মঞ্জুর কথাটা মাথায় রেখেই আজও এগোল পারুল ৷ দেরি করা যাবে না ৷ কাল পড়াতে যাওয়া হয়নি ৷ আজও না গেলে নার্স দিদিমণি চারটে কড়া কথা বলতে ছাড়বে না ৷ তবে একবার পিছন ফিরে দেখে নিল ৷ কাকিমার কেনাকাটি হয়ে গেছে ৷ মা-কাকিমা দুজনেই আসছে গুটিগুটি ৷
রাস্তার বাঁকে মোটরসাইকেলে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছিল পরেশ ৷ পারুলকে একা দেখেই এগিয়ে এল ৷ চোয়াল শক্ত করে দেখেও না দেখার ভান করছিল পারুল ৷ কিন্তু পরেশ ছাড়ার পাত্র নয় ৷ রাস্তার মাঝখানে দু-পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে বলল, একটা কথা ছিল ৷
উত্তর না দিয়ে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে পারুল ৷ কিন্তু রাস্তার প্রায় সবটা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে পরেশ ৷ ফের বলে, বললাম যে একটা কথা ছিল ৷ একমিনিট দাঁড়িয়ে শুনে গেলে ভালো হয় ৷
আমার সময় নেই ৷ রাস্তা ছাড়ুন ৷— হিস হিসিয়ে ওঠে পারুল ৷
এত ব্যস্ত কীসের, হ্যাঁ? বড় যে গুমোর দেখছি ৷
এবার আর সামলাতে পারে না পারুল ৷ সোজা তাকিয়ে বলে, আপনার মতো রাস্তার রাস্তায় ঘুরে বেড়ানোর সময় আমার নেই ৷ সরুন, নাহলে এবার চেঁচিয়ে লোক ডাকব ৷ কয়েক সেকেন্ড একটু থতিয়ে যায় পরেশ ৷ তারপর সরে যেতে যেতে দাঁতে-দাঁত ঘষে বলে, কাজটা ভালো করলি না, পারুল ৷
কোনওদিকে না তাকিয়ে সামনে এগোয় পারুল ৷ মাথার ভিতরটা যেন আগুন হয়ে আছে ৷ দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে প্রায় দৌড়চ্ছে ৷ মা-কাকিমা যে অনেকটা পিছনে পড়ে গেছে সে খেয়াল নেই ৷ এমনকী মোটরসাইকেলের জান্তব আওয়াজটা যে ক্রমশ কাছে চলে আসছে সেটাও খেয়াল করেনি ৷ যখন করল তখন আর সময় নেই ৷ ধাক্কা খেয়ে পড়ে যাওয়া মেয়েটাকে পিষে দিয়ে চলে গেল পরেশ ৷ গোবর্ধন মণ্ডলের শিবরাত্তিরের সলতে ৷
.
আপনারা বলছেন, এটা অ্যাক্সিডেন্ট নয়, খুন? আপনারা দেখেছেন? নিজের চোখে দেখেছেন?
হ্যাঁ, হ্যাঁ দেখেছি গো ৷ নিজের চক্ষে দেখেছি ৷ গোবর্ধন মণ্ডলের ছেলে আমাদের মেয়েটার ওপর দিয়ে ভটভটিটা চালায়ে দিল ৷ আমাদের মেয়েটা মরে গেল গো ৷ মুখ দিয়ে রক্ত উঠে মরে গেল ৷
থানার বড়বাবুর সামনে দাঁড়িয়ে হাউহাউ করে কাঁদছিল পারুলের কাকিমা ৷ পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে পারুলের মা ৷ ভাষাহীন চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে ৷ হাত-পায়ে কোনও বশ নেই ৷ মঞ্জুর মা তাকে শক্ত করে ধরে না থাকলে যে-কোনো সময় বোধহয় মাটিতে লুটিয়ে পড়বে ৷
পারুলের বাবা আর কাকা হাঁটুতে মুখ গুঁজে মাটিতে বসে ৷
খুনের অভিযোগই লেখা হল ৷ মা আর কাকিমার টিপছাপ নিলেন বড়বাবু ৷ সেদিন রাতেই পরেশকে গ্রেফতার করল পুলিশ ৷ গোবর্ধন মণ্ডল বোধহয় ভাবতেই পারেননি যে জনমজুর হারাধন গড়ুইয়ের সাহস হবে তাঁর ছেলের বিরুদ্ধে এফ আই আর করার ৷ পরেশ তাই বাড়িতেই ছিল ৷
.
