ঠিক হ্যায়, কাল হবে। —সুমন্ত্রর গলায় যেন কেমন একটা ফুর্তির আভাস।
কাল! শব্দটা শুনতে যত ছোট, পিছনের ক্যানভাসটা ততটাই বড়। সারাটা জীবন মানুষ তো এই কাল শব্দটাকে নিয়েই বেঁচে থাকার চেষ্টা করে। সেখানেই তো বেঁচে থাকার আসল মজা। শুধু অতীত আর বর্তমান নিয়েই থাকতে হলে শঙ্করই কি আর বেঁচে থাকত? ও—ও তো বেঁচে আছে স্রেফ সেই কাল শব্দটার ভরসায়। আর সেই কাল শব্দটা যখন আজ হয়ে উঠছে একটু একটু করে, আর কয়েক ঘণ্টা পরই স্রেফ গতকাল হয়ে যাবে, তখন কী করবে ও? বেঁচে থাকবে? কী নিয়ে থাকবে? আর তো কোনো কালের গল্প থাকবে না ওর জন্য। তাহলে?
শঙ্কর উঠে পড়ে। —চা বসিয়ে দিই।
দুপুরের রান্নাটা কি তুমিই করেছিলে? —সুমন্ত্রর সিগারেট প্রায় শেষ হয়ে এসেছে।
নাঃ, একটা মেয়ে আসে সকালে। ওই দুবেলার রান্নাটা করে দিয়ে যায়। বাকিটা আমিই সামলে নিই। বোসো, আমি আসছি,—বলে শঙ্কর ভিতরে ঢুকে যায়।
চা নিয়ে বারান্দায় এসে দেখে ততক্ষণে মিলিও চলে এসেছে। বাইরের অন্ধকারটা বেশ জাঁকিয়ে নেমে এসেছে। বারান্দার লাইটটা এখনো জ্বালানো হয়নি বলে একটা ভূতুড়ে পরিবেশ তৈরি হয়েছে। টেবিলের উপর চায়ের কাপগুলো রেখে শঙ্কর লাইটটা জ্বালিয়ে দেয়। একটা হাল্কা সাদা আলোয় হাতদশেক পর্যন্ত নজর করা যায়।
এখানে কি এরকমই লো—ভোল্টেজ থাকে নাকি? চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে সুমন্ত্র বলে।
ওই আর কী। শঙ্কর দরজার মুখে দাঁড়িয়ে ডাক দেয়—রেক্স…সঙ্গে সঙ্গে মিলি যে আবার জড়সড় হয়ে পড়ল, সেটা ওর চোখ এড়াল না। —ভয় নেই, এ এখন বাইরের মাঠে নিজের কাজ সেরে আসবে; তোমাদের ডিস্টার্ব করবে না।
লেজ নাচাতে নাচাতে রেক্স বাইরে বেরিয়ে গেল। মিলির হাতে চায়ের কাপটা সামান্য—সামান্য কাঁপছে। শঙ্করের হাসি পায়। এত ভয় কোথায় রাখবে ম্যাডাম যখন সবকিছু জেনে যাবে!
চা খাওয়া শেষ হতে না হতেই ঝাঁপিয়ে বৃষ্টি এসে গেল। রেক্স এক দৌড়ে ঘরে ঢুকে গেল। হাওয়ার দাপটে বৃষ্টির জল উড়ে এসে গায়ে লাগছে। বেশ রোম্যান্টিক। কিন্তু অতিথিদের কেমন লাগছে সেটাও জানা দরকার।
তোমরা কি এখানেই বসবে? নাকি ভিতরে যাবে?
দারুণ লাগছে কিন্তু যাই বলো মিলি। —সুমন্ত্র আরেকটা সিগারেট ধরিয়েছে। —শঙ্কর, ইউ আর রিয়েলি লাকি যে এমন একটা জায়গায় আস্তানা বানাতে পেরেছ। বাই দা বাই, তুমি এখন করো কী?
কী করি! —শঙ্কর মুচকি হাসে।—চিত্রনাট্য লিখি।
গ্রেট। তোমার এই গুণটা তো জানা ছিল না। বুঝেছি। সেই জন্যই এমন একটা জায়গায় বাড়ি বানিয়েছ। ক’টা ফিল্ম হল তোমার চিত্রনাট্যের উপর?
