চুল বাঁধতে বাঁধতেই এসব এতাল- বেতাল কথা মনে হচ্ছিল পারুলের ৷ যদিও এসব কথা ভাবার আজকে সময় নয় ৷ বুকের ভিতরটা গুড়গুড়িয়ে উঠছে মাঝেমাঝেই ৷ এমন সময় বাইরে থেকে মঞ্জুর গলা শোনা গেল, পারুল হল তোর৷ তাড়াতাড়ি কর ৷
বিনুনির নীচে গার্টারটা টাইট করে লাগাতে লাগাতে বেরিয়ে আসে পারুল ৷ দরজার চৌকাঠ পেরোলে মাটির দাওয়া ৷ তার ওপর খড়ের চাল ৷ গত দুবছর ছাওয়া হয়নি ৷ খড় আলগা হয়ে এসেছে ৷ দাওয়ার এখানে-ওখানে খড়ের কুটি পড়ে আছে ৷ অন্যদিন বকুল সকালবেলা একপ্রস্থ ঝাঁট দিয়ে দেয় ৷ আজ বোধহয় কোনও কারণে পেরে ওঠেনি ৷ দাওয়ার ওপাশে রান্নাঘর ৷ প্লাস্টিকের চটিটা পায়ে গলাতে গলাতে পারুল গলা তোলে, মা আসছি ৷
দাঁড়া, দাঁড়া, দুদণ্ড দাঁড়া, মা ৷ বলতে বলতে রান্নাঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে এসেছে কাকিমা ৷ পিছনে আঁচলে হাত মুছতে মুছতে মা ৷
কাকিমার হাতে একটা ছোট বাটি ৷ বাটিতে আঙুল ডুবিয়ে পারুলের কপালে দই-হলুদের ফোঁটা দেয় কাকিমা ৷ পারুল জানে, কাল সন্ধেবেলা কাকিমা চেয়ে-চিন্তে ওই আধবাটি দুধ জোগাড় করে এনেছে ৷ তেঁতুলগুলে তাতেই দই পাতা হয়েছে ৷ সকালে এই ফোঁটাটুকু দেওয়ার জন্য এত আয়োজন ৷ ফোঁটা নিয়ে কাকিমাকে প্রণাম করে পারুল, মাকেও ৷ শীর্ণ হাতটা মাথায় রেখে মা অস্ফুটে কী যেন বলে ৷ কাকিমার গেলায় দুগগা দুগগা শুনতে শুনতে দাওয়া থেকে নেমে পড়ে পারুল ৷ মঞ্জু অপেক্ষা করছিল ৷ দুজনে মিলে জোরপায়ে স্কুলের দিকে দৌড় ৷ আজ রেজাল্ট বেরোবে মাধ্যমিকের ৷
রাস্তা অনেকটা ৷ পিচ বাঁধানো নয় ৷ শীত-গরমে সমস্যা নেই ৷ বর্ষায় কষ্ট হয় ৷ তবে বৃষ্টি শুরু হয়নি এখনও ৷ শুকনো রাস্তায় যতটা সম্ভব পা চালিয়ে হাঁটছিল দুজনে ৷ বেশ কিছুটা দূরে আরও চার-পাঁচজন মেয়ের একটা দল যাচ্ছে ৷ তাদের ধরে ফেলতে পারলে ভালো হয় ৷ কিন্তু তার আগেই জোড়ের কালভার্টের পাশে দেখা গেল মূর্তিমান দাঁড়িয়ে আছে বাইক নিয়ে ৷
ওই দ্যাখ, আবার এসেছে ৷ ফিস ফিস করে বলে মঞ্জু ৷
তাকাস না ৷ পাশ কাটিয়ে চলে যাব ৷ কথা বলতে বলতে আঁচলটা কোমরে গুঁজে নেয় পারুল ৷
এই এক উৎপাত চলছে বেশ কিছুদিন ৷ গোবর্ধন মণ্ডলের ছেলে পরেশ ৷ দ্যাখ না দ্যাখ পারুলের পিছনে লেগে রয়েছে ৷ যখন-তখন পারুলদের বাড়ির সামনে দিয়ে চক্কর ৷ স্কুল যাওয়া-আসার পথে তো রোজ দাঁড়িয়ে থাকা বাঁধা ৷ গোবর্ধন মণ্ডল এলাকার নাম-ডাকওলা বড়লোক ৷ বিঘের পর বিঘে ধানিজমি ৷ চালকল, লরির ব্যবসা ৷ কী নেই! এককথায় টাকার কুমির ৷ পাঁচিল দিয়ে ঘেরা বিশাল বাড়ি ৷ আগে পার্টির লোকেদের সঙ্গেও ভালো ওঠা-বসা ছিল ৷ পালাবদলের পর সেটা কমেছে ৷ কিন্তু ক্ষমতা কমেনি বিশেষ ৷ পয়সার জোর থাকলে ক্ষমতা তো থাকবেই ৷ লোকে বলে এলাকার কুখ্যাত গুন্ডা পোটকাও নাকি গোবর্ধনের বশ ৷ গোবর্ধন তাকে নিয়মিত মাসোহারা দেয় ৷ সেজন্যই এলাকার কোনও পাঁচুর সাহস নেই মণ্ডলবাবুর মুখের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার ৷
