কথাটা বলার সময় গলার কাছে হাত তুলে গলা কাটার ভঙ্গি করল নিতাই ৷ তারপর আবার শুরু করল ৷
‘কিছু মনে করবেন না গোপালবাবু ৷ কিছু না জেনে, দুটো কারণ বানিয়ে বললাম ৷ এরকম আরও হাজারটা কারণ বলতে পারি ৷ একে পুলিশের ভাষায় বলে মোটিফ ৷ কজ অব ক্রাইম ৷ আমাদের কজ জেনে লাভ নেই ৷ কারণ বানানো হোক, কল্পনা হোক, সত্যি হোক, কাজের কোনও তফাত হবে না ৷ গুলি চালালে গুলি, ছুরি চালালে ছুরি ৷ সুতরাং আমরা কখনোই কারণ জানতে চাই না ৷’
গোপালবাবুর চোখ কপালে ওঠার জোগাড় ৷ তার বুকের ভেতরটা ধকধক করছে ৷ নিতাই কারণ জানল কী করে! মনের কথা পড়তে পারে নাকি লোকটা? হয়তো পারে ৷ এরা ভক্ত মানুষ ৷ ধন্মকম্ম করে ৷ কত রকম ক্ষমতা আছে কে জানে! একটা নয়, নিতাই যে দু-দুটো কারণ বলল, দুটোই ঠিক! তবে মন্দিরাকে নিয়ে পালানোর কোনও পরিকল্পনা নেই ৷ রয়ে সয়ে বিয়ে করার পরিকল্পনা আছে ৷ পরিকল্পনার কথা মন্দিরা কিছু জানে না ৷ তাকে বলাও হয়নি ৷ স্বামীর মৃত্যুর পর বছরখানেক শোকের মধ্যে থাকুক ৷ তারপর ঝোপ বুঝে বললেই চলবে ৷ তাড়াহুড়ো করলে মন্দিরা সন্দেহ করবে ৷ তবে ঘটনার কয়েকমাস পরই ওকে ব্যবসায় পার্টনার করে নেওয়ার কথা ভাবা হয়ে গেছে ৷ ভবেশ পোড়েলের জায়গায় ৷ সহানুভূতি পার্টনার ৷ বাইরের লোক খুশি হবে ৷ বলবে, মানুষটা বন্ধুকে সত্যি ভালোবাসত ৷ চিন্তা একটাই ৷ মন্দিরা বিজনেসের কাজ কতটা পারবে? কেনই বা পারবে না? মেয়েরা আজকাল সব পারে ৷ তাছাড়া মন্দিরা বুদ্ধিমতী ৷ তার সবকাজেই ইন্টারেস্ট আছে ৷ ব্যবসাতেও আছে ৷ ইতিমধ্যেএকটু-আধটু জানতে শুরু করেছে ৷ লাভ কত? লোকসান কত? এইসব ৷
গোপালবাবু একদিন জিগ্যেস করলেন, ‘ব্যবসার লাভ-লোকসানের খবর নিয়ে তোমার লাভ কী মন্দিরা?’
মন্দিরা দু-হাত তুলে আড়মোড়া ভাঙে ৷ তার আড়মোড়া ভাঙা নিয়ে গোপালবাবুর আগে কখনও মাথা ব্যথা ছিল না ৷ আড়মোড়া ভাঙা কোনও মাথাব্যথার জিনিস নয় ৷ কেন জানি ইদানীং হয়েছে ৷ মন্দিরা দু-হাত তুলে আড়মোড়া ভাঙলেই আড়চোখে দেখতে ইচ্ছে করে ৷
মন্দিরা বলল, ‘বাঃ, সতীন কেমন জানব না?’
গোপালবাবু বোকার মতো হেসে বললেন, ‘সতীন! সতীনটা আবার কে?’
‘আপনাদের ওই পোড়ার ছাই ব্যবসাই তো আমার সতীন ৷ যার জন্য স্বামী হারিয়ে বসে আছি ৷’
এই কথায় গোপালবাবু মজা পেয়েছিলেন ৷
নিতাই বলল, ‘নিন চা খান ৷’ গোপালবাবু চায়ের কাপ হাতে নিলেন, কিন্তু মুখে দিলেন না ৷ কয়েক মূহূর্ত চুপ করে থেকে নিতাই বলল, ‘এই কাজের খরচখরচা সম্পর্কে কিছু জানা আছে আপনার? কোনও আইডিয়া?’