এখনো একটাও না। তবে প্রথমটার কাজ শুরু হয়ে গেছে। জানতে পারবে।
হঠাৎই রাস্তাটার ওপাশের গাছগুলোর ফাঁকে ফাঁকে যে ঠাসবুনোট অন্ধকার, তার মধ্যে থেকে একটা তীক্ষ্ন ক্যারক্যারে আওয়াজ জলপড়ার শব্দকে ছাপিয়ে নিজেকে জানান দিল। টিমটিমে আলোতেও শঙ্কর টেল পেল মিলি কেঁপে উঠল সেই আওয়াজে।
কীসের শব্দ?—বহুক্ষণ পরে আবার মিলির মুখের কথা শোনা গেল।
মনে হচ্ছে খটাস; সাপ ধরেছে বোধহয়।
এখানে সাপও আছে,—মিলি ঝটতি চেয়ারের উপর পা তুলে বসে।
হাঃ হাঃ ম্যাডাম, এমন সব পোকাও আছে যারা কামড় দিলে মুখ দিয়ে রক্ত উঠে মানুষ দু ঘণ্টার মধ্যে মারা যায়। বর্ষা হলে তারা আবার দালানকোঠায় শেল্টার খুঁজতে আসে।
আমি ভিতরে যাব,—বলেই মিলি উঠে পড়ে। সেই মুহূর্তেই রেক্স আবার ঘরের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। ওকে দেখেই মিলি আতঙ্কে প্রায় গায়ের উপরেই উঠে পড়ে আর কি। চারটে বছর পরে মিলির গায়ের গন্ধটা আবার যেন শঙ্করকে ঘিরে ফেলতে চলে এল। ও তো ভুলেই গিয়েছিল বলা চলে। স্ক্রিপ্টে কি এগুলোও লেখা ছিল?
নাঃ সুমন্ত্র, ভিতরেই চলো,—শঙ্কর চায়ের কাপগুলো তুলে ফেলে। —এমনিতেই মিলি ভয় পাচ্ছে। তাছাড়া ঢোকার সময় ডানহাতে কেয়াগাছের ঝোপটা দেখেছ তো; বৃষ্টি নামলে তেনাদের আবার ফুর্তি চাগাড় দিয়ে ওঠে। নাও চলো।
ভিতরে ঢুকতে গিয়েই ও টের পায় রেক্সকে না সরালে মিলি ভিতরে যাবে না। —রেক্স! —শঙ্কর বলতেই রেক্স আবার ওপাশের ঘরে চলে যায়। দরজাটা বন্ধ করে দেবার পর মিলিকে এবার যেন একটু আশ্বস্ত দেখায়।
ও হ্যাঁ, মিলি, সুমন্ত্র, আজ রাতের খাওয়ার কিন্তু বন্দোবস্ত করতে পারিনি। —শঙ্কর বেশ কেটেকেটে বলে।
ছাড়ো তো, একটা রাত না খেলে মানুষ কি মরে যায় নাকি! কী বলো মিলি?
আমি কিন্তু কাল সকালেই চলে যাব, মিলি খুব জোর দিয়ে বলে ওঠে।
সে ঠিক আছে মিলি,—শঙ্কর সামান্য হেসে বলে। —তোমরা একটু বোসো; আমি এক মিনিটের মধ্যে আসছি।
বৃষ্টিটা যে ভালোই চলবে বুঝতে শঙ্করের অসুবিধে হল না। ছাতা মাথায় বাড়িটার পিছন দিয়ে ঘুরে আসতেও বেশ ভালোই ভিজে গেছে।
কোথায় গেছিলে? সুমন্ত্র অবাক হয়ে গেছে যেন। —পুরো ভিজে গেছ তো।
বাইরের গেটে তালা মারতে।
ওই বাগানের গেটে? ওখানে তালা মেরে কি তুমি চোর ঠ্যাকাতে পারবে?
হাসালে সুমন্ত্র,—শঙ্কর মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে বলে,—চোরকে তো আমি ইনভাইট করে আনি। তালা মারলাম বারান্দায় যাবার এই দরজাটায়।
মানে! বাইরে থেকে বন্ধ করে বাড়তি সুবিধে কী হবে?—সুমন্ত্র যেন বুঝতে চাইছে বিষয়টা। —তাছাড়া কাল সকালে তোমার ওই রান্নার মেয়েটা যখন আসবে, তখন ও বুঝবে কী করে যে আমরা ভিতরে আছি?
