ভ্যান রিকশা ছেড়ে দেয় ৷ নীলপাড় সাদা শাড়ির নিরাপত্তারক্ষীদের পাশ কাটিয়ে এগোতে থাকে শহরের দিকে ৷ ভেঙে খানখান হয়ে যাওয়া স্বপ্নগুলোকে আবার নতুন করে বুনতে শেখায় শক্তি সংগ্রহ করতে ৷
তুমি জানো না – অমলেন্দু সামুই
তোমাকে আমি প্রায়ই চিঠি লিখি ৷ সপ্তাহে অন্তত তিনখানা ৷ কাজের ফাঁকে-ফাঁকে যখনই সময় পাই— তখনই মনে-মনে কথার পর কথা সাজিয়ে রাখি ৷ তারপর বাড়ি ফিরে দরজায় খিল লাগিয়ে আমার হালকা নীল রঙের প্যাডখানা টেনে নিই৷ চিঠি লেখার জন্যে তুমি হালকা নীল রং খুব পছন্দ করতে ৷ এখন তোমার পছন্দ আমারও পছন্দ হয়ে গেছে ৷ তোমাকে সাদা কাগজে চিঠি লেখার কথা ভাবতেই পারি না ৷ তোমার কাগজের রঙে রং মিলিয়ে লিখতে খুব ভালো লাগে ৷ ভালো লাগে বলেই আমি হালকা নীল রঙের প্যাড ব্যবহার করি ৷ যখনই তোমাকে চিঠি লিখতে বসি— তখনই মনে পড়ে তোমার সেই স্বপ্ন-ঘেরা বাড়ির কথা ৷ কথাটা তুমি প্রায়ই বলতে ৷ বলতে— বেশ সুন্দর একখানা বাড়ি হবে ৷ শহরে নয়— গাঁয়ে ৷ অনেক দূরে, আকাশের গায়ে দু-চারটে পাহাড় দেখা যাবে ৷ কাছেই থাকবে ক্ষীণতনু খরস্রোতা নদী ৷ সেই নদীর কাছে একটা একতলা বাড়ি ৷ সামনে থাকবে ছোট একটা গেট ৷ তার ওপর মাধবীলতার আবরণ ৷ অর্ধচন্দ্রাকৃতি গেটের নীচে ডানদিকে থাকবে ছোট একটা সবুজ রঙের লেটারবক্স ৷ তার গায়ে হলুদ অক্ষরে লেখা থাকবে ‘শিউলিবাড়ি’ ৷ তোমার নামে বাড়ির নাম ৷ তোমার হয়তো মনে নেই, আমি বলেছিলাম, লেটারবক্সের রং হোক হলুদ— তার ওপর নাম সবুজ রঙে ৷ তাহলে বেশ কিছুটা দূর থেকেই বাড়ির নাম, মালিকের নাম চোখে পড়বে ৷ তুমি বলেছিলে, না, সবুজের ওপর হলুদ লেখাই আমার ভালো লাগে ৷ লেখা দেখার জন্যে তাহলে সবাইকে খুব কাছে আসতে হবে ৷ কাছে এলেই দেখতে পাবে— গেট থেকে লাল সুরকির পথটা সোজা বাড়িটার পায়ের কাছে পৌঁছে গেছে ৷ পথের একদিকে সাদা ফুলের মেলা, অপরদিকে রঙিন ফুলের বাসর ৷ সুন্দর সাজানো-গোছানো দুটি বাগিচা ৷ তুমি ‘বাগান’ বলতে না— ‘বাগিচা’ ৷
এর আগে যে-চিঠিখানা তোমাকে লিখেছিলাম— তাতে বলেছি— তোমার স্বপ্নে-ঘেরা বাড়ি তৈরি হয়ে গেছে ৷ বাংলাদেশের মধ্যেই ছোট একটা পাহাড়ি জায়গা ৷ কাছে নদীও আছে ৷ কিন্তু লোকবসতি খুব কম ৷ হোক কম— তুমি নিরালাই বেশি পছন্দ করতে ৷ বলতে, সেখানে আমি তো কথা বলব না— শুধু হৃদয় দিয়ে অনুভব করব ৷ বুদ্ধি দিয়ে, বিবেক দিয়ে কোনোকিছু বিচার করব না ৷ হৃদয়ের কাছে যা কাম্য— তা-ই হবে আমার কাজ ৷
