ডোন্ট মাইন্ড,—পাশ থেকে গলাটা শুনেই চমকে উঠেছিল শঙ্কর। বেশ লম্বাচওড়া একটা লোক, স্কুটারটা স্ট্যান্ড করে দাঁড়িয়েছে। স্কুটার মানে লোকাল লোক। বাঙালি!
আজ দিনতিনেক ধরেই দেখছি আপনাকে। সারাটা দিন লেকের পাশে চুপ করে বসে থাকেন। দিমনা আর জঙ্গল আপনাকে বেশ পাকড়ে ধরেছে বুঝতে পারছি। জঙ্গলে একটা আস্তানা বানাবেন নাকি? আমার সন্ধানে আছে। একদম ভার্জিন ফরেস্ট। দারুণ একটা ছোট্ট বাড়ি আছে; মালিক মারা গেছে বলে ছেলেরা বিক্রি করে দেবে।
পরের দিনই শঙ্কর আর শ্যামল মল্লিক মানে সেই ভদ্রলোক রওয়ানা হল তামসাই। ছোট্ট বাড়িটাকে দেখে শঙ্করের একবারেই পছন্দ হয়ে গেল।
উত্তরে মাইল—তিনেক গেলেই সারান্ডা—সিংভূম রেঞ্জ; আর যদি পশ্চিমে মাইলখানেক যান, পেয়ে যাবেন রুরু নদী। ব্যস, আর কী চাই আপনার।
নিতান্ত জলের দরেই বাড়িটা কেনা হয়েছিল। শ্যামল মল্লিক তেমন কোনো কমিশনও নিতে চায়নি।—আরে দাদা, হঠাৎ করে হাজির হয়ে গেলে একটু জল—নাস্তার বন্দোবস্ত করে দেবেন।
গুছিয়েগাছিয়ে বসতে আরো প্রায় মাসচারেক। হ্যাঁ, কলকাতার সাথে সম্পর্ক একেবারে কেটে ফেলা সম্ভব না; তাই দু—তিনমাস অন্তর যেতেই হয়। সে—ও বড়জোর সপ্তাখানেক।
আমরা কি বাইরেই দাঁড়িয়ে থাকব?—এতক্ষণে মিলি কথা বলে উঠল।
এই দেখেছ! এত করে নেমন্তন্ন করে নিয়ে এলাম; আজ কিনা দরজার তালাই খুলতে ভুলে যাচ্ছি। চলো, চলো। —বাড়তি উৎসাহে শঙ্কর ওদের ব্যাগদুটোও হাতে তুলে নিয়েছিল। মিলি বাধা দিতে গেলে কোনো কথা না বলে ওর হাতটা শঙ্কর হালকা একটা ছোঁয়া দিয়ে সরিয়ে দিয়েছিল। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই শঙ্কর অনুভব করল বুকের মধ্যে কেমন একটা ধাক্কা যেন আচম্বিতে লাফ দিয়ে উঠল। আশ্চর্য! এতদিন পরেও!!
