কাশী কি তা হলে একটুও মানুষ নেই এখন?
কাশী আবার কাজে লেগে গেল। নিপুণভাবে করাত দিয়ে হাঁটুর তলা থেকে পা দুটো কেটে ফেলল। পাঁচ টুকরো সোনালি নামের মেয়েকে আলাদা আলাদা পলিথিনে ঢুকিয়ে পলিথিনের মুখ বেঁধে বাক্সটার মধ্যে ঢুকিয়ে দিল। দুটো ইটও রাখল বাক্সটার ভিতরে। অয়েল ক্লথটাও বাক্সটার মধ্যে ঢুকিয়ে দিল। ফিনাইল জল দিয়ে ভালো করে মুছে নিল মেঝে। সব পরিষ্কার। পেশেন্ট দেখার বিছানা এখন শুধু বিছানা হয়েই পড়ে আছে। এবার একটা দড়ি দিয়ে বাঁধতে লাগল, তারপর দড়িটার শেষ প্রান্তদুটোকে ফাঁস লাগিয়ে একটা ফুল তৈরি করল, কোনও প্রেজেনটেশনের প্যাকেট যেভাবে বেঁধে দেয়। তারপর দু’হাত ঝেড়ে উত্তমকে বলল, নিন। যেন উপহার।
উত্তম বাক্সটার দিকে তাকাল। কাশীনাথের দিকে, তারপর ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, এত বেলা হয়ে গেছে। এবার বাড়ি চল।
কাশীনাথ শেষবারের মতো দেখে নিল কোনও চিহ্ন পড়ে আছে কি না।
উত্তম বলল, রাত দশটায় এখানে আসিস। আমিও আসব। বাক্সটা যমুনার জলে ফেলে দেব।
.
কাশী ঘরে গেল। ওর মা বলল, এত দেরি হল কেন?
কাশী বলল, দরকারি কাজ ছিল একটা।
ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট টিভিতে সানন্দা ক্যুইজ দেখল, খেতে বসল, কিন্তু একটু পরেই ভাতের থালার মধ্যেই বমি করে ফেলল কাশীনাথ।
রাত্রি দশটাতেই নবজীবন ফার্মেসির সামনে পৌঁছে গেল কাশীনাথ। উত্তমও এসেছে মোটর বাইকে। ওরা তালা খুলে ভিতরে ঢুকল। আলো জ্বালাল। দেখল বাক্সটা পড়ে আছে। আর দেখল একটা লাল পিঁপড়ের লাইন বাক্সটার ভিতরে যাচ্ছে।
উত্তম বলল, কাশী, তুই আমাকে মদত করলি, জিন্দেগিতে ভুলব না। লাস্ট স্টেজেও তুই আমাকে বাঁচিয়ে দে। একটা মোটর সাইকেলে এত বড় বাক্স আর দুজন ধরবে না। আমায় সবাই চেনে। বরং তুই যা। মোটর বাইকটার পিছনে বাক্সটা বেঁধে দেব। তুই অর্জুনপুরে কাঠের ব্রিজটাতে চলে যাবি, ফেলে দিবি, দশ মিনিটের ব্যাপার। পারবি না?
.
কাশীনাথ মোটর বাইকের গিয়ার পালটায়। ঘটঘট ঘটঘট। হাতের একসেলারেটারে স্পিড বাড়ায়। পৃথিবী টলছে। ও এখন স্বাধীন। ওর সামনে এখন ওর প্রভু নেই। ঘটঘট ঘটঘট। এই দেহ নিয়ে এখন যেখানে খুশি চলে যেতে পারে। ও স্বাধীন। ও কাশীনাথ। কাশীনাথ শিবের আর এক নাম। ওর পিছনে বাক্সবন্দি সতী। ও এখন দক্ষয় বাঁধাতে পারে, ও এখন প্রলয় নাচন নাচতে পারে। আই লাভ ইউ সোনালি, তোমাকে ভালো বেসেছিলাম। কাউকে বলতে পারিনি, নিজেকেও নয়। সোনালি তুমি কেন মোহময়ী হতে চেয়েছিলে? ঘটঘট ঘটঘট। তীব্র হেডলাইট। আমি বাক্স খুলে একটা একটা করে অঙ্গ ছুড়ে দেব। পা—দুটো ছুড়ে দিলাম নবজীবন ফার্মেসিতে। মোহময়ী হতে চাওয়া করুণ বুকজোড়াকে ছুড়ে দিলাম গ্লান্ডিনার কোম্পানিতে। মুন্ডুটা ছুড়ে দিলাম থানায়। সব তীর্থক্ষেত্র হয়ে ওঠো, পীঠস্থান।
কাশীনাথ অর্জুনপুরের দিকে যাচ্ছে না। একদম অন্যদিকে। অন্য রাস্তায়। কাশীনাথ থানার সামনে এসে থামল। গাছে জোনাকি। কাশীনাথ থানার ভিতরে গেল। পুলিশের জামা পরে একজন তখন আধুনিক রমণীদের রমণীয় পত্রিকার একটা পুরনো সংখ্যা পড়ছে। স্তন সংখ্যা। কাশীনাথ ওখানে দাঁড়াল।
কী চাই?
