বিহার, ছত্তিশগড়, ঝাড়খণ্ড— তিন জায়গায় নিতাইয়ের লোক আছে ৷ সপ্তাহের মাঝামাঝি এলে তারা শনিবার পর্যন্ত থেকে যায় ৷ একেবারে ‘কাজ’ সেরে হরির লুটের বাতাসা নিয়ে দেশে ফেরে ৷ ‘সুপারি’ নেওয়ার সময় নিতাই পার্টির সঙ্গে চট করে দেখা করে না ৷ সেটাই স্বাভাবিক এবং উচিত ৷ এই কাজে রিস্ক খুব ৷ পুলিশের খোঁচড় পার্টি সেজে ঢুকে পড়ে ৷ তাই সোর্সের ব্যবস্থা আছে ৷ সোর্স ধরে নিতাইয়ের কাছে পৌঁছোতে হয় ৷ শুধু সোর্স ধরলে হবে না ৷ সোর্সের কাছ থেকে কোড জেনে আসতে হয় ৷ পাসওয়ার্ড ৷ সকাল বিকেল নিতাই কোড বদলায় ৷ গোপালবাবু সোর্স ধরলেন, বড় লেভেলের চেনাজানা ধরলেন এবং সবশেষে ‘কোড’ জেনে তবে নিতাইয়ের কাছে পৌঁছলেন ৷ সেদিন সকালে কোড ছিল, ‘চিনি বেশি খাই ৷ চায়ে দু-চামচ চিনি দিতে বলবেন ৷’ দুপুরের পর কোড বদলে গেল ৷ তখন কোড হল, ‘চিনি খাই না ৷ সুগার আছে ৷ চিনি ছাড়া চা বলুন ৷’
গোপালবাবু এলেন বিকেলে ৷ নিতাই খাতির করে বসাল ৷ খুন-জখম অপহরণ যাই হোক, পার্টি তো ৷ পার্টি মানে লক্ষ্মী ৷
‘কী খাবেন? শরবত দিতে বলি? এরা আম পোড়া শরবত ভালো করে ৷’
গোপালবাবু বললেন, ‘না, শরবত নয় ৷ চিনি খাই না ৷ সুগার আছে ৷ আপনি বরং এক কাপ চা বলুন ৷ চিনি ছাড়া’ ৷
চায়ের অর্ডার দিয়ে নিতাই বলল, ‘পাখির বয়স কত?’
গোপালবাবু বললেন, ‘আমার বয়স ৷ একসঙ্গে স্কুলে পড়তাম ৷ কয়েকমাসের এদিক-ওদিক হতে পারে ৷’
‘স্বভাবচরিত্র কেমন? চালাক না বুদ্ধিমান?’
গোপালবাবু প্রশ্নটা বুঝতে পারলেন না ৷ একটু থতমত খেয়ে বললেন, ‘চালাক না বুদ্ধিমান মানে!’
নিতাই শান্ত ভঙ্গিতে বলল, ‘চালাক পাখি মারবার একরকম কায়দা, বুদ্ধিমান পাখি মারবার আরেকরকম কায়দা ৷ চালাক পাখি আকাশে উড়তে উড়তে ভল্ট দেয় ৷ ভাবে এতে শিকারির গুলি ফসকে যাবে ৷ বোকা জানে না শিকারি সবসময় পাখির ভল্ট হিসেব করেই গুলি ছোঁড়ে ৷ যাকে দুই ভল্টে মারবে তাকে সেই কায়দায় গুলি, যাকে আড়াইতে মারবে তাকে সেই কায়দায় ৷ বুদ্ধিমান পাখি এটা জানে ৷ তাই তার ডিগবাজি ফাজিতে না গিয়ে স্ট্রেট উড়ে যায় ৷ শিকারির হিসেব গুলিয়ে দেয় ৷ সে ডিগবাজির হিসেব করে গুলি ছোড়ে, সেই গুলি গায়ে লাগে না ৷ তাই বুদ্ধিমান পাখিকে গুলি করতে হয় ভেবেচিন্তে ৷
গোপালবাবু খুশি হলেন ৷ তিনি ঠিক লোকের কাছে এসেছেন ৷ চালাক, বুদ্ধিমানে ফারাক করা সহজ কথা নয় ৷ খুব কম লোক পারে ৷ এই লোক তাদের একজন ৷ গোপালবাবু বললেন, ‘ভবেশ চালাক বা বুদ্ধিমান কোনওটাই নয় ৷ সে বোকা ৷ সহজ সরল প্যাটার্নের ৷’
নিতাই ভুরু কুঁচকে বলল, ‘ভবেশ! পাখির নাম?’
