সুমন্ত্র আর মিলি ঘরে ঢুকে যাবার পর শঙ্কর বারান্দায় এসে বসেছিল। তখনো বাইরে সূর্যের দাপট মাটিকে যেন ভয় দেখানোর জন্য লড়ে যাচ্ছে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হবার মুখেই হাওয়া ছাড়তে আরম্ভ করে দিল। জঙ্গলে এমনটাই হয়। সারাদিন সূর্য যে তাণ্ডবটা নাচে, তাতে হাওয়াও যেন প্রাণ বাঁচাতে লুকিয়ে পড়ে গাছগাছালির আড়ালে। আলোটা একটু কমতেই সারাদিনের দাপাদাপির খামতিটা পুষিয়ে নিতেই যেন দুদ্দাড় করে ছুটতে থাকে। কিন্তু আজকের হাওয়াটার মধ্যে একটা অন্যরকম ইঙ্গিত ছিল। পাহাড়ের ঝরনার জল উপর থেকে নিচে ঠিকড়ে পড়ার সময় দুয়েক ফোঁটা গায়ে এসে লাগলে যেমন শিরশিরানি জাগে, অনেকটাই তেমন।
বৃষ্টি আসবে। বাঃ। ডিরেকটোরিয়াল পয়েন্টে এই বিষয়টা ছিল না। জঙ্গলের বৃষ্টির একটা অদ্ভুত রহস্য আছে। অনেকটা বিয়ের পরে পরে নতুন স্বামী—স্ত্রীর রুটিন—ভালোবাসাবাসির মতোই। অন্তত, ওরা বোর হবে না। পরিণতি জেনে ফেলার পরে মানুষ যে কেমন জড়পাথরের মতো হয়ে যায় সেটা তো ও নিজেই ভালো জানে। তার মধ্যে একটু রোমাঞ্চ আনতে পারলে ক্ষতি কী!
সবকিছু মানুষ ভেবেচিন্তে করতে পারে না। শঙ্করও পারেনি। এমনই এক বিকেলের মুখে দুটো বেজির লড়াই দেখে ও কৌতূহলী হয়ে উঠেছিল। ভালো করে দেখবে বলে বায়নোকুলারটা লাগাল চোখে। বোঝাই যাচ্ছে খাবারের দখল নিয়ে মারামারি। হঠাৎই চোখে পড়ল একটা পাথরের আড়ালে বসে আরেকটা বেজি মাথা উঁচু করে একবার যোদ্ধাদের দেখছে, আবার চোখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে। হাঃ, আদিম খিদে, বুঝে নিতে শঙ্করের অসুবিধে হয় না। মিনিট—পাঁচেকের মধ্যেই মোটাসোটা বেজিটার কাছে হার মেনে অন্যটা পালিয়ে গেল। শঙ্করের উৎসাহ যেন আরো বেড়ে গেল। বারান্দার ধারে এসে ফোকাসটাকে আরো নিখুঁত করার চেষ্টা করল।
ততক্ষণে সেই পাথরটার ছায়ায় অপেক্ষায় থাকা মাদি—বেজিটার শরীরে মদ্দা—বেজিটা নিজের জায়গা খুঁজে পেয়েছে। শঙ্কর দেখতে থাকে। হঠাৎই ওকে একদম হতভম্ব করে দিয়ে সেই পালিয়ে যাওয়া বেজিটা কোত্থেকে একলাফে ঝাঁপিয়ে পড়ল মদ্দা—বেজিটার উপর; গলায় কামড়টা ঠিকঠাক বসেছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না। মোটা বেজিটা যেন বুঝতে পারছে না ঠিক কী করা যায়। আততায়ীকে সামাল দেবে; নাকি যে কাজটার জন্য এতকিছু, সেখানেই নিবিষ্ট থাকবে। খানিকটা ঝাপটাঝাপটির পর দুটোই চলে গেল পাথরের আড়ালে। খানিকবাদে মাদি—বেজিটার মুখটা দেখা গেল পাথরের বাইরে একটুখানি বেরিয়ে আছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে খাবি খাচ্ছে। বাকি দুটোকে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়েও আর দেখা গেল না। সন্ধে হয়ে যাওয়ায় শঙ্কর একসময় বায়নোকুলারটা নামিয়ে রাখতে বাধ্য হয়। পরের দিন সকালে একটাকেও পাওয়া গেল না। পাবার কথাও না। জঙ্গলে কতরকমের জানোয়ার ঘুরে বেড়াচ্ছে। রাতেই হাপিস করে দিয়েছে।