উত্তর নেই।
কী চাই এখানে?
কাশীনাথ চুপ।
বলবেন তো কী চাই?
কাশীনাথ কিচ্ছু না বলে হাউহাউ করে কেঁদে উঠল। চোখ ফেটে জল বেরুল। কাশীনাথ দু’হাতে মুখ ঢেকে কান্নায় ভেঙে পড়ল, আর তখন নিজেকে মানুষ মনে হতে লাগল, স্বাভাবিক মনে হতে লাগল।
.
পরদিন খবর কাগজে বেরল অস্বাভাবিক যৌন মানসিকতার শিকার হল একটি তরুণী। মানবদরদি প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলি বলল অপরাধীর শাস্তি চাই। আর রমণীয় পত্রিকাটি বিজ্ঞাপনে জানাল পরবর্তী সংখ্যার হট কভার স্টোরি— ‘অস্বাভাবিক যৌন মনস্তত্ত্ব।’
লাল জোছনা – কাবেরী রায়চৌধুরী
—তাহলে কী ভাবতেছ?
—কী, আবার? এক সঙ্গে থাকবার ছাড়া আর কী? তুমি আর আমি। আমি আর তুমি! এতবড় একটা ঢাকা শহরে আমাদের দুইজনারই তো কেউ নাই! কাম শ্যাষ হইলে দুইজনাই একলা!’
আয়েশার হাতের ওপর আলতো চাপ দিল শেখ মিরাজ। সি.এন.জি অটো চালানো কড়াপড়া হাতের শক্ত আঙুল দিয়ে আয়েশার সেলাই মেশিন চালানো কড়া হাতের তালুতে হাত বোলাচ্ছে।
—সাঁতার দিতে মন চায়!
সম্মুখে বয়ে যাওয়া কালিগঙ্গা নদীর দিকে তাকিয়ে আবেগ ডুবিয়ে কথাটা বলল আয়েশা! ‘কাম আর কাম! দ্যাশে থাকতে রোজ সাঁতার দিতাম। কাল থেক্যে আবার ওবার টাইম! দুই শিপটে কাম হইব। তোমার সঙ্গে দেখা করবার সময় পাইব না।’
—তা বইল্যেই হবে? আমি আসব তোমার ফ্যাকটরির সামনে। টিফিন টাইমে আমি আসব বাসায় যাইবার আগে। তোমার মুখখানা দেখে বাসায় গিয়া পচা পান্তা সোনা মুখ করে খাইব এখন।
এই ভরা বর্ষায় কালিগঙ্গার বুকে ছলকে ছলকে উঠছে ঢেউ! আয়েশার আবেগও! মায়া লাগে মিরাজের কথা শুনে। মায়ায় পড়ে গেছে মানুষটার। খাওয়ার কষ্ট। হাত পুড়িয়ে রাঁধতে হয়। একদিন সেই রান্না খাইয়েছিল মিরাজ! ‘মা—গো—মা! সে অখাদ্য মুখে দেওয়া যায় না! বউ থাকতে বউ নাই! সে নাকি ঢাকা শহরে আসতে চায় না! শহরে নাকি তার দম বন্ধ হয়ে যায়। সে গ্রামে থাকতেই পছন্দ করে!’
তেতো আর খুব নুনে পোড়া তরকারির আস্বাদ নিতে নিতে তার মুখ যখন বিকৃত হয়ে গেছিল তখন তার গালে আঙুল দিয়ে টোকা মেরে মিরাজ বলেছিল, ‘আমার বউ হবে?’