গোপালবাবু দুপাশে আলতো মাথা নাড়লেন ৷ নিতাই বলল, ‘তা তো ঠিকই ৷ আইডিয়া হবে কী করে ৷ এ তো কাগজে, টিভিতে বিজ্ঞাপন হয় না ৷ যাক ওসব কথা ৷ আপনি জানাশোনা ধরে আমার কাছে এসেছেন ৷ সাধারণ জানাশোনা নয় ৷ হাই লেভেল জানাশোনা ৷ আগেই খরচাপাতির কথা আপনার জেনে রাখা ভালো ৷ দেখুন গোপালবাবু, এইসব কেসে খরচ অনেক ৷ যারা বলে আজকাল কম পয়সাতেই মানুষ মারা যায় তারা ফালতু কথা বলে ৷ ঠাকুরের কৃপায় সব ভালোয় ভালোয় হয়ে গেল তো ঠিক আছে, গোলমাল কিছু হলে কিন্তু খরচ ডবল ৷’
গোপালবাবু বললেন, ‘গোলমাল মানে?’
নিতাই চোখের পাতা না ফেলে তাকিয়ে বলল, ‘ধরুন, শিকারি ধরা পড়ে গেল ৷ তখন পুলিশ কান টানতে টানতে মাথা পর্যন্ত যাবে ৷ একসময় আপনাকে ধরেও ফেলবে ৷ সেই মামলা আপনাকে লড়তে হবে ৷ তার জন্য টাকা আলাদা করে রাখতে হবে ৷ আপনি তো তখন বলতে পারবেন না, নিতাইবাবু আমাকে আগে বলেনি, আমিও টাকা সরিয়ে রাখিনি৷ এখন আমার টাকা নেই, আমি মামলা লড়তে পারব না ৷ আমি জেলে পচে মরব ৷ কি পারবেন বলতে?’
গোপালবাবু একটু চুপ করে থেকে বললেন, ‘ভয় দেখাচ্ছেন?’
নিতাই বলল, ‘হ্যাঁ ৷’
‘তাহলে কী করতে বলছেন ৷’
এবার চায়ের কাপে চুমুক দিলেন গোপালবাবু ৷ চা ঠান্ডা জল হয়ে গেছে ৷ সেই জলই গোপালবাবু খেতে লাগলেন ধীরে ধীরে চুমুক দিয়ে ৷ যেন খুব গরম ৷
নিতাই স্বাভাবিক গলায় বলল, ‘কাজটা নিজে করুন ৷’
হাত কেঁপে উঠল গোপালবাবুর ৷ চা চলকে পড়ল টেবিলে ৷ বললেন, ‘নিজে করব!’
নিতাই ঠান্ডা গলায় বলল, ‘হ্যাঁ, নিজে করবেন ৷ শিকার বিশ্বাস করলে এবং বোকা হলে কাজ অনেক সহজ ৷ জলের মতো ৷ খরচও বেঁচে যাবে ৷ সব থেকে বড় কথা কী জানেন গোপালবাবু?’
‘কী?’
নিতাই সামান্য হেসে বলল, ‘নিজে কাজ করলে ধরা পড়বার রিস্ক কমে যায় ৷ মাঝখানে কান থাকে না ৷ টান দিয়ে মাথা পাওয়া যাবে না ৷ তদন্তে নেমে পুলিশ জলে পড়ে ৷ একজনও সঙ্গে না থাকলে সব থেকে ভালো ৷ আপনি হাই লেভেলের চেনাজানা ধরে আমার কাছে এসেছেন ৷ তাই এত কথা বলছি ৷ ছোট লেভেলে চেনাজানা হলে বলতাম না ৷ নিজের ব্যবসা নষ্ট করতাম না ৷ দেখুন, দুদিন ভাবনাচিন্তা করুন ৷ যদি না পারেন, যদি সাহসে না কুলোয় আবার আমার কাছে আসবেন ৷ আমি তো রইলাম ৷ আর হ্যাঁ, আসার আগে নতুন কোডটা জেনে আসবেন ৷ মাপ করবেন, আজ আমায় উঠতে হবে ৷ আমার নামগানের সময় হয়ে গেল ৷’
গোপালবাবু অবাক হয়ে বললেন, ‘আবার কোড লাগবে কেন? আমার মুখ তো চিনে রাখলেন ৷’
নিতাই উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে হাসল ৷ বলল, ‘মুখ এক থাকে, কিন্তু মানুষটা বদলে যায় ৷ সেই কারণে কোড লাগবে ৷’