সেদিন রাতেই শঙ্কর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল। চারপাশের পরিবেশ যেন ওকে এদিকেই ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। ও শুধু এক মনোযোগী, বাধ্য ছাত্রের মতো সেই নির্দেশগুলো পালন করে যাচ্ছে। কী হওয়া উচিত, সময়ই যখন সব ঠিক করে দিচ্ছে, তখন আরেকটু উদ্যোগী হওয়াটাই ভালো। কিন্তু কীভাবে! প্ল্যানটা ঠিকঠাক তৈরি করতে লেগে গেল আরো দিনসাতেক। তারপর শঙ্কর চলে গেল চাইবাসা। কয়েকটা জিনিস কিনতে হবে।
ক্যায়া করে ভাইয়া; একেলা আদমি। কব ক্যায়া হো জাতা হ্যায়। —দোকানদারের প্রশ্নের উত্তরে সেফটি ক্যাচটা টেস্ট করতে করতেই শঙ্কর বলেছিল। দোকানদারের আর কী। রুটিন প্রশ্নের রুটিন জবাব শুনে শুনে ও—ও বোধহয় অভ্যস্ত হয়ে গেছে।
সন্ধে নামার আগেই আকাশ পুরো কালো করে ফেলেছে। হাওয়ার জোরটাও বেড়েছে। বাইরের টিনছাওয়া বারান্দায় বসে শঙ্কর একমনে দেখছিল খানিকটা দূরে গাছের ডালগুলো কেমন যেন তালে তালে গা দুলিয়ে যাচ্ছে। যেন নাচের আসরের দর্শক। মাটি থেকে লাল—লাল ধুলো উড়ছে। শঙ্করের বেশ মজা লাগে। একটা নাটকের প্ল্যান বানানো কি মুখের কথা; কত কী ঘটে যেতে পারত মাঝখানের এই সময়টার মধ্যে। হয়তো শঙ্করই মুছে যেতে পারত পৃথিবী থেকে। হ্যাঁ, মাসদশেক আগে সাপের কামড়টা যদি হাই—নেক জুতোর উপরে না পড়ে আর ইঞ্চিতিনেক উপরে উঠত, সমস্ত অ্যারেঞ্জমেন্ট তো মাঠেই মারা যেত। কিংবা সুমন্ত্র আর মিলি ওর নেমন্তন্ন স্বীকার নাও করতে পারত। হয়তো ওরাও হারিয়ে যেতে পারত এমন কোনো জঙ্গলে যেখানে কোনোদিন শঙ্কর মিষ্টির প্যাকেট হাতে নিয়ে হাজির হতে পারত না। শঙ্করের হঠাৎই নিজেকে কেমন যেন ঈশ্বর বলে মনে হতে থাকে। অন্তত দুটো মানুষের ভাগ্যের লেখা ও নিজেই স্থির করাতে পেরেছে।
বৃষ্টি নামবে নাকি! —পিছন থেকে সুমন্ত্রর গলাটা পেয়ে শঙ্কর মাথাটা ঘোরায়। তারপর বলে—উঠে পড়লে? চা খাবে তো? মিলি উঠেছে?
আরে দূর, এত ব্যস্ত হচ্ছ কেন? —সুমন্ত্র সিগারেটের প্যাকেট বের করে ওর দিকে বাড়িয়ে দেয়।
নাঃ, ছেড়ে দিয়েছি অনেকদিন। তুমি খাও।
অ্যাই শঙ্কর, তোমাদের এখানে মহুয়া পাওয়া যায় না? পেলে একবার ট্রাই করতাম। —সিগারেটের প্রথম ধোঁয়াটা ছাড়তে ছাড়তে সুমন্ত্র বলে।
যাঃ, একদম মাথায় আসেনি। কিন্তু আজ তো আর ব্যবস্থা করা যাবে না।
