আমি বিড় বিড় করলাম, একটা বেঁচে!
জগার ভাই বলল, প্যারাসুট কাপড়ের ব্যাগ— হাওয়া পাস করেনি, সব কেলিয়ে গেছে ৷
ব্যাগটা ভাঁজ করে একটুখানি ৷ সেটা হাতের থাবার ভেতর নিয়ে জগার ভাই হাওয়া হয়ে গেল ৷
দু’পা এগিয়ে বাড়ির গলিপথে দাঁড়িয়ে থাকলাম আমি ৷ ডাইনে বাঁয়ে এবাড়ি-ওবাড়ির দেওয়ালে, পায়ের নীচে কঠিন মাটি, মাথায় টুকরো করা আকাশ আর সামনে পিছনে নিরেট অন্ধকার ৷ আমি দাঁড়িয়ে থাকলাম ৷ শুধুমাত্র শ্বাস নেওয়ার জন্যে বুকটা হাপরের মতো করে নাকটা মুখটা ওপরে তুলে ধরলাম ৷
সকালে আলোদার ঠেকে যাওয়ার কথা ছিল না ৷ তবু গেলাম ৷ গিয়ে গড় গড় করে কাল রাতের কেসটা বললাম ৷
আলোদা বলল, ফালতু ব্যাপার— ছাড় তো পলু ৷
আমি বললাম, ফালতু ব্যাপার কী— দম বন্ধ হয়ে পায়রাগুলো মরে গেল!
আমার কথা শুনে অনেকে হেসে উঠল ৷
আলোদা বলল, ওগুলো গোলা পায়রা ৷
আমি চমকে উঠে আলোদাকে দেখলাম ৷ দিনের আলোর মতো চেনা আলোদাকে ইদানীং চন্দননগর চন্দননগর লাগে ৷ আলোদার সব কিছু যেন এখন টুনি বালবের নকশা ডিজাইন করা ৷ জ্বলছে নিভছে ৷ নিভছে জ্বলছে ৷
আমি বললাম, গোলা পায়রার জন্যে তোমার কোনো দুঃখ হয় না?
আলোদা দু’হাতে মুখ মুছল ৷ তারপর খুব শান্ত গলায় বলল, তোর প্রতি আমাদের অনেক আশা পলু! আমি তো সবাইকে বলি, পলু আমাদের অনেক বড় হবে ৷ একদিন আমরা গর্ব করে বলব তোর কথা ৷ বলব, পলু আমাদের ছেলে! আজ কত বড় হয়েছে!
আমি বললাম, কত বড় আলোদা? লক্কা হয়ে মেঘ ধরব, না হোমর হয়ে চাঁদ ধরব?
ঠান্ডা চোখে আলোদা বলল, তুই কেন পায়রা হবি?
— কেন হব না? হয় গোলা, নয় লক্কা, নয় হোমর ৷ উইন্ডচিটার, বা প্যারাসুট কাপড়ে তেমন কোনো তফাত নেই আলোদা ৷
আলোদা কোনো কথা বলল না ৷ আলোদার গলায় ঘাম ৷ নাকের পাটা ফুলছে ৷ রগের চামড়ার নীচে সেই ঠেলে ওঠা রাগের পোকা ৷ দাঁতে দাঁত চেপে আলোদা কঠিন হয়ে বসে থাকল ৷
বেলা গড়িয়ে যায় ৷ ঠেক ভাঙলে একসঙ্গে উঠি ৷ দোতলা থেকে একতলা নীচে নামার সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে আলোদা আমার কাঁধে হাত রাখল ৷ ফিসফিস করে বলল, তবে গোলা পায়রাকেও বেড়ালে খেলে আমার বড় জ্বালা! এই বয়সেও আবার বেড়াল শিকারে যেতে হবে ৷
এক পা এক পা করে সিঁড়ি ভাঙি ৷ আমি কি এখন আলোদাকে বলতে পারি, ঠিকই তো বাঘের এলাকায় বিড়াল ঘুরবে তা হয় না! আমি কি এখন আলোদাকে বলতে পারি, বাঘ আর বেড়াল একই!
