সেটা আমার ডিসিশন, শঙ্কর খুব ঠান্ডা গলায় বলে। —খুন তোমরা দুজনেই হচ্ছ। এই রিভলভারটা দেখেছ? —পকেট থেকে বের করার পর রিভলভারটা আলোতে ঝকঝক করছে। দেখেই মিলি আবার কাঁদতে শুরু করেছে। সুমন্ত্র গুম মেরে গেছে।
নাঃ, এতটা বাড়াবাড়ি করা ঠিক হচ্ছে না, —শঙ্কর আবার চেয়ারে বসে পড়ে। —আফটার অল, তোমরা আমার গেস্ট। ওকে, তোমরাই ঠিক করে নাও কীভাবে খুন হবে।
শঙ্কর, প্লিজ, মেরেই যদি ফেলতে চাও, একেবারে মেরে ফেলো। এই টার্চার আর সহ্য হচ্ছে না। —সুমন্ত্রর গলা ভেঙে গেছে। এতটাই ঠান্ডা পড়ে গেল নাকি!
তুমি মহুয়ার কথা বলছিলে না? —শঙ্কর রিভলভারটা আবার পকেটে ভরতে ভরতে বলে—খানিকটা ব্যবস্থা করা যাবে। আমার কাছে কুঁচিলার বিষ আছে; সাঁওতালরা খুব ব্যবহার করে। মহুয়ার সাথে মিশিয়ে দেব। নেশায়া যন্ত্রণাটা টের পাবে না। মুখ দিয়ে যে গ্যাঁজলাটা উঠবে সেটা যে কীসের জন্য ভাবতে ভাবতেই তোমরা চলে যাবে।
চুপ করো প্লিজ, মিলি বলে উঠল।
ওকে, এটা বাদ। এই সুমন্ত্র, তোমরা কি যাবার আগে একবার দুটো শরীর মিলিয়ে দেখবে নাকি? মরে গেলে আর তো চান্স নেই। তাহলে ওঘরে চলে যাও। বাথরুমে একটা বাথটব তো দেখেইছ। ওটাতে দুজনেই ঢুকে পড়ো। তোমাদের খেলা যখন জমে উঠবে ঠিক তখন আমি ইমারশন হিটারটা ভেঙে টবের জলে ছুড়ে দেব। কারেন্টের ঝটকায় তোমাদের উত্তেজনাটাও বেড়ে যাবে। যতক্ষণ টানতে পারবে চলবে।
তুমি উন্মাদ হয়ে গেছ। সুমন্ত্রর চোখদুটো যেন বাইরে বেরিয়ে আসছে।
যাঃ, এমন একটা রোমান্টিক মৃত্যুও তোমাদের পছন্দ না! তুমি তো আবার নাকি কবি। যাকগে, আরেকটা অপশন দিছি। এভাবেই। তবে বাথটবের বদলে বিছানায়। শেষ হলেই আমিও একটা গুলিতেই তোমাদের শেষ করে দেব।
বন্ধ করো, তীব্র চিৎকারে মিলি লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল।
কী আশ্চর্য! একটা পছন্দসই মৃত্যুও তোমরা বেছে নিতে পারো না। আমি কিন্তু পারি, জানো। ঠিক আছে। দা লাস্ট ওয়ান। আমি তোমাদের দুজনকেই এক্ষুনি বাইরে বের করে দিচ্ছি। রাত ধরো এখন আটটা হবে। বৃষ্টি হচ্ছে ঠিকই। তবে কপালে থাকলে কোনো গ্রামে গিয়েও উঠতে পারো। মানে যদি সাপ—হায়না বা অন্য কিছুর পাল্লায় না পড়ো।
ওকে, আমরা এটাতে রাজি। —সুমন্ত্র উঠে দাঁড়িয়েছে।
আগে শোনো হে, এত জলদিবাজি করলে তো ভুল হয়ে যাবে। তোমাদের হাত আমি পিছন করে বেঁধে দেব। আর চোখও থাকবে বাঁধা।
এত অত্যাচার আমি আর সহ্য করতে পারছি না। —মিলি উঠে ওর দিকে এগোতে যায়। —আমাকে গুলি করে দাও।
উহু, এগিয়ো না। রেক্সের আবার এসব হজম হয় না।
রেক্স এতক্ষণ জুলজুল করে সবাইকে দেখছিল। নামটা কানে যেতেই সামান্য গড়গড় করে ওঠে। মিলি আবার সোফায় বসে পড়ে।
ওকে, তাহলে গুলিটাই ফাইনাল। ও, হ্যাঁ সুমন্ত্র, টেবিলে একটা কাগজ আছে, দেখতে পাচ্ছ তো? একটু জোরে জোরে পড়বে? যেন আমরা সবাই শুনতে পারি। আর শোনো, মনে করবে তুমি স্রেফ একজন নিউজরিডার; কোনো আবেগটাবেগ দেখাতে যেও না। নাও।
সুমন্ত্র কাঁপাকাঁপা হাতে কাগজটা তুলে নেয়। চোখ বোলাতে শুরু করে।
স্টার্ট প্লিজ।
