আমরা শুনছি আর আশ্চর্য হচ্ছি ৷ —আরে এ যেন হুবহু আমাদের সেই বলে দেওয়া কথা ৷ আমাদেরই এঁকে ফেলা নকশা! সেই পোস্ট অফিসের উলটো দিকের গলি ৷ সেই মদ খেয়ে বাড়ির দিকে হেঁটে যাওয়া মাতাল নোটন ৷ মধ্যরাত ৷ ওরা নোটনকে ডেকেছিল ৷ বলেছিল, নোটন এসো একটু খেয়ে যাও ৷
মদলোভী নোটন ‘না’ ‘হ্যাঁ’ করে বসেছিল ওদের সঙ্গে ৷ তারপর সুযোগ বুঝে একজন ওকে জড়িয়ে ধরে ৷ আর একজন পরনের উইন্ডচিটার খুলে হাতা দিয়ে ফাঁস দিয়ে দেয় নোটনের গলায় ৷ তার আগে কী একটা ব্যাপার নিয়ে নোটনের সঙ্গে ঝামেলা লেগেছিল ওদের ৷ কী নিয়ে ওই ঝামেলা তা জানার আমাদের আগ্রহ নেই ৷ কারণ ঝামেলাটা ফালতু! ঝামেলাটা স্রেফ গেম প্ল্যান ৷ পোস্ট অফিসের গলিতেই নোটন মরেছে ৷ তারপর ওকে টানতে টানতে ফেলে দিয়েছে দূরে ৷
কী আশ্চর্য আমরা— আলোদার কথা মিলে গেছে ৷ নোটনকে মেরেছে সেই ছক্কা ৷ আর মারতে একটাও দানা খরচ করেনি ৷ সেরেফ উইন্ড চিটারের ফাঁস, ব্যস!
মদ খেতে খেতে মরে এসেছিল নোটন ৷ ওর হাত পা কাঁপত ৷ ওর কথা জড়িয়ে যেত ৷ ওর মুখের চামড়া তেলা আর লাল হয়ে গিয়েছিল ৷ আলোদা বলত, ওর নম্বর লেগে গেছে ৷
আমরা হাসতাম ৷ নোটনও হাসত ৷ নোটন বলত, মদ খেয়েই তো অ্যাকশন করেছি— এখন অ্যাকশন নেই বলে মদ ছেড়ে দেব? আর যে দিন থেকে লাইনে এসেছি সে দিনই নম্বর লাগিয়ে এসেছি ৷
এই লাইন কথাটা আলোদা বলত ৷ লাইন কথাটা নোটনও অবলীলায় বলতে পারত ৷
নোটনের লাইনে কেমন যেন আলো আর আঁধার থাকত ৷ সেখানে কেমন যেন ঘোর ঘোর এতোল বেতোল পা ফেলা ৷ যেন উলটো দিকে ঊর্ধ্বশ্বাসে ট্রেন ছুটে আসছে ৷ দু’চোখ অন্ধ করে দেওয়া তার আলো ৷ গম গম চাকার ঘষটানিতে মৃত্যুর গান ৷
আগে লাইনের কথায় রোমাঞ্চ হত ৷ অ্যাকশন করতে পারতাম না ৷ কিন্তু অ্যাকশনের কথায় ছটফট করতাম ৷ মারপিটের গল্প পেলে হাঁ করে বসে গিলতাম ৷ কী ভয়ঙ্কর এক একটা গল্প! ওরা চিল্কাদের সঙ্গে লড়ছে ৷ কীভাবে আলোদা একা একা ওদের এলাকায় ঢুকছে, এ হাতে রিভলভার, ও হাতে বোম ৷ ওরা যিশু নয়নদের সঙ্গে লড়ছে ৷ রাত নামলেই এলাকা কুরুক্ষেত্র ৷ টান টান উত্তেজনা ৷ দিনে সবার দেখা পাওয়া যায় না ৷ সন্ধে নামলেই সবাই জড়ো হয় ৷ তারপর চিল্কা এলাকা ছাড়ল ৷ যিশু-নয়নও হাওয়া ৷ আলোদা বলে, পিসফুল এলাকা! আলোদা বলে, কিন্তু আমাদের লাইফ পিসফুল নয় ৷ যে-কোনওদিন যে-কেউ সদর দরজার সামনে মার্ডার হয়ে যাবে ৷ কে কোথায় আমাদের কী গেম সাজাচ্ছে আমরা জানি না ৷
আলোদার কথায় আমার ভয় করত ৷ মনে হত আমারও যেন মৃত্যু বাঁধা ৷ ছুরি গুলি বোমা ৷ বোম গুলি ছুরি ৷
