ্রির লোভে বারবার তোমার বাবার কাছে আসতাম ৷ তুমি বোধহয় তখন থার্ড-ইয়ারে পড়ছ ৷ আর তোমার বোন পাপিয়া সবে কলেজে ভরতি হল ৷
প্রথম দিনই তোমার বাবা তোমার সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিলেন ৷ বললেন, এটি হল আমার বড় মেয়ে, নাম শিউলি ৷ এর সঙ্গে আলাপ করে রাখো ৷ কারণ আমার লাইব্রেরির চাবি এর কাছেই থাকে ৷
কথাটা বলার ধরনে আমরা সবাই হেসে উঠেছিলাম ৷ আমরা মানে— আমি, চন্দন সোম, অনিরুদ্ধ চৌধুরী আর কৌশিক গুপ্ত ৷
চন্দন সোম অকস্মাৎ প্রশ্ন করে বসেছিল, আপনি কী খেতে ভালোবাসেন?
প্রশ্নটা তোমাকে করা হচ্ছে বুঝতে পেরেও তুমি একটু অবাক হওয়ার ভান করেছিলে ৷ চোখ দুটো একটু নাচিয়ে বলেছিলে, আমি?
চন্দন সোম বলেছিল, হ্যাঁ—আপনি ৷
তুমি বলেছিলে, কেন বলুন তো?
তাহলে রোজ সেই জিনিসটা নিয়ে আসব— আর আপনি আমাদের বেশি করে বই দেবেন ৷
ওভাবে আমি বই দিই না ৷ পড়াশুনোয় যার মনোযোগ বেশি, সে-ই বেশি বই পাবে ৷
তোমার বাবা হেসে বলেছিলেন, আমার মেয়েটি কিন্তু খুব কড়া ৷ বই নিয়ে খেলা করতে দেখলেই রেগে যাবে ৷
আরও দু-চারটে হালকা কথাবার্তার পর তোমার বাবা বললেন, এটাকে তোমরা নিজের বাড়ি বলেই মনে করো ৷ যখনই সময় পাবে চলে আসবে, আমার লাইব্রেরিতে বসে পড়াশুনো করবে ৷ কোনোরকম সঙ্কোচ কোরো না ৷
বলা বাহুল্য, প্রাথমিক আলাপে যে-সঙ্কোচ আমাদের ছিল—দু-চারদিনের মধ্যেই সেটা আমরা কাটিয়ে উঠেছিলাম ৷ আমাদের মধ্যে আমিই ছিলাম একটু লাজুক প্রকৃতির ৷ তাই বোধহয় তোমার দৃষ্টি আমার ওপর আগে পড়েছিল ৷ আরা আসতাম— কোনোদিন তোমার বাবা থাকতেন— কোনোদিন হয়তো থাকতেন না ৷ আমরা সোজা লাইব্রেরি-ঘরে চলে যেতাম ৷ তুমি কোমরে কাপড় গুঁজে সারা ঘরে দৌড়াদৌড়ি করে বেড়াতে ৷ এখানে এ-বইটা রাখা, ওখান থেকে সেই বইটা নামানো— শাড়ির আঁচল দিয়ে বইগুলো মুছে যথাস্থানে রাখা— আমরা বইয়ের পাতা খুলে পড়ার চেষ্টা করতাম— আর তার মাঝে লীলায়িত ভঙ্গিতে তুমি ঘুরে বেড়াতে ৷ ওদের কথা জানি না— আমি কিন্তু তোমার উপস্থিতিতে বইয়ের পাতায় মনঃসংযোগ করতে পারতাম না ৷ তোমার আলতা-রাঙানো পায়ের দিকে তাকিয়ে থাকতাম ৷
তোমাদের বাড়িতে একটা জিনিস লক্ষ করেছিলাম— তোমার মাকে কোনোদিন আমরা দেখিনি ৷ অথচ অনুভব করতে পারতাম— তিনি আছেন ৷ তোমার মাকে আমার খুব দেখতে ইচ্ছে করত ৷ তোমাদের যাওয়া-আসায় যখন দরজার ভারী পরদাটা একটু নড়ে উঠত, সেই ফাঁক দিয়ে আমি তোমার মাকে দেখতে চেষ্টা করতাম ৷ তুমি জানো— আমার মা খুব ছেলেবেলায় মারা গেছিলেন ৷ তাই বোধহয় মা সম্বন্ধে অত দুর্বলতা ৷