না বলতে পারি না ৷
আলোদার বাইক গর্জন করে ছুটে গেলে সাদা কালো ফিনফিনে ধোঁয়ায় দাঁড়িয়ে থাকি ৷
চিত্রনাট্য – সুজন ভট্টাচার্য
বন্ধ জানলার ওপার থেকে বৃষ্টির শব্দটা পরিষ্কার শোনা যাচ্ছে। বাড়িটার সামনে টিনের শেডটার উপরে হুড়মুড় করে জল আছড়ে পড়ছে বলে শব্দটা বেশ জোরেই বাজছে। বাইরের অন্ধকার আর কিছু টের পাবার উপায় নেই। এমনিতেই বাড়িটা একটেরেয়া। দিনের বেলাতেই লোকজনের খুব একটা দেখা মেলে না। সন্ধে নামলে আস্তে আস্তে চারপাশের অন্ধকারে বাড়িটাকে গিলে ফেলতে শুরু করে। নিজস্ব আলোটুকু দূর থেকে যেন আকাশের তারার মতোই লাগে। সুমন্ত্র এখানে পা দিয়েই তাই বোধহয় বলেছিল—বাড়ি করার আর জায়গা পেলে না শঙ্কর! রাতবিরেতে একটা কিছু হয়ে গেলে কেউ তো টেরও পাবে না।
শঙ্কর হাহা করে হেসে উঠেছিল—টের না পাওয়াই তো ভালো গো সুমন্ত্র। সবকিছু ঠিকঠাক নেমে যাবে প্ল্যানমাফিক; অথচ কেউ টেরটিও পাবে না, এমনটাই তো চাই।
তোমার কথা বোঝা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কম্মো না,—সুমন্ত্রও হেসে ওঠে।
জানলার পর্দাটা সামান্য সরিয়ে শঙ্কর বাইরে চোখ রাখে। নাঃ, বৃষ্টির ফোঁটাগুলোও নজরে আসছে না। এমন একটা জায়গা খুঁজে বের করতেই তো কতটা সময় চলে গেল ওর। চাইবাসা স্টেশন থেকে সরাসরি যাবার মতো গাড়ি নেই। জঙ্গলের ট্রাক আর পায়ে হাঁটাই সম্বল। পশ্চিম সিংভূম জেলার গভীর অরণ্যের মাঝখানে তামসাইয়ের এই বাড়িটার সংবাদ ও পেয়েছিল জামসেদপুরেই। যাদবপুরের ফ্ল্যাটে একা একা থাকা তখন ওর পক্ষে প্রায় অসহ্য হয়ে উঠেছে। ভিতর থেকে একটা শূন্যতা যখন হঠাৎই লাফ দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে, তখন তাকে হজম করা সবার পক্ষে সম্ভব হয় না। কলকাতার পাট প্রায় চুকিয়ে শঙ্কর তাই তখন ঘুরে বেড়ায় এখানে—ওখানে।
জামসেদপুরে দিমনা লেকের ধারে লোকটার সাথে আচমকা আলাপ হয়েছিল। শঙ্কর তখন একটা চেয়ারে বসে একমনে দেখে যাচ্ছিল একটা কাপলকে; বউটার খিলখিল হাসি বুঝিয়ে দিচ্ছে তার পরিবর্তনের বয়েসটা খুব বেশি নয়। মিলিও এমনি করেই ঝিলিমিলিয়ে হাসত। ওরা হানিমুনে গিয়েছিল পেলিং। কাঞ্চনজঙ্ঘা ফলসে শরীর ভেজানোর জন্য মিলি যেন পাগল হয়ে উঠেছিল।
তুমি কি পাগল হয়ে গেলে নাকি!—শঙ্কর একটা সময় বিরক্তই হয়ে উঠেছিল।
জেনেশুনেই তো একটা পাগলিকে ঘরে নিয়ে এসেছিলে মশাই—মিলি চোখ ঘুরিয়ে বলেছিল,—এখন রেগে গেলে চলবে! —মিলির এই উচ্ছ্বাসটাই শঙ্করকে সবথেকে বেশি টানত। রাশভারী বাবা আর ডিপ্রেশনের পার্মানেন্ট পেশেন্ট মার সাথে থাকতে থাকতে শঙ্কর যেন শিখে নিয়েছিল আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করাটাই হল ভদ্রতা। বিয়ের পরে মিলি যেন জীবনের খাতার একেকটা পাতা উলটে ওর সামনে নতুন করে পড়াতে শুরু করেছিল।
