হতেই পারে সুমন্ত্র। —শঙ্কর যেন মজা পেয়েছে।—একটা লোকের বউ পালিয়ে গেল; বাচ্চচাটাকে খুন করা হল। তার পাগল হবার মতো যথেষ্ট অ্যালিবাই কি থাকতে পারে না? কী বলো?
আমি কোথাও পালাইনি—মিলি এবারে রুখে উঠতে চাইছে—তোমাকে সব জানিয়েই সুমন্ত্রর সাথে চলে গিয়েছিলাম।
আমিও তো তোমাদের সব জানিয়ে দিচ্ছি; আরো জানিয়ে দেব।—শঙ্কর মিটিমিটি হাসছে, যেন বাচ্চচাদের দুষ্টুমি এনজয় করছে।
শঙ্কর, একটা ঘটনা ঘটে গেছে, —সুমন্ত্র বোঝানোর জন্য চেষ্টা করে—সেটা যে খুব ভেবেচিন্তে হয়েছে, এমনটাও তো নয়। হয়ে গেছে, এই পর্যন্তই। তার জন্য খুন করতে হবে!
ধরে নাও, সেটাও এমনি এমনিই হয়ে যাবে। —শঙ্কর হাতের তালুদুটো ঘষতে ঘষতে বলে—তাহলে তো আর বলার কিছু থাকল না; কী বলো সুমন্ত্র?
সুমন্ত্র আর মিলির মুখে আর কোনো কথা নেই। শঙ্কর ওদের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। এতক্ষণের নীরবতা বোধহয় রেক্সের পছন্দ হল না। তাই একবার মৃদু স্বরে একটা ঘেউ করে উঠল।
মিলিকে পেলে আমাদের ছেড়ে দেবে? —সুমন্ত্র যেন একটা সূত্র খোঁজার চেষ্টা করছে, এমনভাবে বলল।
মিলিয়ে ছাড়ব কী করে সুমন্ত্র! তোমাকে ছাড়তে পারি। —আরেকটু ঘুরে গিয়ে শঙ্কর মিলির মুখের দিকে তাকায়। চোখের কোলে জলের দাগটা এখনো শুকোয়নি। নাঃ, মেয়েটা সত্যি বড় মিষ্টি দেখতে। —তুমি কি কিছু বলবে মিলি? শঙ্কর খুব আদুরে গলায় বলে। শুনেই মিলি আবার কেঁদে ওঠে।
আর ইউ সিরিয়াস? সুমন্ত্র জিজ্ঞেস করে।
দেয়ারস নো ডাউট ফ্রেন্ড। মিলিকে চাইলেই যদি দিয়ে দিতে পারো, ইউ আর ফ্রি।
দেন, ইটস ডান। সুমন্ত্র সোফায় হেলান দিয়ে বসে পড়ে।
মিলি, তুমি কিছু বলবে না? শঙ্কর মিলির সামনে একটু ঝুঁকে জিজ্ঞেস করে। তোমার ফেলে যাওয়া হাজব্যান্ডকে যদি আবার জড়িয়ে ধরতে পারো, তোমার নেক্সট হাজব্যান্ড বেঁচে যেতে পারে। কি পারবে তো?
মিলি কোনো সাড়া দেয় না। শঙ্কর হাঁটু গেড়ে ওর সামনে বসে। তারপর ওর হাতদুটো ধরে বলে—আর যদি তোমাকে ছেড়ে দিয়ে সুমন্ত্রকে রেক্সের সামনে ছেড়ে দিই? তুমি চলে যাবে তো?
মিলি থরথর করে কেঁপে ওঠে। —আ—হা—আমি একা কোথায় যাব? —মনে হল এতক্ষণ যেন বলবার মতো একটা যুক্তি খুঁজে পেয়েছে।
শঙ্কর, তুমি কি খেলা পেয়েছ? —সুমন্ত্র চিৎকার করে ওঠে। কথা ঘোরাচ্ছ কেন?
