বউ! তোমার তো দ্যাশে সুন্দরী বউ আছে মিঞা! কয়ডা করবা?
আচমকাই তাকে চমকে দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছিল মিরাজ। আরেব্বাস! কী লোহার মতো শক্ত হাত আর পেশি। রোগা কাঠির মতো লোক হলে কী হবে গায়ের জোর যে কী ভীষণ তা টের পেয়েছিল সেইদিনই।
জাপটে ধরে বলেছিল, এইবার বুঝো কয়ডা করতে পারি! সন্দেহ আছে কিছু?
শরীর কাঁপতে কাঁপতে দুর্বল হয়ে গেছে তখন তার। যেন একটা পাখির পালকের আঘাতেই মৃত্যু হবে!
কেমন ভেঙে পড়া গলায় বলেছিল, ছাড়ো মিঞা। ছাড়ো, ছাড়ো, আহ! ছাড়ো।
—ক্যান ছাড়ব? ধরসি এমনি এমনি?
সে তখন গলে যাচ্ছে। আনিসুজ্জমানের চেহারাটা কতদিন পরে মনে পড়ল! ঢাকা শহরে প্রথম আসার পর যে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে কাজ নিয়েছিল সে সেখানেই আনিসুজ্জমান ‘আয়রন ম্যান’ ছিল। তৈরি হওয়া পোশাক ইস্তিরি করার কাম করত! আর সে মাপ দেওয়া কাপড় কাটত। আলাপ হল। প্রেম হল। গর্ভবতীও হল খুব দ্রুত। গর্ভপাতও হল আনিসুজ্জমান বেঁকে বসায়।
মনে পড়ছে। মনে পড়ছিল সেইদিনের সবকিছু আবার। প্রেমের কথাগুলো সব কেমন একরকম। এক ভাষা বলে পুরুষ ও নারী।
আনিসুজ্জমানকে যখন সে জানাল গর্ভের কথা, সে আশ্চর্য হয়ে বলল, ও বাচ্চচা আমার তা কে কইল? তুই বেটি লুচ্চিচ মাইয়া মানুষ, কই কই যাস তা আমি কী জানি?
হতবাক সে। কাটা জিওল মাছের মতো শরীর কাঁপছে তার। গলা দিয়ে শব্দ বেরোচ্ছে না। সমস্ত কথাগুলো গলার কাছে দলা বেঁধে ইট হয়ে গেছে।
আনিসুজ্জমান বলে চলল, এক মাস আলাপ—পরিচয় হইতে না হইতে যে মাগি পেরায় অচেনা পুরুষের সঙ্গে শুইতে পারে তার চরিত্তির তখন বুঝছি। আর আমার বাসায় বউ আছে, বাচ্চচা আছে। আমি ক্যামনে বিয়া করব? তাছাড়া কার কার সঙ্গে কই কই শুইছিস বিলাই কুত্তার মতো তার খবর কে জানে? ও বাচ্চচা আমার নয়। তুমি পথ দেখো।’
প্রায় বেহুঁশ শরীরটাকে টানতে টানতে, তার ভার বইতে বইতে কীভাবে যে ছোট্ট ঘুপচি বাসায় ফিরে এসেছিল সে সেইদিন!
পাশের ঘরের হিন্দু বউটাকে নিয়ে পরদিন গর্ভপাত করে এসেছিল সে।
ভালোবাসার প্রথম আঘাত যে বড় যন্ত্রণার! তাই মাস পুরতে বেতন নিয়ে চলে এসেছিল সে কাজ ছেড়ে। আর ওই ফ্যাক্টরিমুখো হয়নি।
যাতায়াতের পথে গোল্ডেন গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি চোখে পড়ে এখনও। ক্ষণিকের জন্য মন কেমন করে ওঠে! ব্যস, ওইটুকুই স্মৃতি। কখনও কখনও রাত বেরাতে হিসাব করে বাচ্চচাটা থাকলে কত বড় হত। তিন বছর! তিন বছরের বাচ্চচা! ছেলে না মেয়ে কী জানি? পায়ে পায়ে হাঁটত। কেউ একটা খুব নিজের হত! মন আবার কেমন যেন করে!