আমি তোমার কথা শুনে হাসতাম ৷ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট হয়েও তুমি বড় বেশি ছেলেমানুষি করতে৷ আমি কিন্তু ওগুলো প্রাণভরে উপভোগ করতাম ৷ তাই তোমার গাম্ভীর্য আমায় ব্যাকুল করে তুলত ৷ মনের মধ্যে নানা প্রশ্নের ঢেউ তুলে তোমার গাম্ভীর্যের কারণ খুঁজতাম— কিন্তু পরক্ষণেই তুমি হাসির ঢেউয়ে সবকিছু ভাসিয়ে দিতে ৷ আমার খুব ভালো লাগত ৷ ভালো লাগত তোমার স্বপ্ন, ভালো লাগত তোমার কথা, ভালো লাগত তোমার সবকিছু ৷ আজও ভালো লাগে ৷ গভীর রাতে ঘরের আলো নিভিয়ে যখন বিছানার ওপর কর্মক্লান্ত দেহটা এলিয়ে দিই— হয়তো জানলা দিয়ে একঝলক চাঁদের আলো আলনাটার পায়ের কাছে হেসে লুটোপুটি খাচ্ছে— তখন তোমার পুরোনো কথাগুলো আমার কানের কাছে মধুর স্বরে যেন গান শোনাত ৷ তোমার কণ্ঠস্বর এত মিষ্টি, উচ্চারণ-ভঙ্গি এত সুন্দর ছিল যে, তুমি কথা বললেই মনে হত গান গাইছ ৷ অথচ তোমাকে আমি কোনোদিন গান গাইতে শুনিনি ৷ তুমি আবৃত্তি করতে ৷ বিশেষ করে কবিগুরুর প্রেমের কবিতাগুলো তোমার কণ্ঠে শুনতে ভারী ভালো লাগত ৷
আজ যদি তুমি এখানে আসতে— দেখতে তোমার স্বপ্ন-ঘেরা বাড়িকে আমি বাস্তবে রূপায়িত করেছি ৷ ঠিক যেখানে যা চেয়েছিলে তুমি— সব সেইভাবেই সাজিয়ে রেখেছি ৷ আলনায় নতুন কেনা আটপৌরে শাড়ি, তার পাশে আমার ধুতি— তোমার শায়া-ব্লাউজ—আমার গেঞ্জি-জামা— সব পাশাপাশি গুছিয়ে রেখেছি ৷ যদি কোনোদিন তুমি এসে পড়ো— তাহলে অবাক হয়ে যাবে ৷ মনে হবে—এই বাড়িতেই থাকতে তুমি ৷ তোমার প্রয়োজনের সব জিনিসই আমি কিনে রেখে দিয়েছি ৷ তুমি এলে তোমার এতটুকু অসুবিধে হবে না ৷ কিন্তু তুমি আসবে কি? জানি না— আজও তুমি আমাকে ক্ষমা করতে পেরেছ কি না ৷ একটা মিথ্যাকে সত্য জেনে তুমি আমাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছ ৷ অথচ আমাকে জিগ্যেস করবার প্রয়োজনও মনে করোনি ৷ যদি জিগ্যেস করতে— তাহলে জানতে পারতে কতখানি ভুল তুমি করেছিলে ৷ কিন্তু তুমি নিজের অভিমান নিয়েই পড়ে রইলে ৷ আমার সঙ্গে দেখা পর্যন্ত করলে না ৷
যেদিন তোমাদের বাড়ির দরজা থেকে আমাকে ফিরে আসতে হয়েছিল— সেদিন মুহূর্তের জন্যে এই পৃথিবীটাকে বড় কঠিন বলে মনে হয়েছিল ৷ মায়া-মমতা-ভালোবাসা— সবকিছু যেন বইয়ের ভাষা— বাস্তবের এতটুকু ছাপ নেই ৷ পাশাপাশি দুটো মানুষ যেন প্রয়োজনের জন্যেই কাছাকাছি থাকছে ৷ অন্তরের টান এতটুকু নেই ৷ বড্ড শক্ত মনে হয়েছিল তোমাদের বাড়ির সামনেকার সবুজ ঘাসগুলো ৷ তোমাদের বাড়ির দরজা থেকে আমার মেস—পাঁচ মিনিটের পথও নয়— কিন্তু মনে হয়েছিল, ওইটুকু পথ পেরোতে আমার বেশ কয়েক বছর সময় লেগে গেল ৷ সেদিন মনে হয়েছিল— আমার বেঁচে থাকাটা নিরর্থক ৷ কার জন্যে— কীসের জন্যে বাঁচব— কথাটা আবার নতুন করে ভাবতে হয়েছিল ৷
