কাঁচা মাটির রাস্তাটা ধরে ছুটতে ছুটতে আসছে পারুল ৷ পায়ের প্লাস্টিকের চটিটা কখন ছিটকে গেছে, খেয়াল নেই ৷ কাঁটায় দু-চারবার শাড়ি আটকেছে, ভ্রুক্ষেপ করেনি ৷ তাদের মাটির বাড়িটা দেখা যাচ্ছে ৷ চালের খুঁটিটা ধরে মা দাঁড়িয়ে আছে ৷ হাতের ঝাঁটাটা ছুড়ে ফেলে এগিয়ে আসছে কাকিমা ৷ বোনের দিকে ছুটে আসছে বকুল, মা মা আমি স্টার পেয়েছি ৷ চারটে লেটার ৷ স্কুলে ফার্স্ট হয়েছি মা… আমি ফার্স্ট হয়েছি…
– – –
গল্পটা তো এরকম হতেই পারত ৷ হলে হয়তো আমরা অনেকেই খুশিও হতাম ৷ কিন্তু মেয়েটার নাম যে পারুলবালা গড়ুই ৷ পরিচয়, জনমজুর খাটা হারাধন গড়ুইয়ের মেয়ে ৷ তার জীবনটা এরকম সরলপথে এগোনো যে বড় কঠিন ৷ তাই কল্পনার পারা উঠে যাওয়া ঝাপসা আয়না থেকে এবার চলুন দৃষ্টি ফেরানো যাক চোখধাঁধানো বাস্তবে ৷
মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হয়ে গেছে ৷ কাকিমার বাপের বাড়ি উরালি গ্রামে ৷ পারুলদের মাচানতলা থেকে বাসে যেতে সময় লাগে আধঘণ্টা ৷ তবে বাস তো সেই হাইরোডে ৷ বাড়ি থেকে হেঁটে বাসরাস্তা পৌঁছতে প্রায় চল্লিশ মিনিট ৷ ভ্যানরিকশা চলে ৷ কিন্তু তাতে তো আবার পাঁচটা করে টাকা নেবে ৷ আবার বাসভাড়াও দিতে হবে চারটে টাকা ৷ পারুল, তার মা আর কাকিমা তাই হেঁটেই বাসরাস্তা চলে গেছিল ৷ বকুল যায়নি ৷ বাবা-কাকার ভাত-জল করতে হবে ৷ কাকার ছেলে-মেয়ে দুটো ছোট ৷ ওদেরকেও সঙ্গে নেয়নি কাকিমা ৷ নিলেই ভ্যানে চাপতে হবে ৷ অতখানি পথ হাঁটতে পারবে না ৷ তার থেকে বকুলের কাছে একটা রাত দিব্যি থাকবে ৷ বাপের বাড়ি যাওয়াটা জরুরি ৷ একে তো বুড়ি মায়ের সঙ্গে অনেকদিন দেখা হয়নি ৷ তার ওপর একটা জমি বিক্রির কথা হচ্ছে ৷ ডাক-খোঁজ না করলেই ভাইরা বোনেরা ভাগটুকু মেরে দেওয়ার ধান্দা করবে ৷ কিন্তু এসব কাজে একলা গেলে ঠিক জোর পাওয়া যায় না ৷ তাই পারুল আর তার মাকে সঙ্গে নেওয়া ৷ বরকে বলে লাভ নেই ৷ একে তো সে অনেকদিন বাদে খানতিনেক ঘর ছাওয়ার কাজ পেয়েছে ৷ ঠিকঠাক করলে দুটো পয়সা ঘরে আসবে ৷ তার ওপর সে একটা মেনিমুখো গাঁজাখোর ৷ শ্বশুরবাড়ি গিয়ে কোথায় গাঁজা খেয়ে উল্টে পড়ে থাকবে ৷ তখন তার খোঁজ নেওয়াটাই একটা মস্ত কাজ হয়ে দাঁড়াবে ৷ তার চেয়ে বড় জা সঙ্গে থাকা ভালো ৷ রোগা- সোগা ছোটখাটো মানুষটি হলে কী হবে, বুদ্ধি ধরে খুব ৷ মাথাটিও ঠান্ডা ৷ আর পারুলকে তো নিতেই হবে ৷ সে তো তাদের বাড়ির সব থেকে বড় বল-ভরসা ৷ লেখাপড়া-জানা মেয়ে ৷