কিন্তু মন খারাপ করার আর সময় কোথায়? ঢাকা শহরে মন খারাপ করে ঘরে শুয়ে থাকার সময় বড়জোর চব্বিশ ঘণ্টা। প্রতিদিন বেঁচে থাকার যুদ্ধ।
মিরাজের আলিঙ্গন তিনটে বছর পর আনিসুজ্জমানকে মনে পড়িয়ে দিয়েছিল আবার! সেই শক্ত আষ্টেপৃষ্টে আলিঙ্গন।
—কী ভাবতেছ?
—কিছু না।
—তুমি কিন্তু এখনও আমার হইলে না! আইজ বাসায় যাইবা?
চলো না? শুধু রাস্তায় রাস্তায় নদীর ঘাটে ঘুরে বেড়াইতে ভালো লাগে? মিরাজের হাত তার কোমর ছুঁয়েছে এখন।
—না, বাসায় গিয়া কী হইব? বন্ধ ঘর। আলো—বাতাস ঢোকে না! কী করব বাসায় গিয়া?
—আমাকে কোলোজ করে পাইতে ইচ্ছা হয় না তোর? কী রে সোহাগি?
হেসে ফেলল আয়েশা। বলল, ‘সোহাগি!’ সেডা আবার কেডা হইল?
আশপাশ দেখে নিয়ে জাপটে ধরে এবার খান দুয়েক চুমু খেয়ে ফেলল মিরাজ তাকে। আদর ঘন গলায় বলল, তুই, তুই আমার সোহাগি। তুই এখনও দুই মাস হইয়া গেল বুঝস নাই আমারে।
তোর জন্য কী না করতে পারি আমি! বিয়া করি চল। দুই জনাই কামাই করি। আমি বাসা ভাড়া দিব। আর তুই বাজার খরচ। আর তোর লিপিস্টিক শাড়ি আমি দিব। কি? রাজি?
—আমার একখান বাচ্চচার সাধ বড়।
—তা তো হইবই। তবে আমরা এখন বাচ্চচা নিমু না। অনেক খরচা। যে বাবুটা আসবে তারে যদি বেবি ফুড, মাছটা—ডিমটা খাওয়াইতেই না পারি তাইলে বড় দুঃখ।
—তোমার তো বউ আছে। দুইডা বাচ্চচা। তোমার আর কী? দীর্ঘ নিঃশ্বাস পতন হল আয়েশার বুক ভেঙে।
মেঘ কালো আকাশ। কালিগঙ্গার আকাশ, জল আরও ঘন।
আরও কালো।
লোকজন বিশেষ নেই। কিছু নৌকা আর ছোট লঞ্চ, ভুটভুটি যাতায়াত করছে শুধু।
—নৌকা চড়বি? চল, কিছুটা দূর পর্যন্ত ঘুরন দিয়া আসি।
—না। কেমন যেন জেদ পেয়ে বসল। মাথা নাড়ল আয়েশা, না, চলো যে—যার বাসায় যাই গিয়া। কাইল থেকে আবার কোরবানি পর্যন্ত দুই শিপটে কাম!
—আমার বাসাটা কি আমাদের বাসা হইতে পারে না? তোমায় তো কত আলফাল লোক ডিস্টাব দেয়। ঢাকা শহরে একলা মাইয়া মানুষের জন্য নিরাপদ নয় গো দোস্ত। চলো একসঙ্গে থাকি দুই জনা। তোমার হাতে রান্না খাইয়া সকাল বেলায় গাড়ি ইস্ট্যাট দেবনে। আর রাতে দুই জনা দুই জনারে জড়াইয়া ঘুম দিব। আহ! শান্তি!
লোভ হয়। বড় লোভ হচ্ছে আয়েশার। বড় একলা লাগে! দিনভর কাম কাজ করার পর একলা বাসায় ফিরে এসে কথা বলার একটা লোক নেই পর্যন্ত।
আগে তার শরীর বোধও ছিল না। আনিসুজ্জমান তাকে তার নিজস্ব শরীরের খিদে তেষ্টা চিনিয়েছে প্রথম। এখন সেই নিজের শরীরটাও বিশ্বাসঘাতকতা করে তার সঙ্গে।
ঘাড় নাড়ল আয়েশা। বলল, বিয়া করব।
—বিয়া নয়। আমারে আরেকটু চিনো বউ। আরেকটু বুঝো। তারপর। আমি মানুষটা তো খারাপও হইতে পারি?
