পরপর ক’মাস ধরে রোববারের খবর কাগজে দেখছিলাম সব বিখ্যাত বিখ্যাত লোকদের কেচ্ছা বেরুচ্ছে। সবারই কত সেক্স লাইফ। আমিও কম কীসে? আমারও তো ইচ্ছে হতে পারে। আমিই বা এক বউকে নিয়ে পড়ে থাকব কেন? অনেককে ভোগ করো—এটাই তো পৌরুষ। মরদের লক্ষণ। রোববারের কাগজেই তো বক্স করে লিখেছে বহুগামিতা পুরুষের পক্ষে স্বাভাবিক।
কাশীনাথটাকে বললাম, বিয়েটা কর, খরচা আমার, শালা সেয়ানা আছে। সিধে ডিনাই করল। কেসটা মিটে যাক, ওকে হাটিয়ে দেব। একের নম্বরের নিমকহারাম।
.
উত্তম চোংদার কাশীনাথকে বলল, অনেকক্ষণ হয়ে গেছে, যা—না, একবার ওঘরে কী হচ্ছে দেখে আয়, তুই তো কখনও পুরো মেয়ে দেখিসনি।
কাশীনাথ বলল, ধুস!
উত্তম বলল, ফালতু ফালতু কত খরচা হয়ে গেল। গণপতি মণ্ডল একগাদা টাকা চেয়ে বসেছে।
গণপতি মণ্ডল হন্তদন্ত হয়ে পাশের ঘরে এল। এসেই বলল, স্যালাইন আছে, স্যালাইন, একটা বোতল বার করুন এক্ষুনি।
উত্তম বলল, কেন, স্যালাইন কী হবে?
দরকার, দরকার। স্যালাইনের সঙ্গে টিউব—নিডলও বার করুন।
উত্তমের চোখের দিকে তাকাল কাশীনাথ। চোখে সম্মতি পেল। সঙ্গে সঙ্গেই কাশীনাথ শোকেস থেকে একটা স্যালাইন বার করল। গণপতি মণ্ডল ওটা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পাশের ডাক্তারের চেম্বারে ঢুকে গেল। উত্তমও পিছন পিছন গেল। উত্তম ও ঘরে গেল বলে কাশীনাথও। গণপতি মণ্ডল মেয়েটার মুখের ভিতর থেকে তুলোর দলাটা বার করে নিল। মেয়েটা এখন যতটা জোরে কাতরাতে পারছে, সেই আওয়াজ বেশি দূরগামী হবে না। মেয়েটার দুই ঊরুতে রক্ত। যোনিমুখে রক্ত, রবার ক্লথে রস রক্ত ফেনা।
মাছি এসে গেছে।
গণপতি মণ্ডল ঘামছে। বলল, ফিটাসটা এমন আঁকড়ে ধরেছিল ইউটেরাসটাকে, যেন মায়ের কোল। স্ক্রাপ করতে গিয়ে ইউটেরাসটা ফুটো হয়ে গেছে।
তা হলে কী হবে!
ভিতরে ব্লিডিং হচ্ছে। কেস খারাপ।
গণপতি মণ্ডল মেয়েটির নাড়িতে আঙুল রাখে। চোখ বোজে। মেয়েটার জড়ানো কথা শোনা যায়, আমাকে বাঁচান, আর কখনও চাইব না। একটা মাছি গরিব স্তনবৃন্তের উপরে চুপচাপ বসে যায়, গণপতি মণ্ডল বলে—এখন এই অবস্থায় হাসপাতালেও যাওয়া যায় না। সবার হাতকড়া পড়বে। ডাইসিনিন ইনজেকশন আছে, ডাইসিনিন?
