কিলার ডগ, বুঝলে,—শঙ্কর বলে—অনেক কসরত করে শিখিয়েছি।
তোমার আবার কুকুর পোষার শখ জাগল কবে থেকে?—সুমন্ত্র যেন হঠাৎ চমকে ওঠার ভাবটা আড়াল করার জন্যই বলেছিল।
শখের কি কোনো নিয়মকানুন থাকে সুমন্ত্র! একটা শখ যায়, আরেকটা শখ আসে।—ব্যাগদুটো নিয়ে পাশের ঘরের দিকে যেতে যেতে শঙ্কর বলে। হঠাৎই খেয়াল হয় দরজার মুখে মিলি জবুথবু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হ্যাঁ, কুকুরে যে ওর খুব ভয়, শঙ্কর জানে।
কী হল, মিলি! ভয় লাগছে?—শঙ্করের কথাতেও মিলি উত্তর না দিয়ে ওভাবেই দাঁড়িয়ে থাকে।—কী মুশকিল হল বল দেখি রেক্স! যা, তুই ওঘরে চলে যা। তোকে বেশিক্ষণ দেখলে ম্যাডাম আবার উলটোপথে হাঁটা না লাগায়।
শঙ্করের ইঙ্গিতে কুকুরটা খুব ধীরে ধীরে ওপাশের ঘরে চলে যায়। দরজাটা ডিঙোনোর সময় একবার মুখ ফিরিয়ে অতিথিদের দিকে একঝলক তাকিয়ে দেখে। শঙ্কর শুধু দেখে মিলির মুখটা যেন রক্তশূন্য হয়ে গেছে। মিলি এমনিতেই খুব ফর্সা। কিন্তু এক বাড়িতে একটা বাঁধনছাড়া কুকুরের সঙ্গে রাত্রিবাস করতে হবে ভেবে মুখটা যেন কাগজের মতো সাদা হয়ে গেছে।
কী হল, এবারে তো এসো। ভয় নেই, আমি না ডাকলে ও আর আসবে না।
ওটাকে বাঁধলে কি খুব অসুবিধে হবে?—মিলির গলায় ভয়ের ছোপটা খুব স্পষ্ট।
তা একটু হবে বইকি—শঙ্কর হেসে ফেলে। —বেঁধে ফেললে আশপাশে কী হচ্ছে টের পেলেও যে আর ঝাঁপাতে পারবে না। চোর তো ঘুরঘুর করছেই।
বলো কী শঙ্কর, এখানেও চোর!—সুমন্ত্র যেন খুব অবাক হয়েছে।—সবাই যে বলে পাহাড় আর জঙ্গলের মানুষরা খুব সৎ হয়।
তা তো হয়ই। কিন্তু মুশকিল কী জানো, সেখানেও যে শহরের বাবুবিবিরা হানা দেয়। এই যেমন তোমরা এসেছ।
মানে!—সুমন্ত্র যেন রুখে উঠতে চাইছে,—আমরা কি চোর!
শঙ্কর হাহা করে হেসে উঠেছিল। তারপর বলল—শোনো, এতটা জার্নি করে যে এসেছ। আগে ফ্রেশ হয়ে নাও। স্নান করে খেয়ে লম্বা একটা ঘুম দাও। বিকেলে জঙ্গল দেখাতে নিয়ে যাব। এইসব জটিল কথা আলোচনার জন্য রাতটা তো পড়েই রইল। ওই ঘরটা তোমাদের জন্য। যাও, আর দেরি কোরো না।
শঙ্কর রান্নাঘর থেকেই টের পেয়েছিল স্নান সেরে মিলি সামনের ঘরে এসেছে। আগে এই সময়টায় মিলি গুনগুন করে গানের সুর ভাজার চেষ্টা করত। আজ কিন্তু তেমন কিছু টের পাওয়া যাচ্ছে না। মিলি কি আরো অনেক কিছুর মতোই এই অভ্যাসটাও ছুড়ে ফেলে দিয়েছে! রান্নাঘরের দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে শঙ্কর একবার দেখল মিলি খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ঘরটা দেখছে। না, যাদবপুরের ফ্ল্যাটটার সাথে মেলাতে গেলে ভুল তো হবেই। কোনোকিছুই কি আর আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে!
হাতে ভাতের হাঁড়িটা নিয়ে এই ঘরে ঢোকার আগে শঙ্কর একটা গলাখাঁকারি দেয়। মিলি পিছনে ফিরে শঙ্করকে দেখে চুপ করে থাকে। টেবিলে হাঁড়িটা নামিয়ে শঙ্কর খুব মৃদু স্বরে বলে—কেমন লাগছে এখানে মিলি?