এহেন গোবর্ধন মণ্ডলের একমাত্র ছেলে পরেশ ৷ অনেক ঠাকুরের দোরধরা, শিবরাত্তিরের সলতে ৷ ছেলে চাইলে গোবর্ধন বোধহয় আকাশের চাঁদটাও পেড়ে এনে দিতে পারে ৷ এমন ছেলের হঠাৎ দিনমজুরি খেটে খাওয়া হারাধন গড়ুইয়ের মেয়ে পারুলকে কেন পছন্দ হল ভগবানই জানে ৷ পারুলকে অবশ্য দেখতে মন্দ নয় ৷ মাজা রং ৷ ছিপছিপে গড়ন ৷ মুখখানাও দিব্যি মিষ্টি ৷ কিন্তু তাদের চালের ফুটো দিয়ে বর্ষার জল পড়ে ৷ বাবা-কাকার কাজ না থাকলে অনেকসময়ই একবেলা উপোস দিতে হয় ৷ আসলে ওই যে সেই কথায় বলে না, যার সঙ্গে যার মজে মন, ব্যাপারটা বোধহয় অনেকটা সেরকমই ৷ কিন্তু এক্ষেত্রে মন মজার ব্যাপারটা পুরোপুরি একপক্ষীয় ৷ পারুলের মন মজেনি ৷ সত্যিকথা বলতে পরেশ যে তারজন্যই রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে সেটা পারুল প্রথমটায় ভাবেওনি, বুঝতেও পারেনি ৷ পরে বুঝতে পেরে ভয়ে সিঁটিয়ে যায় ৷ তারপর যতদিন গেছে অবস্থাটা ক্রমশ বিরক্তির পর্যায়ে পৌঁছে গেছে ৷ এদিকে পারুলের যে তাকে পছন্দ না-ও হতে পারে সেটা সম্ভবত পরেশের কল্পনার অতীত ৷ তাই সেও পিছনে লেগে আছে ৷
আজ অবশ্য পরেশকে নিয়ে মাথা ঘামানোর মতো মনের অবস্থা ছিল না পারুলের ৷ কোনওরকমে পাশ কাটিয়ে দ্রুত এগিয়ে যায় দুজনে ৷ পিছন থেকে রোজকার মতোই অশ্লীল টিপ্পনি উড়ে আসে ৷ কান না দিয়ে জোরে পা চালায় ৷ আরও খানিকটা এগিয়ে বাঁক নিতেই স্কুলবাড়ির নিচু পাঁচিল ৷ ধারে একটা মস্ত পেয়ারা গাছ ৷ জালি এসেছে অনেক ৷ হজমিওয়ালা তেকোণা বাঁশের খাঁচাটা নামিয়ে জিনিসপত্র গোছাচ্ছে ৷ পাশ কাটিয়ে ভিতরে ঢোকে পারুল আর মঞ্জু ৷ সোজা বড়দির ঘরে ৷ সেখানে ততক্ষণে জড়ো হয়েছে তাদের ক্লাসের আরও অনেকে ৷ বড় টেবিলটার সামনে দাঁড়িয়ে বড়দি আর অঙ্কের সবিতাদি কাগজপত্র গোছাচ্ছিলেন ৷ পারুল আর মঞ্জু ঘরে ঢুকতেই বড়দি মুখ তুলে তাকিয়ে হেসে বললেন, এই তো, এসে গেছে ৷ এবার তাহলে খবরটা দিয়ে দেওয়া যাক ৷ হেসে ঘাড় নাড়লেন সবিতাদিও ৷
শোনো মেয়েরা, আমাদের সরলাবালা হাইস্কুলের মাধ্যমিকের রেজাল্ট এবার খুব ভালো হয়েছে ৷ তোমরা বাহান্ন জন পরীক্ষা দিয়েছিলে ৷ সবাই পাশ করেছ ৷ মেয়েদের গলা থেকে একটা সমবেত উল্লাস ধ্বনি বেরিয়ে আসে ৷ সেটাকে থামতে সময় দিয়ে ফের বড়দি বলেন, ফার্স্ট ডিভিশনে পাশ করেছে দশ জন ৷ আর সবচেয়ে আনন্দের কথা হল এবছর আমাদের এক ছাত্রী চারটে বিষয়ে লেটার নিয়ে স্টার পেয়েছে ৷ সে কে জানো তোমরা? পারুলবালা গড়ুই ৷ আমাদের পারুল ৷