মাসখানেক আগে শঙ্কর যেদিন সুমন্ত্রর ফ্ল্যাটে হাজির হয়েছিল, মিলি সেদিন ছিল না। সুমন্ত্র প্রথমে অবাক হলেও তারপরে যেন মাঝখানে কোনো ইতিহাস নেই এমন ভঙ্গিতেই কথাবার্তা শুরু করে। শঙ্করও পুরোনো কাহিনির প্রসঙ্গ আর তোলেনি।
একটা ছোট্ট বাসা বানিয়েছি, বুঝলে,—চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে শঙ্কর বলেছিল।—জঙ্গল তো তোমাদের খুব প্রিয়। বর্ষার জঙ্গল দেখেছ কোনোদিন? আমার ওখানে চলো। পাগল হয়ে যাবে। তিনদিনে একটা নতুন কবিতার বই হয়ে যাবে।
সব ঠিক হয়ে গেল। শঙ্কর চাইবাসা স্টেশনে চলে আসবে। সুমন্ত্র ওখানে বসেই মোবাইলে ট্রেনের টিকিট রিজার্ভ করে ফেলল।
চাইবাসা স্টেশনে ট্রেনটা ঢোকার পর দেখা দিতে শঙ্কর করেই একটু দেরি করেছিল। দরজা দিয়ে প্রথম বেরিয়েছিল সুমন্ত্র, হাতে লাগেজ। আবছা অন্ধকার কামরার ভিতর থেকে মিলির মুখটা প্রকাশ্য আলোতে বেরিয়ে আসতেই ওর যেন দমবন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ও তো ভেবেছিল এই মেয়েটার সবকিছু ওর জানা হয়ে গেছে; অথচ কতকিছুই যে জানার বাকি থেকে গেল! একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলার পরে কি আর নতুন করে ভাবার কোনো সুযোগ আসে মানুষের জীবনে! ভাবতে ভাবতেই শঙ্কর সামনে এগিয়ে আসে।
এখানে আসতে মিলির ইচ্ছে ছিল না; সুমন্ত্রর চাপেই ও রাজি হয়েছিল। আবার শঙ্করের সামনে দাঁড়াতে হবে ভাবলেই ওর যেন অস্বস্তি হচ্ছিল। না, অনুশোচনা নয়, কেমন একটা অজ্ঞাত ভার ওর উপর চেপে বসেছিল। এমন অনেক ঘটনাই থাকে মানুষ আগাপাশতলা না ভেবেই শুরুতে যার সঙ্গ নেয়; তারপর একদিন সেই ঘটনায় সে নিজেই হয়ে ওঠে মূল পরিচালক। মিলিও তো আসলে তাই। কোনো অপরাধ ও করেনি ঠিকই, কিন্তু অন্য একটা মানুষের অসহায় মুখটার কথা মনে পড়লে ওর নিজেরই খারাপ লাগে।
ট্রেনে ওর ঘুম হয়নি। শঙ্করের মুখোমুখি হলে ঠিক কী যে করবে ভেবে ভেবেই সারাটা রাত চোখ বড় বড় করে হালকা নীল আলো—ফ্যানের ঘুরে চলা ব্লেড—ঠিক উলটোদিকের স্লিপারে বাচ্চচা নিয়ে ঘুমিয়ে থাকা অবাঙালি বউটাকে দেখে যাচ্ছিল। ট্রেনটা যখন স্টেশনে ঢুকছে তখন ওর যেন আর মাথা কাজ করছিল না।
শঙ্কর, এদিকে—সুমন্ত্রর কথায় ও চমকে উঠে তাকিয়েছিল সামনের দিকে। লম্বা শরীরটা কি সামান্য রোগা লাগছে? গোঁফটা আরেকটু পুরু হয়েছে, চোখদুটোও যেন খানিকটা বদলে গেছে, ভাষাটা যেন ঠিক পড়ে ওঠা যাচ্ছে না। সেই মানুষটাই, অথচ যেন সেই মানুষটা নয়। মিলির বুকের ঠিক মাঝখানে একটা হালকা ব্যথা উঁকি দিয়েই আবার মিলিয়ে গেল। গ্যাসের পেন! নাকি…
ওয়েলকাম, ওয়েলকাম বলে শঙ্কর হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল সুমন্ত্রর দিকে। তারপর মিলির দিকে ঘুরে বলল—ট্রেনে কোনো অসুবিধে হয়নি তো মিলি?
শঙ্করের মুখে নিজের নামটা শুনে মিলি যেন কেঁপে উঠেছিল। শঙ্কর এত স্বাভাবিক গলায় কথা বলছে কী করে! হাবভাবে তো টের পাওয়াই যাচ্ছে না জীবনে এতগুলো নাটকীয় পরিবর্তন হয়ে গেছে। ওর কাছে কি মিলির জন্য আর একটুও স্পেস নেই! তাহলে মিলিই বা এত ভেবে মরছে কেন! মিলি নিজেকে সামলে নেবার চেষ্টা করে বলে—নাথিং।
বাড়ির ভিতরে ঢুকে ওরা যেন চমকে উঠেছিল। একটা মস্তবড় জার্মান শেফার্ড। লম্বা জিভটা মুখের বাইরে বের করে ওদের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। দেখলেই ভয় লাগে, এই বুঝি লাগাল এক কামড়। শরীরে নড়াচড়ার কোনো ইঙ্গিত নেই। চোখের লালচে আভায় যেন পড়ে নিচ্ছে আগন্তুকদের পরিচিতি।
