গোপালবাবু হেসে বললেন, ‘কবে অসুখ করবে তার জন্য এখন থেকে বিয়ে করে বসে থাকতে হবে? অসুখ সামলাতে মানুষ ইনসিওরেন্স করে শুনেছি ৷ হেলথ ইনসিওরেন্স ৷ বিয়ে করে বলে তো শুনিনি ৷’
‘ঠাট্টা করবেন না গোপালদা ৷ বিয়েটা সত্যি করে নিন ৷ আপনার জন্য না করলে অন্তত আমার জন্য করুন ৷’
গোপালবাবু অবাক হয়ে বললেন, ‘তোমার জন্য আমি বিয়ে করব! কথাটার মানে কী! তোমার কি মাথা খারাপ হল নাকি!’
মন্দিরা গোপালবাবুর দিকে এক ঝলক তাকিয়ে মুখ নামিয়ে নিল ৷ বলল, ‘আমার একজন সঙ্গী দরকার ৷ আপনার বিয়ে হলে আপনার গিন্নি আমার সঙ্গী হবে ৷ তার সঙ্গে গল্প করব, শপিং করব, সিনেমায় যাব ৷ সারাদিন একা থাকি ৷ আপনার বন্ধু তো মাসের আদ্দেক দিন বাইরে বাইরে ঘোরে ৷’
গোপালবাবু খুব একচোট হাসলেন ৷ বললেন, ‘ও এই কথা ৷ সেটা আগে বলবে তো ৷ আসলে ভবেশ বিজনেসের জন্য ট্যুরে যায় বলে তোমার প্রবলেম হচ্ছে ৷ ইউ ফিল লোনলি ৷ আজই আমি ওকে বলব, এবার থেকে তুই অফিসে থাকবি, বাইরের কাজ আমি করব ৷ বিয়ে করা থেকে বাইরে ঘুরে কাজ করা অনেক সহজ ৷ ভবেশকে দেখে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি ৷’
কথাটা বলে আবার এক চোট হাসলেন গোপালবাবু ৷
মন্দিরা ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলে বলল, ‘দেখুন যদি পারেন ৷ মনে হয় না পারবেন ৷’
মন্দিরাই ঠিক বলেছে ৷ গোপালবাবু বন্ধুকে রাজি করাতে পারলেন না ৷ ভবেশ পোড়েল হাত-পা ছুড়ে বললেন, ‘খেপেছিস! ওসব ঘরে বসা কাজে আমি নেই ৷ তাহলে রইল তোর বিজনেস, আমি চললাম ৷’
গোপালবাবু বললেন, ‘আহা, তুই মন্দিরার কথাটা তো একবার ভেবে দেখবি ৷ বেচারির একা লাগে ৷’
ভবেশ পোড়েল তেড়ে ফুঁড়ে বললেন, ‘এ আর কেমন কথা ৷ বিয়ের আগে জানত না, আমাকে বাইরে বাইরে ঘুরতে হয়? ওটাই আমার কাজ ৷ ওর কথা বাদ দে তো ৷ অনেকদিন পরে বিজনেস খানিকটা স্পিড পেয়েছে ৷ কোম্পানির নামডাক হয়েছে ৷ এখন যত অর্ডার ধরে আনতে পারব তত লাভ ৷ এখন ঘরে বসে বউয়ের সঙ্গে এক্কা দোক্কা খেলার সময় নয় ৷’
গোপালবাবু বোঝানোর চেষ্টা করলেন ৷ বললেন, ‘তবু, মেয়েটার কথা তো একটু ভাববি ৷’
গোপালবাবুকে থামিয়ে দিয়ে ভবেশ পোড়েল বললেন, ‘ওসব ফালতু ভাবনা নিয়ে তুই বসে থাক ৷ মন্দিরার একা লাগলে তুই সামলাবি ৷ আমাকে টানবি না ৷ আমাকে মন দিয়ে কাজ করতে দে ৷’
‘তুই অকারণে উত্তেজিত হচ্ছিস ৷ ব্যবসা তো আমিও করছি ৷ মন দিয়েই করছি ৷’
ভবেশ পোড়েল হাত ছুঁড়ে বললেন, ‘বলছি, তোর বিষয় তুই বোঝ ৷ আমাকে জড়াবি না ৷’
