দেবযানী যা যা বললেন একে একে তাই করে গেল ঋতি। ফাইলটা খুলতেই পাওয়া গেল ডিভোর্স পেপার। গোটা গোটা অক্ষরে সই করে দিলেন দেবযানী। একটু যেন ক্লান্ত দেখাচ্ছে তাকে। হাঁপ নিয়ে বললেন, ‘ওই গ্লাসটা একটু দেবে ঋতি? বড্ড তেষ্টা পাচ্ছে।’
টেবিল থেকে জলের গ্লাসটা নিয়ে ঢাকনা খুলে এগিয়ে দিল ঋতি। জল খেতে গিয়েই ঘটল বিপত্তিটা। বিষম খেয়ে হিক্কার মতো উঠতে লাগল। দেবযানীর মাথায়, পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল ঋতি। হিক্কাটা কমলেও প্রবলভাবে কাশতে লাগলেন দেবযানী।
ভয় পেয়ে ঋতি বলে উঠল, ‘কষ্ট হচ্ছে আপনার? শম্পাকে ডাকব?’
হাতের ইশারায় ঋতিকে নিষেধ করলেন দেবযানী। থেমে থেমে বললেন, ‘এরকম প্রায়ই হয়। ওই টেবিলে দেখো একটা কালো মতো সিরাপের শিশি আছে। ওখান থেকে দু ঢাকনি দাও তো আমাকে।’
সিরাপের শিশি থেকে ঢাকনি মেপে গ্লাসে ওষুধ ঢালতে ঢালতে ঋতি শুনল কাশতে কাশতেই দেবযানী বলছেন, ‘অনেক কষ্ট দিলাম তোমাকে। কিন্তু তোমাদের নতুন জীবন শুরুর চাবিকাঠিটাও তো দিয়ে দিলাম বলো। অনেক শুভেচ্ছা রইল।’ একটু দম নিয়ে আবার বললেন, ‘ভেবোনা মৌখিক শুভেচ্ছা জানিয়েই দায় সারব আমি। উপহারটা ডিউ থাকল। সময়—মতো ঠিক পাঠিয়ে দেব।’ হাঁপাচ্ছিলেন দেবযানী।
এত কথা কেন যে বলছেন দেবযানী? কাশি তো আরও বেড়ে যাবে। খুব যত্ন করে দেবযানীকে ওষুধটা খাইয়ে দিল ঋতি।
কমে এসেছে কাশিটা। কাশির ধকলেই বোধহয় বেশ কাহিল দেখাচ্ছে দেবযানীকে। শ্রান্ত গলায় দেবযানী বললেন, ‘এবার এসো তুমি। সাবধানে যেও।’
সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে কেন যেন শির শির করছিল ঋতির চোখ দুটো। হিসেবটা মিলছে না কিছুতেই।
বাড়িতে ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে গেল ঋতির। পাহাড়ে রাত গভীর হয় আরও তাড়াতাড়ি। হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে মনোজিৎ। সুখবরটা কালই দেবে। ভাবল ঋতি।
পরদিন সকালে বেজে চলা পরিচিত রিংটোনের শব্দে ঘুম ভাঙল ঋতির। মোবাইল কানে চাপতেই ভেসে এল মনোজিৎ—এর উদ্বিগ্ন গলা, ‘কাল তুমি মণি মুখার্জি রোডের বাড়িতে গিয়েছিলে কেন?’
‘তুমি কী করে জানলে?’ অবাক ঋতি।
‘টিভিতে দেখাচ্ছে। প্রতিটা চ্যানেলের ব্রেকিং নিউজ এটা।’
‘মানে? ইয়ারকি হচ্ছে?’
‘ইয়ারকি নয়। টিভিটা খুললেই বুঝতে পারবে। কাল রাতে খুন হয়েছে দেবযানী। কাশির ওষুধের সঙ্গে বিষ খাইয়ে খুন করা হয়েছে। রঘুদাদার কাছ থেকেই পুলিশ জানতে পেরেছে তোমার কথা। আমাকেও ফোন করেছিল পুলিশ। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফিরতে বলেছে। কিন্তু আমাকে কিছু না বলে তুমি হঠাৎ কেন যেতে গেলে ও বাড়িতে?’