পরদিন তাকে আদালতে তোলা হলে জজসাহেব বারো দিন পুলিশ হেফাজতে রাখার নির্দেশ দিলেন ৷ সন্ধে হয়ে গেছে ৷ পারুলকে দাহ করে এসে দাওয়ায় পাতা ছেঁড়া দড়ির খাটিয়াটার ওপর বসে ছিল পারুলের বাবা ৷ কাকাও বসে আছে মাটিতে ৷ বকুল এসে দু-কাপ চা দিয়ে গেল ৷ কালকের ঘটনার পর থেকে এখনও পর্যন্ত একবিন্দু জলও খাওয়ানো যায়নি পারুলের মাকে ৷ একটি কথা ফোটেনি মুখে ৷ কাকিমার কোলে মাথা রেখে চুপ করে শুয়ে আছে শুধু ৷
মোটরসাইকেলের আলোটা দেখা যাচ্ছিল দূর থেকেই ৷ কিন্তু সেটা তাদের বাড়ির কাছে এসে দাঁড়াবে ভাবেনি কেউই ৷ পরপর দুটো বাইক ৷ গোবর্ধনবাবু আর তার দুই শাগরেদকে আসতে দেখে একটু সামলে বসে হারাধন ৷ চাপা গলায় বলে, বকুল, তুই ভিতরে যা ৷
ঘর থেকে দুটো প্লাস্টিকের চেয়ার বার করে দিয়ে নিঃশব্দে ভিতরে চলে যায় বকুল ৷ দাওয়ায় উঠে গোবর্ধনবাবু একটা চেয়ারে বসেন ৷ শাগরেদরা দাঁড়িয়ে থাকে ৷ একটা অস্বস্তিকর নীরবতা ৷ তারপর গলা খাঁকারি দিয়ে গোবর্ধন মণ্ডল বলেন, দ্যাখ হারাধন, যা হওয়ার তা তো হয়ে গেছে ৷ তোদের মেয়ে তো আর ফিরে আসবে না ৷ খামোখা আমার ছেলেটা জেলের ঘানি পিষবে ৷ আমার একমাত্র ছেলে ৷ তোরা বাবু মামলাটা তুলে নে ৷ আমি তোদের পুষিবে দেব ৷ মেয়েটা আমার মরে গেছে দাদা ৷ ওর মা একফোঁটা জল খাচ্ছে না ৷ — এর বেশি আর কিছু বলতে পারে না হারাধন ৷
জানি রে, জানি ৷ আমিও তো ছেলেপিলের বাপ ৷ আমার বাড়িতেও তো একই অবস্থা ৷ ওর মা শুধু মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদছে আর বলছে আমার ছেলেকে ফিরিয়ে এনে দাও ৷ তোদের তো আরও দু-পাঁচটা আছে ৷ আমাদের তো ওই একটিই ৷ আমি কথা দিচ্ছি হারা তোদের কোনও অভাব রাখব না ৷
কীসের অভাব রাখবেন না, বাবু? আমাদের মেয়ের অভাব পুরায়ে দেবেন? আপনি কি ভগবান?
পারুলের কাকিমার আলগা আঁচল মাটিতে লুটোচ্ছে ৷ দু-চোখ যেন দু-খণ্ড আগুনের গোলা ৷
আঃ, তুই ঘরে যা ৷ মেলা কথা বলিস না ৷— ধমকে ওঠে পারুলের কাকা ৷
গোবর্ধন মণ্ডল কিন্তু মিছরিমাখা গলায় বলেন, ছেড়ে দে বাবা ৷ কিছু বলিস না ৷ ওরা মায়ের জাত ৷ কিন্তু আমার কথাটা শোন কিছু করতে হবে না ৷ থানায় গিয়ে কিছু বলতেও হবে না ৷ শুধু কেস যেদিন উঠবে সেদিন সাক্ষী দিতে যাসনি ৷ বাড়িতে একটা বড় মেয়ে আছে ৷ আর একটা বড় হচ্ছে ৷ ছেলেটাকে মানুষ করতে হবে ৷ এসব কথাও তো মাথায় রাখতে হবে ৷