তোমরা দুজন চারটে বছর ধরে আমাকে যে নরকযন্ত্রণা দিয়েছ, একটা গুলিতে তার শোধ হবে না। তাই তোমাদের আমি এক মৃত্যু দেব যার অভিজ্ঞতা তোমাদের আগে আর কারো হয়নি। রেক্স পাহারায় থাকবে। তোমরা সোফা থেকে ওঠবার চেষ্টা করলেই ও ঠিক আটকে দেবে। অবশ্য উঠেও লাভ নেই। পাগলাবাবুর কুঠির দিকে এমনিতেও কেউ আসে না। তারপর বাইরের দরজায় তালা। কেউ উঁকিও মারবে না। তোমরা ওই সোফাতেই এইভাবে বসে থাকবে দিনের পর দিন। স্যরি, খাবার বা জলের ব্যবস্থা থাকছে না। রেক্সের জন্য খানিকটা থাকছে। কিলার ডগ তো! দিনতিনেক পর থেকেই ঘরে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে; পোকারা বাসা বেঁধেছে পচাগলা একটা লাশের উপর। তোমাদের মরে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে; কিন্তু মরতে পারছ না। বসে বসে সেই যন্ত্রণা তোমরা ভোগ করবে।
সুমন্ত্রর হাত থরথর করে কাঁপছে। মিলিও সোজা হয়ে উঠেছে। চোখদুটো যেন ঠিকরে আসছে। সুমন্ত্র অদ্ভুত এক ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলে উঠল—আর তুমি! তোমার কী হবে?
শঙ্কর রিভলভারটা পকেট থেকে বের করতে করতে বলল—রেক্স, এদিকে আয় বাপ। রেক্স উঠে ওর সামনে গেল। শঙ্কর ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে উল্টোদিকে আঙুল তুলে দেখাল। রেক্স সোফার দিকে মুখ করে একটু এগিয়ে গেল। তারপর আবার আগের মতোই সুমন্ত্র আর মিলির দিকে তাকিয়ে মেঝেতে বসে পড়ল।
আমি! —শঙ্কর একটা অদ্ভুত দৃষ্টিতে ওদের দিকে তাকিয়ে খানিকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর কেমন একটা গাঢ় গলায় বলে উঠল—ওই যে…লাশটার ব্যবস্থা করে যাব। —বলতে না বলতেই কানফাটানো একটা আওয়াজ আর আলোর ঝলকানি।
সুমন্ত্র আর মিলি চোখ বন্ধ করে ফেলেছিল। চোখ খুলতেই দেখল, চেয়ারে মাথাটা হেলিয়ে শঙ্কর পড়ে আছে। ডানদিকের রগ থেকে গলগল করে রক্ত বেরোচ্ছে। চোখদুটো খোলা। বিস্ফারিত ঠোঁটে যেন একটা বিদ্রূপের হাসি ঝুলছে। রেক্স একবার মুখ ঘুরিয়ে শঙ্করের দেহটা দেখেই ওদের দিকে ফিরে তাকিয়ে মৃদু একটা গড়গড় আওয়াজ করতে থাকে।
সুমন্ত্র আর মিলি সোফায় বসে শঙ্করের লেখা চিত্রনাট্য অনুযায়ী অপেক্ষা করতে শুরু করে।
জীবনের রংমশাল – দীপান্বিতা রায়
শাড়িটা পরা হয়ে গেছে ৷ বেড়ার গায়ে ঝোলানো ফাটা আয়নাটার সামনে দাঁড়িয়ে দ্রুতহাতে বিনুনি বাঁধছিল পারুল ৷ আয়নার সামনে দাঁড়ানোটা অবশ্য খানিকটা অভ্যাসের মতো ৷ কাচের পিছনে জায়গায় জায়গায় পারা উঠে গেছে ৷ তাই মুখটা দেখায় ঝাপসা, যেন জলে ভিজে ধেবড়ে যাওয়া ছবি ৷ তবে পারুলের যে তাতে খুব কিছু আসে-যায় তা নয় ৷ সিঁথিটা ঠিক রেখে চুলগুলো শুধু টান করে বেঁধে রাখা বই তো নয় ৷ মুখের ওপর চুল এসে পড়লে স্কুলের দিদিরা বকেন ৷ ওইটুকু আয়না ছাড়াই করে নেওয়া যায় ৷ আয়নাটা খারাপ হয়ে যাওয়ায় বরং ওর দিদি বকুলের একটু দুঃখ আছে ৷ আরশির সামনে দাঁড়িয়ে নিজের একঢাল কালো চুল ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখতে বকুল ভালোবাসে ৷