গোপালবাবু নিজের ‘বিষয়’ নিজে বুঝলেন ৷ শুধু গোপালবাবু নন, মন্দিরাও বুঝল ৷ ভবেশ পোড়েল ট্যুরে গেলে গোপালবাবু মাঝে মধ্যে ‘একা মন্দিরা’র কাছে চলে আসেন ৷ গল্প করেন ৷ ডিভিডি চালিয়ে সিনেমা দেখেন ৷ উত্তম-সুচিত্রার সিনেমা ৷ পথে হল দেরি, শেষ রক্ষা, শাপমোচন ৷ মন্দিরা এটা সেটা করে এনে গোপালবাবুর পাশে রাখে ৷ গরম গরম বেগুনি, মাছের ডিমের বড়া, গাজরের হালুয়া ৷ গোপালবাবু বলেন, ‘মন্দিরা তুমিও এসো না ৷ আমার সঙ্গে সিনেমা দেখবে ৷’
মন্দিরা হেসে বলে, ‘দাঁড়ান আসছি ৷’
মন্দিরা ফিরে আসে ৷ হাতে তোয়ালে সাবান ৷ বলে ‘যান আগে বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে আসুন তো ৷ অফিস করে এসেছেন ৷ মাগো! গায়ে বিটকেল গন্ধ ৷’
গোপালবাবু গদগদ গলায় বলেন, ‘স্নান করলে ভালো হত ৷’
মন্দিরা স্বাভাবিক গলায় বলে, ‘ওমা করুন না ৷ কে বারণ করেছে? আমাদের জলের কোনও প্রবলেম নেই ৷ আপনি বরং এক কাজ করুন গোপালদা, আপনার বন্ধুর একটা লুঙ্গি নিয়ে যান ৷ স্নান সেরে পরে নেবেন ৷ হ্যাঙার দিচ্ছি নিজের প্যান্ট-শার্টটা ঝুলিয়ে রাখুন ৷ বেরোবার সময় চেঞ্জ করে নেবেন ৷ আর শুনুন মশাই, স্নানের পর একটু পাউডার ব্যবহার করতে শিখুন দেখি ৷ বিয়ে করেননি বলে পাউডারও দূরে সরিয়ে রাখবেন নাকি?’
মন্দিরা হি হি করে হাসে ৷ গোপালবাবুর ভালোই লাগে ৷ স্নান সেরে, পাউডার মেখে তিনি বন্ধু ভবেশ পোড়েলের লুঙ্গি পরে সিনেমা দেখতে বসেন ৷ মন্দিরা পাশে এসে বসে ৷ নাক টেনে বলে, ‘আঃ, কী সুন্দর ৷’
গোপালবাবু হেসে বলেন, ‘আমি নই, সুন্দর তোমার সাবান, পাউডার মন্দিরা ৷’
মন্দিরা হাসতে হাসতে গোপালবাবুর গায়ে পড়ে যাওয়ার জোগাড় হয় ৷ কিন্তু পড়ে না ৷ কাঁধ, বুক, পেট, থাইয়ের ছোঁয়া লাগে ৷ একটু নরম নরম, একটু পাপ পাপ, একটু শিরশিরানি ৷ গোপালবাবু ভেতরে ভেতরে চমকে ওঠেন ৷ নারী শরীর বুঝি এরকম! তিনি সরে বসবেন ভাবেন ৷ সরেন না ৷ ঠিক করেন, পরেরদিন হাসির কোনও সিনেমা আনবেন ৷ মন্দিরা আবার হাসতে হাসতে গায়ে পড়বে ৷
এই যে বউকে বন্ধুর হাতে রেখে ঘন ঘন বাইরে চলে যাওয়া এটাও কি ভবেশ পোড়েল এক ধরনের বিশ্বাস থেকে করে না? অবশ্যই করে ৷ গোপালবাবু জানেন ৷ এর জন্য মাঝেমধ্যে বন্ধুর ওপর তার রাগও হয় ৷ তিনি মনে করেন, একে বলে গাধার বিশ্বাস ৷
নিতাই বলল, ‘কী হল? বললেন না, আপনার বন্ধু আপনাকে বিশ্বাস করে?’
গোপালবাবু মুখ নামিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, করে ৷ খুবই করে ৷ ভবেশকে কেন সরাতে চাইছি আপনি কি জানতে চান নিতাইবাবু?’
নিতাই মুখ দিয়ে চুকচুক ধরনের আওয়াজ করে বলল, ‘না ৷ তাতে কাজের কোনও হেরফের হয় না ৷ কারণ হাজারটা হতে পারে, কাজ একটাই ৷ ধরুন, আপনি আপনার বন্ধুর বউকে নিয়ে ভাগতে চান সেই কারণে বন্ধুকে শেষ করতে চাইছেন ৷ অথবা ব্যবসা থেকে দীর্ঘদিন টাকা সরিয়ে এখন ভয় পেয়ে গেছেন ৷ বুঝতে পারছেন এবার পার্টনারকে ছিক করতে না পারলে বিপদ ৷ সে ধরে ফেলবে ৷’