থর থর করে কাঁপছে ঋতি। ঋতির কাছে কালকের সমস্ত ঘটনা শুনতে শুনতে পাথর হয়ে যাচ্ছে মনোজিৎ। সিরাপের শিশিতে, গ্লাসে, আরও কত জায়গায় কী নিপুণ চালাকিতে ঋতির ফিঙ্গার প্রিন্ট ধরে রেখেছে দেবযানী! ঋতির সঙ্গে তার ঘর বাঁধার ছাড়পত্রে সই করে কী দারুণ সারপ্রাইজটাই না দিয়ে গেল দেবযানী! কী যেন দলা পাকিয়ে যায় মনোজিৎ—এর গলায়।
‘কাল দেবযানীর অনেক কথা হেঁয়ালির মতো লাগছিল জানো। এখন সবকিছু জলের মতো পরিষ্কার আমার কাছে। আমি বোকা মনোজিৎ…’ কান্নায় বুজে আসে ঋতির গলা।
ঠিক তখনই কারা যেন জোরে জোরে নক করতে থাকে দরজায়। মা, কুসুমের চেঁচামেচি ছাপিয়ে ঋতি শুনতে পায় একটা ভারী গলা, ‘…মিস সেন…দরজাটা খুলুন….মিস সেন….দরজা ভাঙতে বাধ্য করবেন না আমাদের…শুনতে পাচ্ছেন….’
‘হ্যালো! ঋতি! কী হল! কথা বলছ না কেন?…’ মনোজিৎ—এর চিৎকার, দরজার আওয়াজ চাপা পড়ে যাচ্ছে একটা অশরীরী হাসিতে। ঋতি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে দেবযানীর গলাটা—’উপহার পছন্দ হয়েছে ঋতি? বলেছিলাম না সময়মতো পাঠিয়ে দেব…।’
একটি খুনের গল্প – প্রচেত গুপ্ত
কাজটা গোপালবাবু সাবধানে এবং ঠান্ডা মাথায় করবেন বলে ঠিক করেছেন ৷ চল্লিশের কাছাকাছি বয়স হয়ে গেলে যে-কোনও কাজই সাবধানে এবং ঠান্ডা মাথায় করা উচিত ৷ এক-পা ফেলার আগে দশবার ভাবা উচিত ৷ এই কাজের বেলায় গোপাল সান্যাল ভেবেছেন একশোবার ৷ তার পরও বারবার পিছিয়ে এসেছেন ৷ তার কারণ কাজটা কঠিন ৷ শেষ পর্যন্ত সুযোগ এসেছে ৷ গোপালবাবু নিখুঁতভাবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে চান ৷
গোপালবাবু প্রথমে ভেবেছিলেন, কাজ করাবেন ‘প্রফেশনাল’ দিয়ে ৷ পেশাদার খুনি ৷ সুপারি কিলার ৷ সেইমতো একজনের সঙ্গে কথা বলেছিলেন ৷ সেই লোকের বায়োডাটা ভালো ৷ এই লাইনে দীর্ঘদিন আছে ৷ পয়সা বেশি নেয় তবে কাজে ত্রুটি রাখে না ৷ গোপালবাবু তবু অতিরিক্ত সাবধান হয়েছিলেন ৷ বড় লেভেলের চেনাজানা ধরে সেই লোকের কাছে হাজির হলেন ৷ লোকটার নিতাই নাম ৷ চেহারা চকচকে, গোলগাল ৷ পরনে ধুতি, গায়ে উড়নি ৷ পেট পর্যন্ত লম্বা পৈতে, গলায় কণ্ঠির মালা ৷ কপালে মাটি লেপটানো চন্দন ৷ এই ধরনের লোক ধুতি, উড়নি, মাটির টিপ পরে থাকলে মনে হয় ভান করছে ৷ সাজানো ভক্ত ৷ গোপালবাবু গোড়াতে সেরকম ভেবেছিলেন ৷ পরে জানলেন, ঘটনা সেরকম নয় ৷ নিতাই সত্যিকারের একজন ভক্ত মানুষ ৷ বেলা পর্যন্ত পুজোআচ্চা নিয়ে থাকে ৷ সন্ধেতে নামগান ৷ নামগান শেষে শনিবার শনিবার করে বাতাসা বিতরণ ৷ ঠিক বিতরণ নয়, কাঁসার জাম বাটি থেকে মুঠো করে বাতাসা নিয়ে ওপরে ছুড়ে দেওয়া হয় ৷ একেই সম্ভবত হরির লুট বলে ৷ না ভেঙে আস্ত বাতাসা লোফা বিশেষ পুণ্যির বিষয় ৷