মিলির মুখে একঝলক রক্ত লাফিয়ে উঠে আবার যেন নেমে গেল শিরা আর ধমনীর অন্ধকারে। কেমন একটা ধরা গলায় মিলি বলল—আমি কি তোমায় হেল্প করব?
আরে না, না,—শঙ্কর হেসেই উত্তর দিল—এটুকু নিজেই পারব। পরে হেল্প কোরো।
মিলি টেবিলটার দিকে তাকিয়ে বলল—তুমি কি এখানে একাই থাকো শঙ্কর?
একা থাকব কেন? রেক্স আছে তো।—না, কথাটার মধ্যে খুব ভুল কিছু ছিল না। একাকীত্বের নিজস্ব দুর্গের মধ্যেই বাস করবে বলে বেশ উৎসাহ নিয়ে শঙ্কর এখানে ডেরা পেতেছিল; কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই টের পেল ও হাঁপিয়ে উঠছে। তাই একটা জার্মান শেফার্ডের পুঁচকে বাচ্চচা কিনে এনেছিল জামসেদপুর থেকেই। রেক্স তখনো দুধ খায়; কোলের মধ্যেই গুটিসুটি মেরে ঘুমোয়। সময়টা ভালোই কাটছিল যতক্ষণ না বাতাসি ওকে টেনে বাইরে এনে দাঁড় করিয়েছিল। শঙ্করও অবাক হয়ে গিয়েছিল ছোট্ট রেক্সের কারবার দেখে।
কোত্থেকে একটা খরগোশ অভিযাত্রীর মতো হাজির হয়েছিল বাগানে। শঙ্করের চোখে আগে কোনোদিন পড়েনি। রেক্স ছিল বারান্দায়। সেখান থেকেই ঝাঁপ দিয়ে বাগানে নেমে খরগোশটাকে তাড়া করে গেটের ঠিক মুখে দাঁতগুলো বসিয়ে দিয়েছে গলার নলিটায়। ওর মুখের হাঁ তখনো বড় হয়নি; সেখানে তাজা রক্তের ছোপ লেগে কেমন যেন অচেনা মনে হচ্ছিল রেক্সকে।
কিলার ডগ সাব—কেনার সময় লোকটা বলেছিল বটে। আর সেইদিন শঙ্কর বুঝে গিয়েছিল, যতই কোলে ঘুমোক আর চুকচুক করে দুধ খাক, কিলার ইনস্টিংক্ট রক্তের মধ্যে ঘুমিয়ে থাকে। সময় এলেই বাইরের আবরণটা খসিয়ে আসল চেহারাটা উঠে দাঁড়ায়। তারপর থেকে শঙ্করও রেক্সকে সাধ্যমতো ট্রেনিং দেবার চেষ্টা করে গেছে। জামসেদপুরের সেই লোকটার কাছে বারবার গিয়ে শিখেছে ট্রেনিংয়ের কায়দাকানুন। নাঃ, বিশেষ কিছু ভেবে শঙ্কর রেক্সের ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করেনি। রক্তের মধ্যে আছে যখন, দেখাই যাক না, এমনটাই ও ভেবেছিল।
শঙ্করের উত্তর শুনে মিলি কী বুঝল কে জানে! আর কোনো কথা না বলে জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
জঙ্গল দেখছ? ওদিকে মাইলখানেক গেলেই একটা নদী আছে, রুরু। নদী মানে ঝোরা আর কি।
আজ দেখাবে তো—বলতে বলতে সুমন্ত্র ঘরে ঢোকে।
আরে এত জলদিবাজি করলে হবে?—শঙ্কর হেসে ওঠে।—আগে খেয়ে উঠে একটা ঘুম দিয়ে নাও। সময়ে সব হবে।
মুরগির মাংসটা খেয়ে সুমন্ত্র খুব তারিফ করেছিল। খেতে বসে মিলি আর মুখ খোলেনি। শঙ্করও কথা বলানোর চেষ্টা করেনি। সুমন্ত্রই শুধু বকবক করে যাচ্ছিল। নাটকের মূল প্ল্যানিংয়ে এইসব ছোটখাটো বিষয় ডিরেক্টাররা বাকিদের উপরই ছেড়ে দেয়। লাঞ্চ হয়ে গেলে ওরা পাশের ঘরে ঢুকে যায়। আজ ওরা বেশ লম্বা ঘুমই দেবে। ট্রেনে সাত ঘণ্টার পরে লড়ঝড়ে একটা মারুতি ভ্যানে আরো ঘণ্টা দুয়েক। তার মধ্যে অনেকটাই আবার জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যাওয়া এবড়োখেবড়ো কাঁচা রাস্তা। কোমরকে জানান দিয়ে ছাড়ে। তা—ও নেহাত শঙ্কর গাড়িটা ম্যানেজ করতে পেরেছিল। নাহলে আরো দেরি হত।
