ইদানীং আমার পাড়ার বন্ধুরাও তাই করে ৷ ওদের সঙ্গে তাল রেখে আমিও করি ৷ তাতে রেজাল্ট বেশ ভালো! আমার দিকে সবাই কেমন এক সম্ভ্রমের চোখে তাকায় ৷ এলাকার নতুন কেউ আমার সঙ্গে মিশলে, প্রথমে ঢোঁক গিলে, তারপর পারমিশন নিয়ে বলে— ওদের সঙ্গে কী করে মেশেন?
ওরা মানে আলোদা? ওরা মানে আমার বন্ধুরা— আলোদার ছেলেরা ৷
এসব কথায় এখন আমি দারুণ হাসতে শিখেছি ৷ হাসতে হাসতে প্রশ্নকারীকে এক গোলকধাঁধায় ফেলে দিই! সে তার সমস্ত চিন্তাভাবনা নিয়ে গোলকধাঁধায় ছোটাছুটি করে ৷ আমি হেসে যাই ৷ হাসতে হাসতে চেপে যাই ওদের সঙ্গে মিশে আমি বড় হয়েছি, বাঁচতে শিখেছি! এসব কথা চেপে আমি বলি— আমি কাজের স্বার্থে মিশি! আর তারা সাহস পেয়ে বলে, ওরা আপনার লেখার সোর্স— তাই বলুন! ঠিক সন্দেহ করেছি ৷
যথারীতি আমি হাসি ৷ এ হাসিটা আমি আলোদার কাছ থেকে শিখেছি ৷ এই হাসিতে নিজেকে চেপে যাওয়ার কথাটাও আমি আলোদার কাছ থেকে রপ্ত করেছি ৷
এ কায়দায় আলোদা ওদের মদো মাতালের টিম বলে ঘেন্না ঘেন্না করে ৷ অ্যাকশনের মারকুটে ছেলেদের লোহালক্কড়-এর টিম বলে নির্লিপ্ত মুখে তাকায় ৷ যেন এরা আলোদার কেউ নয় ৷ যেটুকু তা শুধু বিরক্তি ৷ এ চালে নতুন যারা তারা খুব ঘাবড়ে যায় ৷ আমরা আলোদার ডায়ালগে হো হো করে হাসি ৷
আর অলোদা মুখোশ টিমকে দেখিয়ে বলে, ওদের কাছ থেকে শেখ ৷ আমরা বুঝি, ইদানীং এদের কাছ থেকেই আলোদা বেশি শেখে ৷ এটা অন্য ছেলেরা শিখবে কী করে, শিখতে গেলে যে বাবার টাকা লাগে ৷ আসলে আলোদা নিজেকে আড়াল করে ৷
আমিও নিজেকে আড়াল করি ৷ পুরনো বন্ধুদের কাছে ভদ্র ভালো ছেলে হয়ে যাই ৷ অফিসে গুলি বোমা ছুরির গল্প করি ৷ হৈমন্তিকার কথা ভাবতে ভাবতে গিতুর শরীরে মুখ গুঁজে থাকি ৷
আসলে আড়ালের ওপারে আমি ৷ আড়ালের এপারে আমি ৷ আমি নিজেকে দেখি ৷ কোথায় যেন একটা চোরা টান৷ ফলে অমাবস্যায় পূর্ণিমায় দিকভ্রান্তের মতো ফুলে ফেঁপে ছুটি ৷ মদো-মাতালের টিমে ভিড়ে গিয়ে গেলাসে মুখ থুবড়ে বসি ৷
বোতল থেকে মদের সঙ্গে গেলাসে গেলাসে নোটনের কথা বিলি হয়ে যায় ৷ যথারীতি নোটনের কথায় গলা-বুক জ্বালিয়ে মদ ঢালি ৷ গেলাসে কালচে-লাল তরল ৷ ঝটকা মেরে দেখি নোটনের গলায় ফাঁস হয়ে বসা উইন্ডচিটারের রং কি এমনই ছিল? চিৎকার করি, গেলাসের রংটা ফিকে করে দে ৷ জল ঢাল ৷ তবু পেটের গহ্বরে চলে যেতে গিয়ে সে তরল গলা রুদ্ধ করে ৷ মনে হয় ফিকে লাল একটা উইন্ডচিটার! তবে কি নোটন একা নয় আমাদেরও শ্বাস বন্ধ করে দিচ্ছে রংবেরঙা এক একটা উইন্ডচিটার ৷
তিন
এরকমই একটা ছুটির দিনে ঠেকে যাব না, যাব না করে চলে গেছি ৷ তার আগে সন্ধেবেলা গিতুর শরীরে শরীর রেখে হৈমন্তিকার দিকে মন উড়িয়ে দিয়েছি ৷ ফিসফিস করে গিতুকে বলেছি, আমাকে ছেড়ে দে ৷
গিতু বলল, চলো বিয়ে করি ৷
— আমার কিছু ভালো লাগছে না ৷
গিতু বলল, তখন রোববারের জন্যে হা পিত্যেস করে বসে থাকতে হবে না, রোজ পাবে ৷
আমি বললাম, আমি তোমায় ভালোবাসি না! খালি মনে হয় তুমি আমার গলা টিপে ধরেছ ৷
গিতু আমাকে গা থেকে ঝটকা মেরে ফেলে লাথি ছুড়ল ৷ বলল, তবে রোববার হলেই এসে মুখ রগড়াও কেন? বিষ ওগরাতে!