এখন এসব কথা শুনলে গা গুলিয়ে ওঠে ৷ মনে হয় সব যেন অচেনা ৷ আমি ক্রমশ সরে আসছি ৷ চার বেলা বাড়িতে খাই ৷ ইদানীং অন্ধকারে ওদের মুখগুলো বড় অচেনা ঠেকে! আলোয় এলে ওদের চেনার চেষ্টা করছি ৷ ওরা কি আলো আর অন্ধকারে পালটে পালটে যায়? কেমন সবাই বলে আমারও কি তাই মনে হয়? তবু যাই ৷ ঘুরে ফিরে ওদের কাছাকাছি চলে যাই ৷ নাইট ডিউটি থাকলে সকালে যাই ৷ ছুটির দিনে রাতে ৷ পাড়ার মেয়ে গিতুর সঙ্গে প্রেম করি ৷ করি না করতাম— কে জানে? সারা সপ্তা ধরে গিতুকে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করি ৷ ভুলে যাই ৷ কিন্তু ছুটির দিন সন্ধেবেলা গিতু ঠিক টেনে নেয় আমাকে ৷ আগে ওকে নিয়ে বন্ধ ই সি এলের ভেতরে ঢুকতাম ৷ এখন গ্ৰুপের কারোর নির্মীয়মাণ ফ্ল্যাটবাড়িতে ঢুকে পড়ি ৷ মিস্তিরিদের কাছ থেকে মাদুর নিয়ে তিনতলা, চারতলায় উঠে যাই ৷ আমি ক’টা খবরের কাগজ নিয়ে আসি ৷ মাদুরে পেতে দারুণ বিছানা করে ফেলি ৷ গিতু আনে মশার জন্যে কয়েল ৷ আমি তখন ওর শরীরে মুখ রগড়াই ৷ গিতু আমাকে প্রশ্রয় দিতে দিতে বলে— এবার একটা ফ্ল্যাট কেনার ধান্দা করো ৷ চার তলায় নেবে ৷ টপ ফ্লোর৷ আমরা জানলা খুলে শোব ৷ অত ওপরে মশা থাকবে না ৷
আমি গিতুর ওপরে শুয়ে হৈমন্তিকার কথা ভাবি ৷ ক্রেডিট কার্ডের চেক নিতে আসা হৈমন্তিকাকে ব্যাপক লাগে ৷ ফোনে গল্প করি ৷ ও মোবাইলে মেসেজ পাঠায় ৷ আমি কাজের ফাঁকে আঙুল আর নখে উত্তর দিই ৷ এমন উত্তর যাতে দু’রকম মানে হয় ৷ বন্ধু বললে বন্ধু, অন্য কিছু হলে অন্য কিছু!
নীচে নামার সময় গিতুকে বলি, আগে যাও ৷
গিতু ফুঁসে ওঠে, কেন আমরা কি চুরি করছি?
— ফাঁকা বাড়ি থেকে একসঙ্গে বেরিয়ে শুধু শুধু কেস খাবার কোনো যুক্তি নেই ৷
গিতু তেড়িয়া হয়ে জবাব দেয়, যারা কেস দেবে তারা তো হয় ঝি নয় অন্যের বউ নিয়ে ঢোকে! তুমি কি তাই? আমরা সবার সামনে দিয়ে প্রেম করব ৷
গিতু বোঝে না ৷ ও বড় রাস্তায়, আলোতে এসেও আমার শরীরের সঙ্গে মিশে হাঁটতে চায় ৷ অন্যদের দেখিয়ে দেখিয়ে জোরে জোরে হাসে ৷ এটা খাওয়াবে? ওটা খাওয়াবে— করে বায়না জোড়ে ৷ টাকা দিয়ে কেটে আসি ৷
এ সময় আমার মানি ব্যাগে বেশি টাকা দেখলে গিতু কেমন ভয় পায়! বলে, এত টাকা নিয়ে মাল খেতে যাচ্ছ? আমার কাছে রেখে দাও— কাল নিয়ে নেবে ৷
আমি যে গিতুকে বলতে পারি না, কাল যে তোমাকে ভুলতে চাই! এই রাত থেকেই তোমাকে ভুলে যাওয়ার অভ্যেস করব! গিতু জানে না, আজ ওর নগ্ন পিঠে আমি একটা একটা আঙুল আর নখ ছুঁইয়ে হৈমন্তিকার জন্যে মেসেজ ভাসিয়েছি! এ সপ্তাহে আমার দুদিন নাইট ডিউটি ৷ নাইট ডিউটির সময় হৈমন্তিকার সঙ্গে দেখা হয় ৷ ও আমাকে ওর অফিসের অনেকের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছে ৷ আমি বুঝি ও কোথাও আলাপ করানোর সময় আমার আগে আমার অফিসের নামটা বলে ৷ খবরের কাগজের নামে কেমন এক জাদু আছে!
