ও আর আসবে না সুমন্ত্র, শঙ্কর যেন মজা করছে এমন ভঙ্গিতে বলল।
ছাড়িয়ে দিলে নাকি?
নাঃ, এখানে সব্বাই জানে কাল ফার্স্ট ট্রেনেই আমি কলকাতায় চলে যাচ্ছি। আর কেউ আসবে না।
তাহলে আমাদের ডেকে এনেছ কেন? —মিলি উঠে দাঁড়িয়েছে। —নেমন্তন্ন করে এনে তুমি নিজেই চলে যাবে মানে?
এত টেন্সড হোয়ো না মিলি, শঙ্কর খুব মৃদু স্বরে বলে।
এটা কি ফাজলামি হচ্ছে? —এতক্ষণে মিলিকে শঙ্করের খুব চেনা চেনা মনে হয়। এই ঝাঁজটাই মিলিকে আর সবার থেকে আলাদা করে দিত।
একদম না মিলি। যে নাটকটা চার বছর ধরে লিখে যাচ্ছি, আজ তার এক ও একমাত্র শো চলছে। আমি একদম সিরিয়াস।
শঙ্কর, পুরনো কথা টেনে নিজেকে আর কষ্ট দিচ্ছ কেন—সুমন্ত্র সোজা হয়ে বসেছে।—তোমার খারাপ লেগেছে; আমাদেরও যে খুব ভালো লেগেছিল, এমনটাও তো নয়। কিন্তু মানুষ তো পরিস্থিতির শিকার।
দারুণ বললে কিন্তু সুমন্ত্র। শঙ্কর হাততালি দিয়ে বলে উঠল। —বন্ধু হিসাবে বাড়িতে ঢুকেছিলে; বেরোলে চোর সেজে।
বাজে কথা বন্ধ করো, সোফার হাতলে বাড়ি মেরে মিলি বলে উঠল।—যা হয়েছে তার জন্য তুমিও দায়ী। আমাকে বোঝার আদৌ কোনো চেষ্টা করেছিলে কোনোদিন?
শঙ্কর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তারপর বলে—যেদিন বুঝলাম আমি তোমার কাছে একটা বোঝা, সেদিনই তোমাকে বোঝার চেষ্টা ছেড়ে দিয়েছিলাম।
শঙ্কর, যাই হোক, তোমাকে আমি বন্ধু বলেই মনে করি,—সুমন্ত্র সোজা ওর দিকে তাকিয়ে বলছে। —তুমি না থাকলে আমি তো কোথায় হারিয়ে যেতাম। তোমার উপকার মনে আছে বলেই তো এতবছর বাদে তোমার ডাকে সাড়া না দিয়ে পারলাম না। মিলি আসতে চায়নি। আমিই জোর করে রাজি করালাম।
উপকার! হাঃ হাঃ হাঃ। বিনিময়ে বড় সুন্দর একটা উপহার দিয়েছিলে বন্ধু, উপকারীর বউকে চুরি করে নিয়ে।
বাজে কথা বলবে না,—মিলি আবার ফুঁসে উঠেছে। —আমরা দুজনে স্বেচ্ছায় চলে গিয়েছিলাম। এটাকে চুরি বলে না।
আর আমার সন্তান!—শঙ্কর যেন সাপের মতোই হিসহিস করে ওঠে। —সেটা চুরি নয়!
