পলকেই কী যে হয়ে গেল! ঋতিকে জড়িয়ে ধরে ওর বুকে মুখ গুঁজে বাচ্চচাদের মতো ফুঁপিয়ে উঠেছিল মনোজিৎ। পাড় ভাঙার শব্দ শুনতে পাচ্ছিল ঋতি। শুরুটা হয়তো আগেই হয়েছিল। বুঝতে পারেনি ঋতি। সমর্পণ তাই বুঝি অমন অনায়াস ছিল। তার উন্মুখ ঠোঁটের গভীর থেকে যেন জীবনের আশ্বাস শুষে নিচ্ছিল মনোজিৎ।
এক ছুটির সকালে লংড্রাইভে যেতে যেতে ঋতি বলেছিল, ‘সমাজের কাছে আমার পরিচয়টা একবারও ভেবে দেখেছ? ঠারে ঠোরে অনেক কথা কানে আসে। কী বলব? চুপ করে থাকি।’
‘ব্যাপারটা নিয়ে আমিও ভেবেছি ঋতি। মিউচুয়াল সেপারেশনের জন্য আমি অলরেডি কথা বলেছি ল’ইয়ারের সঙ্গে।’
‘কিন্তু পৌলমী? সে মেনে নেবে? ও তো আর ছোটটি নেই এখন। ওরও তো একটা মতামত আছে।’
‘ছেলেবেলা থেকেই তো দেখেছে মা কে। মানসিক কোনো সম্পর্কই নেই দেবযানীর সঙ্গে। ছুটিতে যখন বাড়িতে আসে ওর সবকথা আমার সঙ্গে। আমাদের সম্পর্কটা বন্ধুর মতো। তোমার কথা ও জানে। ওর কোনো আপত্তি নেই।’
অবাক চোখে চেয়ে থাকে ঋতি। মা—মেয়ের বোঝাপড়া কোন তলানিতে এসে ঠেকলে মেয়ের এমন মনোভাব হয়? ভাবছিল ঋতি। তারপর বলেছিল, ‘দেবযানীকে বলেছ?’
গম্ভীর হয়ে গিয়েছিল মনোজিৎ। বলেছিল, ‘তার সঙ্গে যখন রাতে দেখা হয়, কোনোদিনই সুস্থ অবস্থায় থাকে না। আর সকালে আমি যখন বের হই তখন তার মাঝরাত।’ একটু থেমে যোগ করেছিল, ‘তবু বলতে তো হবেই। আজই বলব।’
পরদিন থেকে অফিসে আসছিল না মনোজিৎ। ফোনেও ধরা যাচ্ছিল না তাকে। অস্থির হয়ে উঠেছিল ঋতি।
দু’দিন বাদে ছুটির পর ডালহৌসী থেকে চাঁদনিচক মেট্রো স্টেশনে যাওয়ার পথে ফোন এসেছিল মনোজিৎ—এর। ঋতি কোথায় আছে জেনে নিয়ে সেখানেই অপেক্ষা করতে বলেছিল ঋতিকে। ট্রাম কোম্পানির অফিসের সামনে মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই বাইক নিয়ে হাজির হয়েছিল মনোজিৎ। তাকে দেখে আঁতকে উঠেছিল ঋতি। মাথায় ব্যান্ডেজ, উসকো—খুসকো চেহারা। মনোজিৎ—এর মুখে সবকিছু শুনে বোবা হয়ে গিয়েছিল ঋতি।
পরশুরাতেই ডিভোর্সের কথা বলেছিল মনোজিৎ। সঙ্গে সঙ্গেই ভায়োলেন্ট হয়ে উঠেছিল দেবযানী। নোংরা গালাগালি দিতে দিতে জিনিসপত্র ছুড়তে শুরু করেছিল। দেবযানীর ছোড়া ফুলদানিতেই কপাল ফেটে গিয়েছিল মনোজিৎ—এর। তিনটে স্টিচ পড়েছিল। সে রাতেই মণি মুখার্জি রোডের বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিল মনোজিৎ। ক’দিন বন্ধুর বাড়িতেই ছিল। তারপর গড়িয়াতে একটা টু বেডরুম ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে উঠে এসেছিল।
দেখতে দেখতে কেটে গিয়েছিল তিনটে বছর। ডিভোর্স পেপারে সই করেনি দেবযানী।
এক বছর আগে যখন সেরিব্রাল হল দেবযানীর, ডাক্তার, নার্সিংহোম সবকিছু মনোজিৎকেই করতে হয়েছিল। মনের অগোচরে পাপ নেই। ভেতরে ভেতরে ভয় পেয়ে গিয়েছিল ঋতি। ওদের ভাঙা সম্পর্কটা জোড়া লেগে যাবে না তো?