একদিন— মনে আছে— সন্ধ্যার সময় আমি তোমাদের বাড়িতে গিয়েছিলাম ৷ তারিখটাও আমার মনে আছে ৷ কলিংবেলের আওয়াজে দরজা খুলে দাঁড়িয়েছিলে তুমি ৷ আমার ভালোও লেগেছিল, আবার ভয়ও করছিল ৷ ভালো লেগেছিল কারণ ভালো লাগাটা ছিল স্বাভাবিক ৷ আমাদের মধ্যে কথাবার্তা বেশি না হলেও—তোমার সম্বন্ধে আমি কেমন যেন একটু দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম ৷ তোমাদের বাড়ি থেকে ফিরে এসে ঘরের আলোটা নিভিয়ে শুয়ে পড়তাম বটে, কিন্তু ঘুম আসত অনেক দেরিতে ৷ অন্ধকার ঘরের মধ্যে আমি যেন তোমাকে দেখতে পেতাম ৷ তুমি কথা বলছ, হাসছ— কিন্তু চোখ দুটি ব্যথা-মলিন ৷ মনে হয়, কী যেন তুমি বলতে চাও— অথচ বলতে পারছ না ৷ আমি মনে-মনে হাতড়ে মরতাম— কেন অমন সুন্দর চোখদুটি সবসময় ব্যথায় ভরে থাকে? বড্ড জানতে ইচ্ছে করত ৷ অথচ তোমাকে জিগ্যেস করতেও ভয় হত, লজ্জা করত ৷ আমার মনে হত— আমার দুঃখের সঙ্গে তোমার ব্যথাভরা-চোখের কোথায় যেন মিল আছে ৷ আর সেই মিল খুঁজতে গিয়ে কত রাত আমি না ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিয়েছি ৷
সেদিন সন্ধ্যায় তোমাদের বাড়িতে আমি একাই গিয়েছিলাম ৷ তুমি দরজা খুলে দাঁড়িয়েছিলে, আমাকে সামনে দেখতে পেয়ে বললে, ভেতরে আসুন ৷
আমি বললাম, স্যার— ৷
বাড়ি নেই ৷
তাহলে আমি বরং যাই ৷ পরে আসব’খন ৷
ওমা, চলে যাবেন কেন?— ভুরু দুটো একটু কাঁপিয়ে ঠোঁটের কোণে সূক্ষ্ম হাসির রেশ টেনে তুমি বলেছিলে, ভেতরে আসুন ৷
আমি ভেতরে এসেছিলাম ৷ বুকের ভেতরটা একটা অজানা আনন্দে থরথর করে কাঁপছিল ৷ তোমার কাছাকাছি এলেই ওটা হত ৷ তোমার নির্দেশমতো একটা চেয়ারে বসলাম ৷ তুমি বললে, আপনি এসেছেন ভালোই হয়েছে— একা-একা বোর হয়ে যাচ্ছিলাম ৷
একা-একা কেন?
বা রে—বাবা-মা-পাপিয়া— সব চলে গেল যে!
চলে গেল? কোথায়?
বালিগঞ্জে ৷ পিসিমার বাড়িতে ৷
ও—তাই বলো ৷ আনি ভাবলাম বুঝি— ৷
দাঁড়ান— চা তৈরি করে আমি ৷ চা খেতে-খেতে গল্প করা যাবে ৷
বলে তুমি চলে গেলে ৷ হঠাৎ মনটা আমার খুশিতে ভরে উঠল ৷ তোমাদের অত বড় বাড়ি ৷ অথচ তুমি-আমি ছাড়া কেউ নেই ৷ মনে-মনে এইরকমই একটা সুযোগ আমি যেন চেয়েছিলাম ৷ একা-একা তোমাকে অনেকগুলো কথা বলবার জন্যে মনের ভেতরটা ছটফট করতে লাগল ৷ অথচ ভয়ও করছিল ৷ যদি তুমি আমাকে ভুল বোঝো! আমার স্বাভাবিক চাওয়াকে যদি হ্যাংলামো ভাবো ৷ বলব কি বলব না— মনস্থির করতেই বেশ কিছুটা সময় কেটে গেল ৷ তুমি চা নিয়ে ঢুকলে ৷ এক পলক তাকিয়েই বুঝতে পারলাম, এই অবসরে তুমি মুখে একবার পাউডারের পাফটা বুলিয়ে নিয়েছ ৷ চোখে আর-একবার কাজলের সূক্ষ্ম রেখা টেনেছ ৷ বুঝতে পারলাম, আমার কাছে তুমি নিজেকে সুন্দরতর করে তোলার চেষ্টা করেছ ৷ সেই মুহূর্তে নিশ্চিত হলাম যে, আমার প্রতিধ্বনি তোমার হৃদয়েও বাজে ৷ যে-কথাগুলো এতক্ষণ মনের জোরে সংগ্রহ করছিলাম— সেই কথাগুলো খুব স্বাভাবিকভাবেই তোমাকে বলে ফেললাম ৷ লক্ষ করলাম, আমার কথা শুনতে-শুনতে বারবার তুমি ওপরের দাঁত দিয়ে নীচের ঠোঁটটা চেপে ধরলে, ভুরু দুটো কী এক চঞ্চলতায় থরথর করে কাঁপতে লাগল, চোখের দৃষ্টি আরও গভীর হল— তোমার দু-গালে সূর্যাস্তের রং ধরল ৷