একা কোথায় যাবে মানে কী, মিলি? —সুমন্ত্রকে পাত্তা না দিয়েই শঙ্কর বলে—সুমন্ত্রকে সঙ্গে নিয়েই যাবে? সেটা তো হবে না। হয় তুমি, না হয় ও, এনি ওয়ান।
আমি একা কোথায় গিয়ে উঠব? আমার তো থাকার জায়গা নেই। মিলির গলাটা কেমন যেন ঝিমিয়ে গেছে।
ওহো, এটা তো মাথায় আসেনি। ওকে; তুমি আমার এখানেই থাকতে পারো। টিভি নেই, ফোন নেই; এটুকুই প্রবলেম।
মিলি মাথা নিচু করে ফোঁপাতে থাকে।
কি, থাকবে? —শঙ্কর খুব আলতো করে বলে।
আমাকে মেরো না শঙ্কর; যা করতে বলো করব। মিলি সোফার ব্যাকরেস্টে হেলান দিয়ে চোখদুটো বুজে কোনোরকমে বলে।
মিলি! —সুমন্ত্র আবার চিৎকার করে ওঠে—ট্রেচারাস হোর।
গালাগালি নয় সুমন্ত্র, —শঙ্কর উঠে পড়ে। —বিশেষ করে মিলির মতো মিষ্টি গালিগালাজ করাটা আমি মেনে নেব না। রেক্সেরও বোধহয় পছন্দ হচ্ছে না। কী রে রেক্স? ঠিক তো?
নিজের নামটা শুনেই রেক্সের জিভটা যেন একটু বেশিই বাইরে বেরিয়ে আসে। —দেখলে তো সুমন্ত্র! —শঙ্কর আবার নিজের চেয়ারে গিয়ে বসে। তারপর মাথাটা দোলাতে দোলাতে বলে—প্রবলেম, প্রবলেম। চারটে বছর একসাথে থাকার পর আজ দুজনেই প্রাণে বাঁচার জন্য অন্যকে খুন হতে দিতে রাজি। তাহলে স্কোপটা কার পাওয়া উচিত? এবারে সত্যি সত্যিই নিজেকে পাগল—পাগল লাগছে।
সুমন্ত্র আর মিলি কেউই কোনো কথা বলে না। শঙ্কর যেন খুব ভাবছে এমন ভঙ্গিতে পায়চারি করতে শুরু করে। হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে বলে—আইডিয়া। টস করেই ডিসিশান নেওয়া যাবে। রাইট। সুমন্ত্র, তোমার কাছে কয়েন আছে? —সুমন্ত্র পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটা কয়েন তুলে সামনে বাড়ায়।
হুম, তাহলে হেড কে নেবে? আর টেল? লেডিস ফার্স্ট। তাহলে মিলিই বলো।
এটা আনফেয়ার, —সুমন্ত্রর গলাটা কেমন যেন ধরে এসেছে। —আমার নাম উঠলে আমি খুন হব, মিলি তোমার কাছেই থেকে যাবে। আর মিলির নাম উঠলে তুমি আমাকে ছেড়ে দিয়ে মিলিকে তোমার কাছে রেখে দেবে। ইন এনি কেস মিলির কোনো রিস্ক নেই। তাহলে মিলিকেই রেখে দাও; আমি ভোর হলেই চলে যাব।
শঙ্কর খানিকক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর এগিয়ে আসে সুমন্ত্রর সামনে। তারপর বলে —আর আমার সেই মেরে ফেলা সন্তানটাকে যদি ফেরত চাই? সুমন্ত্র! মিলি! দেবে? দেবে আমার হাতে তুলে? তাহলে কিন্তু তোমাদের দুজনকেই ছেড়ে দিতে পারি।
শঙ্কর, প্লিজ, পাগলামো কোরো না, সুমন্ত্রর গলাটা কেমন যেন অসহায়ের মতো শোনায়।
সিদ্ধান্তটা নেবার সময় নিশ্চিত পাগলামি ছিল সুমন্ত্র; কিন্তু এখন আমি একদম সুস্থ। নাটকের শেষ কার্টেন ফেলা পর্যন্ত আমাকে সুস্থই থাকতে হবে। শোনো তোমাদের দুজনকেই আমি আজ খুন করব।
শঙ্কর, তুমিও কি বাঁচবে ভেবেছ? সবাই জানে আমরা তোমার কাছে আসছি। এখানেও লোকজন আমাদের দেখেছে। দুদিন। তিনদিন। তারপরেই খোঁজখবর শুরু হয়ে যাবে। তখন?