গোপালবাবু মাথা নাড়িয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, ভবেশ পোড়েল ৷’
নিতাই ইন্টারোগেশনের কায়দায় বলল, ‘ভবেশ পোড়েলকে আপনার সহজ সরল কেন মনে হয়?’
গোপালবাবু মুখ তুলে সামান্য হাসলেন ৷ বললেন, ‘ভবেশ আমার শুধু ছোটবেলার বন্ধু নয়, বারো বছরের বিজনেস পার্টনার ৷ সে বোকা না চালাক, আমি জানব না? তার মানুষকে বিশ্বাস করবার অভ্যেস আছে ৷ বোকা অভ্যেস ৷’
নিতাই গোপালবাবুর চোখের ওপর চোখ রেখে বলল, ‘আপনাকে বিশ্বাস করে?’
গোপালবাবু চুপ করে রইলেন ৷ কী উত্তর দেবেন? ভবেশ তাকে শুধু বিশ্বাস করে না, বাড়াবাড়ি ধরনের বিশ্বাস করে ৷ না করলে কি আর এভাবে টানা পাঁচ বছর বিজনেস থেকে লাভের অংশ সরিয়ে রাখতে পারতেন? হিসেবপত্র দেখতে বললে গাধাটা বলে, আমি ওসব হিসেব টিসেবে নেই গোপাল ৷ বিজনেস শুরুর সময়ই তো কথা হয়ে গিয়েছিল বাপু, গায়ে গতরে খাটব আমি, অফিসে বসে কাগজপত্র নিয়ে কর্মকাণ্ড তোর ৷ সেই মতো আমি ঘুরে ঘুরে অর্ডার আনি, তুই হিসেব করিস ৷’
পার্টনারশিপ ব্যবসার শুরুতে এসব নেকা কথা হতে পারে ৷ পরে হয় না ৷ লাভ আসতে শুরু করলে তো একেবারেই হয় না ৷ ব্যবসায় বাপও নিজের ছেলেকে বিশ্বাস করে না ৷ তবে এখানে শুধু কি আর ব্যবসা? আর কিছু নেই? হ্যাঁ, আছে ৷ আরও বিশ্বাসের ব্যাপার আছে ৷ সেই ব্যাপারের নাম মন্দিরা ৷ ভবেশের বউ ৷ গোপালবাবুর সঙ্গে মন্দিরার আলাপ ভবেশের বিয়ের সময়ে ৷ পাত্রী ফাইনালের সময় গোপালবাবু নিজে উপস্থিত ছিলেন ৷ পরে বিয়ের যাবতীয় ব্যবস্থা, কেনাকাটা, খাটাখাটনি সবই করেছেন ৷ এমনকী ফুলশয্যার খাট পর্যন্ত নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সাজিয়েছিলেন৷ সবাই বলেছিল, বন্ধুর বিয়ে দিয়ে গোপাল হাত পাকাচ্ছে ৷ এরপর নিজে বিয়ে করবে ৷ এখন স্টেজ রিহার্সাল চলছে ৷
বিয়ের বছর খানেক পর মন্দিরা বলল, গোপালদা, এবার আপনি বিয়ে করুন ৷’
গোপালবাবু বললেন, ‘কেন? তোমার সমস্যা কী বাপু ৷ নিজেরা বিপদে পড়ে এখন আমাকে ফেলতে চাইছ?’
মন্দিরা হেসে বলল, ‘বাঃ বয়েস হয়ে যাচ্ছে না ৷ বিয়ে না করলে চলবে?’
গোপালবাবুও হেসে বললেন, ‘বেশ তো চলছে ৷ খুব ভালো চলছে ৷ স্বাধীন, ফুরফুরে ৷ রোজগার করছি, খাচ্ছিদাচ্ছি, ঘুমোচ্ছি ৷’
মন্দিরার গায়ের রং কালোর দিকে হলেও একধরনের সৌন্দর্য আছে ৷ চোখা সৌন্দর্য ৷ চোখে মুখে বুদ্ধির ভাব ৷ শুধু ভাব নয়, গোপালবাবুর বিশ্বাস মেয়েটার সত্যি বুদ্ধি আছে ৷ রূপবতী থেকে বুদ্ধিমতী মেয়ে তার সবসময়েই বেশি পছন্দ ৷ এই কারণে গোড়া থেকেই তিনি বন্ধুর পত্নীকে বেশি নম্বর দেন ৷ মন্দিরা চোখ কপালে তুলে, নাটকীয় গলায় বলল, ‘এটা কি চলা হল নাকি? হোটেলে তেল ঝাল মশলার খাবার খাচ্ছেন, যখন খুশি বাড়ি যাচ্ছেন ৷ অসুখ-বিসুখ করলে দেখার লোক পর্যন্ত নেই ৷ ভগবান না করুন, যদি সেরকম কিছু হয় কী হবে একবার ভেবে দেখেছেন?’