আমি কোনো কথা বললাম না ৷
গিতু বলল, এবার বলো, কে কার গলা টিপল!
ঠেকে এসে না না করেও নেশা চড়িয়ে ফেললাম ৷ উইন্ডচিটার-রঙা মদ! খাচ্ছি আর ভাবছি, কে কাকে গলা পেঁচিয়ে মারছি— গিতু আমাকে? না আমি গিতুকে?
গলায় হাত বোলাতে বোলাতে ঠেক থেকে বাড়ি ফিরছি ৷ আমাদের বাড়ির সামনে লাফরা জগার ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল ৷ আমাকে দেখে লাফরা জগার ভাই দাঁত কেলিয়ে বলল, পলুদা ঠেক থেকে ফিরছ? নিশ্চয় পোগ্গাম ছিল?
আমি দেখলাম জগার ভাইয়ের হাতে কালো রঙের ব্যাগ ৷ ব্যাগের ভেতর কী যেন ধড়ফড় করছে ৷ বুঝলাম কারও বাড়ি থেকে নির্ঘাৎ কিছু ঝেড়ে নিয়ে যাচ্ছে ৷ আমি বললাম, ব্যাগে কী রে?
ও আমার কথা শুনেই কেটে যেতে যেতে বলল, কাল বলব ৷
আমি খপ করে ওর চুলের মুঠি চেপে ধরি ৷— পেটে এক লাথি মারব ৷ কী নিয়ে যাচ্ছিস আগে দেখা ৷
লাফরা জগার ভাই তেরিয়া হয়ে বলল, তুমি কিন্তু মাল খেয়ে বাওয়াল করছ পলুদা ৷
—তুই আমার বাড়ির সামনে থেকে চুরি করে যাবি, আর আমি তোকে ছেড়ে দেব ৷ কথা শেষে ওর গালে একটা চড় কষালাম ৷
চড় খেয়েই ও বলল, ঠিক আছে— তুমি আমাকে ছেড়ে দাও, মাল খালাস করে দিচ্ছি ৷
আমার সামনেই ও ফস করে ব্যাগের চেন টানল ৷ ব্যাগটা খুলতেই দেখলাম— ভেতরটা নিশ্চুপ অন্ধকার! জগার ভাই ব্যাগের মুখ হাঁ করে বলল, নিয়ে নাও ৷ ব্যাগটা আমার ৷
ব্যাগের পেটের অন্ধকারে আমার কেমন গা শিরশির করছে ৷ আমাকে ভেতরে হাত দিতে বলছে, কী আছে ভেতরে? হাত দিলে কি কামড়ে দেবে? এ শালা আমাকে কামড় খাওয়াতে চাইছে!
আমি দাঁত ঘষটে বললাম, চালাকি করছিস আমার সঙ্গে!
জগার ভাই বলল, চালাকির কী আছে ৷ বলেই ও ব্যাগ উলটে দিল ৷ ব্যাগের ভেতর থেকে থস থস করে দুটো নিষ্প্রাণ পায়রা পড়ে গেল মাটিতে ৷ আর একটা মাটিতে পড়ে মুখ রগড়ে ঝটপট করে উঠল ৷
আমি কিছু বলার আগেই ধপ করে মাটিতে বসে পড়ল জগার ভাই তারপর দুটো পায়রাকে হাতে নেড়ে চেড়ে বলল, মালগুলো মরে গেছে পলুদা ৷