ঋতির আশঙ্কা সত্যি হয়নি অবশ্য। দেবযানী কিছুটা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার পরেই সরে এসেছিল মনোজিৎ।
কিছুদিন আগে দেবযানী, মনোজিৎ—এর কমন ফ্রেন্ড তিলোত্তমা মনোজিৎকে জানিয়েছে, এবার নাকি সেপারেশনের ব্যাপারটা নিয়ে সিরিয়াসলি ভাবছে দেবযানী।
বিশ্বাস করতে ভয় করত ঋতির। তবু গোপন একটা অপেক্ষা তো ছিলই।
দীর্ঘ সেই প্রতীক্ষা শেষ হতে চলেছে। কিন্তু উচ্ছ্বাসটা কেন যে আসছে না সেভাবে? কাঁটার মতো কী যেন একট খচ খচ করছে। করেই চলেছে।
‘কী এত ভাবছ বলো তো?’ দেবযানীর প্রশ্নে চমকে ওঠে ঋতি।
‘এখন কেমন আছেন আপনি?’ সহজ হওয়ার চেষ্টা করে ঋতি।
‘ভালোই। দিন—রাত বিছানায় শুয়ে শুয়ে যতটা ভালো থাকা যায় আর কি। হুইলচেয়ারে বসিয়ে শম্পা মাঝে মাঝে ব্যালকনিতে নিয়ে যায়। বেশিক্ষণ বসতে পারি না। আবার এনে শুইয়ে দেয়। কী বিড়ম্বনা বলো তো। এরচেয়ে একেবারে চলে যাওয়াই ভালো ছিল। তাই না? তোমাদেরও সুবিধে হত।’
মুখটা কালো হয়ে যায় ঋতির। কী বলবে বুঝে উঠতে পারে না। তখনই হেসে ওঠেন দেবযানী, ‘ঘাবড়ে গেলে নাকি? মজা করছিলাম।’
দেবযানীর কথার মাঝখানেই চা আর স্ন্যাক্সের ট্রে হাতে ঘরে এল শম্পা। কোনার দিক থেকে একটা গোল টেবিল টেনে এনে ট্রে—টা রাখল। একটা কাপ তুলে ঋতিকে দিয়ে অন্য কাপটা নিয়ে দেবযানীর কাছে গিয়ে বসল।
‘চা টা আমার হাতে দিয়ে তুই এখন যা।’ বললেন দেবযানী।
‘তোমার অসুবিধে হবে তো। চা টা খাইয়ে দিয়ে যাই?’
‘কিচ্ছু অসুবিধে হবে না। ডান হাতটা তো ঠিক আছে রে বাবা। তাছাড়া ঋতিও তো আছে। তুই যা।’
একরকম বাধ্য হয়েই চলে যায় শম্পা। মাথা নিচু করে চা খাচ্ছিল ঋতি। বুঝতে পারছিল দেবযানী তাকেই দেখে যাচ্ছেন। অস্বস্তি হচ্ছিল তার। দেবযানী তখনই বললেন, ‘আমি খুব খারাপ। কত যে খারাপ ভাবতেও পারবে না তুমি। মা ছিল না তো। ছোটবেলা থেকেই স্পয়েল্ড হয়ে গিয়েছিলাম। সত্যিকারের সহমর্মিতা, ভালোবাসা কোনোদিন পাইনি। তাই বোধহয় এত ডেস্ট্রাকটিভ আমি, শুভ কিছু, সুন্দর কিছু সহ্য করতে পারি না।’
ঋতি বুঝতে পারছে না, ঠিক কী বলতে চাইছেন দেবযানী। ঋতির দিকে চেয়ে একটু বুঝি থমকে গেলেন দেবযানী। মৃদু হেসে বললেন, ‘তোমাকে খুব বোর করছি না? আর সময় নষ্ট করব না তোমার। তুমি একটু কষ্ট করে ডানদিকের ওই আলমারিটা খোলো তো।’
‘আমি!’ অবাক ঋতি।
‘তাছাড়া আর কে আছে এখানে? এদিকে বিছানার তলা থেকে চাবিটা নিয়ে আলমারিটা খোলো। একদম ওপরের তাকে একটা ফাইল আছে, সেটা নিয়ে, আর ওই ড্রেসিংটেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা পেন নিয়ে আমার কাছে এসো।’
