আরও কিছুক্ষণ ধানাই-পানাই করে চলে যান গোবর্ধনবাবু ৷ কিন্তু তার পরের দিন আবার আসেন ৷ তার পরের দিনও ৷ রোজই ৷ কখনও তিনি নিজে ৷ কখনও তাঁর চেলারা ৷ পারুলের বাবা-কাকার হাতে টাকা গুঁজে দেয় ৷ চালের বস্তা ঢুকিয়ে রাখে রান্নাঘরে ৷ নিচু গলায় ফিসফিসিয়ে বাড়াতে থাকে টাকার অঙ্ক ৷ নাকের ডগায় গাজরের মতো ঝোলাতে থাকে একটা শ্যামলা মেয়ের জীবনের বিনিময়ে সারা পরিবারের নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন ৷
কেস ওঠে বারো দিন পরে ৷ বাদী পক্ষের কেউ সাক্ষী দিতে আসেনি ৷ কিন্তু তবু তো খুনের মামলা ৷ তাই আবার দু সপ্তাহের পুলিশ হেফাজত হয় পরেশের ৷
রাস্তায় একদিন পারুলের বাবাকে দেখে চমকে ওঠে মঞ্জু ৷ পরিষ্কার ধুতি-শার্ট পরা ৷ ক্ষৌরি করা গাল ৷ তবে কি লোকে যা ফিসফাস করছে সবই সত্যি? গোবর্ধন মণ্ডল পয়সা দিয়ে কিনে নিয়েছে পারুলের বাড়ির লোকজনকে? পরেশের ছাড়া পাওয়া এবার শুধু সময়ের ওয়াস্তা ৷
আরও দুবার কেস ওঠে ৷ সাক্ষী না থাকায় হেফাজতের মেয়াদ বাড়ে ৷ থানা থেকে খবর নেন গোবর্ধন মণ্ডল ৷ এবার কেস যখন উঠবে বাদী পক্ষের সাক্ষী না থাকলে জামিন হয়ে যাবে পরেশের ৷ মামলা অবশ্য চলবে ৷ কিন্তু তাতে কী? ছেলে ঘরে ফিরলে বড় উকিল লাগিয়ে ও মামলা যে শেষ পর্যন্ত খারিজ করাতে পারবেন, এমন বিশ্বাস গোবর্ধন মণ্ডলের নিজের ওপর আছে ৷ দশ লক্ষ টাকা আর পাঁচ বিঘে জমি হারাধনদের দুই ভাইয়ের নামে লিখে দেবেন ৷ কাগজপত্র সব তৈরি ৷ সহজে অবশ্য হয়নি ৷ দুই ভাই-ই বেগড়বাঁই করেছে অনেক ৷ মেয়ের জন্য দরদ উথলে দিয়েছে ৷ পাঁচ লাখে হয়ে যাবে ভেবেছিলেন ৷ দশ লাখ পর্যন্ত উঠতে হল ৷ সঙ্গে চাপা শাসানি ৷ জলে থেকে কুমিরের সঙ্গে বিবাদ করার ফল যে ভালো হয় না তার নানারকম উদাহরণ ৷
শেষকালে একদিন পোটকা গিয়ে বড় মেয়েটার সঙ্গে খানিক গল্প-গাছা করে আসার পর সব ঠান্ডা হয়ে গেল ৷ পার্টি ক্ষমতায় থাকলে অবশ্য এত ঝামেলা পোহাতে হত না ৷ পাশা উলটে যাওয়ায় একটু সমস্যা হয়েছে ৷ ব্যবসাপত্তরগুলো সময়মতো গুছিয়ে নেওয়া গেছিল বলেই বাঁচোয়া ৷
২৪ জুন ৷ আজ আবার পরেশের কেস উঠবে আদালতে ৷ এবারটা সামলানো গেলেই জামিন ৷ সকালেই নেতাইকে হারাধনের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন গোবর্ধন মণ্ডল ৷ অ্যাটাচিতে দশ লাখ টাকা আর জমির দানপত্র ৷ পরেশের জামিন হয়ে গেলেই মোবাইলে খবর দেবেন নেতাইকে ৷ ব্যাঙ্কে সব ফিট করা আছে ৷ কাগজপত্র হাতে দিয়ে নেতাই নিজে দুই ভাইকে বাইকে চাপিয়ে ব্যাঙ্কে নিয়ে গিয়ে আলাদা আলাদা নামে টাকা জমা করে দেবে ৷ গোবর্ধন নিজে আদালতে থাকবেন ৷ একেবারে ছেলেকে নিয়ে ফিরবেন ৷