কাজ-টাজ মিটল ভালোভাবেই ৷ পরদিন দুপুরে খাওয়া-দাওয়া সেরে উরালি থেকে বেরোল তিনজনে ৷ মাচানতলা মোড়ে যখন বাস পৌঁছল, বেলা তখন প্রায় চারটে ৷ বাসরাস্তার পাশেই মস্ত হাট বসেছে ৷ বকুলের চুলের ফিতে আর ছোট বোনের লাল রিবন কিনতে কাকিমা দাঁড়াল মনিহারি জিনিস বিক্রির চালাটার সামনে ৷ মা এদিকে পদির ঠাকুমার সঙ্গে কথা বলছে ৷ একটু বিরক্ত লাগছিল পারুলের ৷ তাড়াতাড়ি বাড়ি পৌঁছতে হবে ৷ প্রাইমারি হেলথ সেন্টারের নার্স দিদির মেয়েটাকে সপ্তাহে ছ’দিন তাকে পড়াতে যেতে হয় ৷ ক্লাস ওয়ানে পড়ে মেয়েটা ৷ কিন্তু ভয়ানক বিচ্ছু ৷ এক জায়গায় বসিয়ে রাখাই কঠিন ৷ একদিন পারুল না গেলেই মুখ ভার হয় দিদিমণির ৷ মাস গেলে দুশোটা টাকা দেয় ৷ না গিয়ে কী করে পারুল! টাকা ক’টা যে তার বড্ড দরকার ৷
ওই ক’টা টাকা ছিল বলে তো পরীক্ষার সময় অন্তত খাতা-টাতা কিনতে পেরেছে ৷ বইয়ের ব্যবস্থা হয়ে গেছিল ৷ কিন্তু উত্তর লেখা প্র্যাকটিস করতে হলে তো খাতা লাগবে ৷ পারুল পাবে কোথায়? তাও তো মঞ্জু ছিল তাই ৷ ওর বাবার পোস্টাপিসে চাকরি ৷ পুরোনো কাগজ এনে দিত আপিস থেকে ৷ হলদে হয়ে যাওয়া কাগজ ৷ তাতে কী? মঞ্জু আর পারুল তাতেও অঙ্ক কষত ৷ পারুলের বাড়িতে তো আর কারেন্ট নেই ৷ সুয্যি ডুবল তো বই-খাতার পাট চুকল ৷ কেরোসিন থাকলে হ্যারিকেন জ্বালানো যায় ৷ কিন্তু গত দু-বছর বাবা-কাকা কেউই তেমন জন খাটার কাজ পায়নি ৷ ভাত জোটানো যেখানে কঠিন, সেখানে কেরোসিন কে কিনবে? মঞ্জুর বাড়িতেই রাত পর্যন্ত পড়ত পারুল ৷ পড়া শেষ হলে ওর বাবা টর্চ নিয়ে পৌঁছে দিয়ে যেত ৷
এসব কথা বাবা-কাকা জানে কিনা সন্দেহ আছে পারুলের ৷ কাকা তো সন্ধেরাত্তির থেকেই গাঁজার আড্ডায় ৷ বাড়ি যখন ফেরে আগু-পিছু জ্ঞান নেই ৷ বাবার ওসব দোষ নেই ৷ সংসারের জন্য ভূতের খাটনি খাটে ৷ তারপর সন্ধে না লাগতে যা হোক কিছু পেটে দিয়ে মোষের ঘুম ৷ পারুল যে এবার মাধ্যমিক পরীক্ষা দিল, সেটা বাবা জানে কিনা সন্দেহ ৷ ভরসা শুধু মা আর ওই কাকিমাটি ৷ পাখির ছানার মতো আগলায় পারুলকে ৷ কাকিমার পোষা মুরগি আছে গোটা কয়েক ৷ তাদের একটা ডিমও নিজের ছেলেকে পর্যন্ত দেয় না কাকিমা ৷ পারুল খাবে ৷ পড়াশোনা করছে না! ভালো খেতে হবে ওকে ৷ বড় ভরসা তার ওপর কাকিমার ৷ মনে মনে ভাবে পারুল ৷ পরীক্ষা তো ভালোই হয়েছে ৷ এদের আশা পূরণ করতে পারবে তো?
ভাবতে ভাবতেই মনের কোণে তিতকুটে ভাব ৷ হরি ময়রার দোকান পেরিয়ে যেখানে রাস্তাটা বাঁক নিয়েছে মোটরসাইকেলে হেলান দিয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে পরেশ ৷ বড়লোকের বখা ছেলে ৷ ক্লাস সেভেনে উঠে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে ৷ তারপর থেকে সারাদিন শুধু ফুলবাবুটি সেজে টো-টো কোম্পানি ৷ আজ এ মেয়ের পিছনে, কাল ও মেয়ের পিছনে হিড়িক দেওয়া ৷ আগে সাইকেল চড়ত, এখন আবার বাইক কিনেছে একখানা ৷ কী কুক্ষণে যে পারুলকে চোখে ধরেছে! নাহোক মাস ছয়েক পিছনে লেগেই আছে ৷ পারুলের একেকদিন ইচ্ছে করে পায়ের চটিটা খুলে দু-চার ঘা দিয়ে দেয় ৷ কিন্তু মঞ্জু বারণ করে, ওসব করতে যাস না ৷ ওরা বড়লোকের ছেলে ৷ কী করতে কী করে দেবে, কোথায় ফাঁসিয়ে দেবে তার ঠিক আছে? তার চেয়ে চুপচাপ থাক ৷ পাত্তা না দিলে এমনিই কেটে যাবে ৷