শঙ্কর, অ্যাবর্শনটা খুব জরুরি ছিল,—সুমন্ত্র লাফ দিয়ে ওঠে, —নাহলে মিলিই বাঁচত না।
রাইট। সেই সিদ্ধান্তটা যার নেবার কথা, সে কিন্তু জানতে পারল সবকিছু মিটে যাবার পরে। এমনকী সে যে বাবা হতে পারে, সেই সংবাদটাও।
সুমন্ত্র আর মিলি মাথা নিচু করে বসে আছে। শঙ্কর উঠে পড়ে। ভিতরের ঘরের দিকে যেতে যেতে হঠাৎ ঘুরে বলে—একটু চা খাবে নাকি? আরে, চা খেলে এই গুমোটটা কেটে যাবে।
করো, —সুমন্ত্রর গলাটা কেমন নির্জীব শোনাল। রান্নাঘরে চা বানাতে বানাতেই সুমন্ত্র আর মিলির দুয়েকটা কথার টুকরো টুকরো অংশ কানে পৌঁছে যাচ্ছিল শঙ্করের। যতই তেজ দেখাক, মিলি খুব ভয় পেয়েছে। সুমন্ত্রই ওকে বোঝাচ্ছে। মিলি বুঝতে চাইছে না। মেয়েদের এই ক্ষমতাটা জন্মগত। হয়তো চারিদিকের হাঙর—কুমির সামলাতে সামলাতে ওরা এটা খুব দ্রুত অর্জন করে ফেলে।
তোমার এই বন্ধুটাকে কিন্তু আমার মোটে সুবিধার মনে হয় না। রাতে শঙ্করের বুকে মাথা রেখে মিলিই একদিন বলেছিল। —চোখ দেখলেই অস্বস্তি লাগে; কেমন যেন খিদে—খিদে ভাব।
আরে, রোজগারপাতি নেই; কবিমানুষ। খিদে তো থাকবেই।
এ খিদে সে খিদে নয় মশাই; এ হল অন্য খিদে।
একটা জোয়ান মানুষ, তায় কবি। একটু ছোকছোকানি তো থাকতেই পারে।
আর যদি তোমার বউকেই খেয়ে ফেলে? —মিলি এবার শঙ্করের উপরে উঠে মাথাটা সামান্য উঁচু করে ওর চোখের দিকে সোজা তাকিয়েছিল।
শঙ্কর মুখটা উঁচু করে মিলির ঠোঁটটাকে আলতো স্পর্শ করে বলেছিল— তালে বুঝব, ব্যাটাচ্ছেলের ক্ষমতা আছে।
চা নিয়ে ঘরে ঢুকে শঙ্কর দেখে ওরা দুজনেই মোবাইল নিয়ে টেপাটেপি করে যাচ্ছে।
ওখানে নেটওয়ার্ক থাকে না সুমন্ত্র। নাও চা খাও।
চা খাওয়া শেষ হতেই শঙ্কর নিজের চেয়ারটা ঘুরিয়ে ওদের মুখোমুখি বসে। —হ্যাঁ, তাহলে এবারে নাটকটা শেষ করা যাক।
প্লিজ, শঙ্কর, এবার এটা বন্ধ করো। আর ভালো লাগছে না। —সুমন্ত্র আবার সিগারেট ধরিয়েছে।
না না, আর বেশি দেরি হবে না। সুমন্ত্র, মিলি, তোমাদের কেন নেমন্তন্ন করে এনেছিলাম জানো? —শঙ্কর বেশ হাসি হাসি গলায় বলে।
কেন?
তোমাদের পাপের শাস্তি দেব বলে। দুটো জীবনকে খুন করার পাপ।
তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে শঙ্কর, —সুমন্ত্র সোফা থেকে উঠতে যায়।
ওখান থেকে উঠবার চেষ্টা কোরো না সুমন্ত্র। একটা ইঙ্গিত করলেই রেক্স কিন্তু গলার নলিটা ফাঁক করে দেবে। কিলার ডগ মানেটা বোঝো তো? —নিজের নামটা শুনেই বোধহয় রেক্সও ঘরের মধ্যে ঢোকে।—দরজার পাশে বোস। —শঙ্কর কথাটা বলতে রেক্সও থাবা পেতে বসে পড়ল।
সুমন্ত্র তুমি কী বলছিলে? মাথা খারাপ—শঙ্কর আবার হাহা করে এসে ওঠে। —মাথা খারাপ না হলে কেউ কি আর খুনের প্ল্যান কষতে পারে?
তুমি আমাদের খুন করবে শঙ্কর? —মিলি এবারে কেঁদে ফেলেছে।
স্যরি মিলি, দাঁড়িপাল্লাটা একদিকে বড্ড ঝুঁকে রয়েছে; ওটাকে একটু ব্যালেন্স করে দেব।
শঙ্কর,—সুমন্ত্রর গলা কাঁপছে, —তুমি কী চাও বলো! আ—আ—আমরা সবকিছু দিতে রেডি। আমাদের ছেড়ে দাও, প্লিজ।
শঙ্কর উঠে পড়ে। ঘুরে ওদের সোফার পিছনে গিয়ে বলে—যদি বলি মিলিকে ফেরত চাই?
মানে!—সুমন্ত্র যেন বিস্ময়ের শেষ সীমায় এসে দাঁড়িয়েছে। —মিলিকে ফেরত চাও মানে? তোমার মাথাটা সত্যিই গেছে।