কী ভেবে বেরোনোর আগে নেতাইকে ডেকে গোবর্ধন বলে দিলেন, মেশিনটা সঙ্গে নিয়ে যা ৷ গরিব লোক তো ৷ হঠাৎ মাথা গরম হয়ে যেতে পারে ৷ একবার জামাটা তুলে দেখিয়ে দিবি, ঠান্ডা হয়ে যাবে ৷
সকাল সকালই চলে এসেছে নেতাই ৷ বারান্দায় প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে আছে আরাম করে ৷ বাড়ির কেউই আজ ঘর থেকে বেরোয়নি ৷ দাওয়ায় বসে একটার পর একটা বিড়ি খেয়ে যাচ্ছে হারাধন ৷ বকুলের কাকা চা খেয়ে আবার কাঁথামুড়ি দিয়েছে ৷ ছোট ভাই-বোনদুটো বই-শেলেট নিয়ে বসেছে ৷ রান্নাঘরের সামনে কুটনো কুটছে বকুল ৷ উনুনে ভাতের হাঁড়ি বসিয়েছে কাকিমা ৷ রান্নাঘরেরই একপাশে বসে আছে পারুলের মা ৷ চোখে ভাষা নেই ৷ শুধুই বোবা কান্না ৷ ভয় আর অপরাধবোধের একটা গুমোট কম্বল যেন ঢেকে আছে গোটা বাড়িটাকে ৷
বসে বসে ঢুল আসছিল নেতাইয়ের ৷ হঠাৎ পায়ের শব্দে চটকা ভাঙল ৷ ভাঙা বেড়ার গেটটা পেরিয়ে ছুটে ঢুকছে একটা মেয়ে ৷ নীলপাড় শাড়ি পরা ৷ মেয়েটাকে চেনে নিতাই ৷ পোস্টাপিসের বাবুর মেয়ে ৷ মঞ্জু না কী যেন নাম….মরা মেয়েটার বন্ধু ছিল…এ আবার কী ঝামেলা পাকাতে এল…. ভাবতে ভাবতেই চিৎকার করে ওঠে মঞ্জু, কাকিমা…আ…কাকিমা গো …, পারুল ফার্স্ট হয়েছে, ফার্স্ট হয়েছে, স্টার পেয়েছে কাকিমা…. চারটে লেটার পেয়েছে… আমাদের সবার থেকে বেশি নম্বর পেয়েছে গো পারুল…সব থেকে বেশি… ৷
ছুটে বেরিয়ে এসেছে পারুলের কাকিমা ৷ বিদুৎস্পৃষ্টের মতো চমকে উঠেছে মা ৷ বঁটি ফেলে উঠে দাঁড়িয়েছে বকুল৷
আমি ভ্যান রিকশা নিয়ে এসেছি কাকিমা, মঞ্জুর গলা কাঁপছে ৷
দিদি চলো ৷—আঁচলটা কোমরে গুঁজে নিয়ে পারুলের মায়ের হাত ধরে টানে কাকিমা ৷ কোন এক অমিতশক্তিতে ভর করে এগিয়ে আসে মা-ও ৷
অ্যাই অ্যাই, কেউ কোথথাও যাবে না ৷ অ্যাই ছুঁড়ি, ভাগ এখান থেকে…নইলে… ৷ — লাফ দিয়ে এগিয়ে এসেছে নিতাই ৷ কোমরে লুকিয়ে রাখা মেশিনটা মূহূর্তে হাতের মুঠোয় ৷
কাকে মারবে তুমি? ক’জনকে মারবে?—কোমরে হাত দিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে মঞ্জু ৷
চমকে উঠে নেতাই দ্যাখে বেড়ার ধারে নীল পাড় সাদা শাড়ির ভিড় ৷ শ্যামলা মুখ, শক্ত চোয়াল ৷ আরও আসছে ৷ অনেকে ৷ দূরের আলপথ ধরে ধেয়ে আসছে ৷
বাড়ির সামনে রাখা ভ্যান রিকশায় ততক্ষণে চেপে বসেছে পারুলের মা ৷ উঠতে গিয়েও থেমে যায় কাকিমা ৷ নেতাইয়ের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে, তোর মালিককে গিয়ে বলিস, আমাদের মেয়ে ফার্স্ট হইছে রে…লেটার পেইছে ৷ এসব কথার মানে জানে না তোর মালিক ৷ মানেটা শিখে নিতে বলিস ৷