কাশীনাথ জানে ওটা নেই। ইশ, কেন নেই? ডাইসিনিনটা থাকলে কি মেয়েটা ঠিক হয়ে যেত! তা হলে ক্রোমোস্ট্যাট? গণপতি জিজ্ঞেস করে।
আছে। আছে। কাশীনাথ শোকেস খুলে ছোঁ মেরে নিয়ে আসে। গণপতি ইনজেকশনটা দ্রুত পুশ করে। মেয়েটার কষ্টের শব্দ ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে, কিন্তু চোখ খোলা। চোখ কথা বলছে, বাঁচাও, প্লিজ বাঁচাও।
উত্তম বলে আপনার উপর বিশ্বাস ছিল, গণপতিবাবু।
গণপতি বলে, শালার ফিটাসটা এমনভাবে আঁকড়ে ধরেছিল ইউটেরাসটাকে। আমি কী করব, একটু জোর পড়ে গিয়েছিল চাঁচতে গিয়ে।
কী হবে যদি…উত্তম আর কিছু বলতে পারে না।
ডেকাড্রনও দেওয়া হল। মেয়েটা চোখ বুজল।
সারাটা ঘরে নিস্তব্ধতা। একটা ছোট ফ্যান ঘুরে যাচ্ছে। গণপতির একটা হাত মেয়েটার হাতের কবজি ধরে আছে। একটু পরেই গণপতি দু’হাতে মেয়েটার বুকে চাপ দিতে থাকল, তারপর নাড়ি দেখল, চোখের পাতা তুলে চোখ দেখল, তারপর বলল, সরি।
উত্তম চিৎকার করে উঠল, শুয়োরের বাচ্চচা কোথাকার।
গণপতি আর একবার মিনমিন করে বলল, এমনভাবে খামছে ধরেছিল ফিটাসটা…। গণপতি বেসিনে লাল সাবানে হাত ধুয়ে পকেট থেকে কয়েকশো টাকা বার করে টেবিলে রাখল। বলল, যে টাকাটা অ্যাডভানস নিয়েছিলাম সেটা ফেরত দিচ্ছি।
উত্তম বলল, এসব নখরামি ছেড়ে বলুন এখন কী করব?
গণপতি বলল, আমাকে ফাঁসাবেন না। আমি ডিনাই করব। আবার সাবান ঘষতে লাগল হাতে। আমি ফেঁসে গেলে আপনাকেও ফাঁসাব আমি।
কাশীনাথ বলল, উত্তমদা, আমি তো কিছু করিনি, আমিও কি ফেঁসে যাব?
গণপতি বলল, যাতে কাউকে না ফাঁসতে হয়, সেই ব্যবস্থা করলেই তো হয়। কোনও চিহ্ন রেখো না।
.
কাশীনাথ তখন খুনের চিহ্ন লোপাট করছে। তুলো দিয়ে মুছে নিল ঊরুতে লেগে থাকা রক্ত। যোনিমুখে জমাট বাঁধা কালচে রক্ত, এই প্রথম কোনও যোনি স্পর্শ করল কাশীনাথ, মৃতমানুষের। উত্তমদা কিছু বলছে না, তাকিয়ে আছে শুধু, ওতেই বুঝতে পারছে কাশীনাথ, উত্তমদা বলছে, আমি তোর প্রভু, কাশীনাথ তুলো দিয়ে রবার ক্লথের রসরক্ত কাঁচিয়ে পরিষ্কার করে। উত্তম দু’হাতে মুখ ঢাকে। কাশীনাথ সমস্ত রক্তমাখা তুলো একসঙ্গে জমা করে কয়েক ফোঁটা স্পিরিট ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুন নিভে গেলে কালো ছাইগুলোকে একটা নিরীহ ঠোঙায় ভরে ফেলে।
উত্তম চোংদার ওষুধের একটা খালি পেটি বার করে আনে। বলে এটায় ঢোকাতে হবে। কাশীনাথ ওটাকে দেখে। বলে ওটায় তো কোম্পানির নাম লেখা, কনসাইনমেন্ট নম্বর লেখা, ফেঁসে যাবে তো। নাকে অক্সিজেন ফিট করে দেবার পর বড়লোক রোগী যেভাবে নার্সিংহোমের নার্সকে থ্যাংকিউ বলে, সেরকমভাবেই বলল, থ্যাংকিউ। কাশীনাথ একটা মিনারেল ওয়াটারের খালি পেটি নিয়ে এল। যাবতীয় নম্বরটম্বর ছিঁড়ে ফেলল, বলল—এটায়।
উত্তম বলল, ঢুকবে না। একটা করাত ছিল না ঘরে, করাত, —পারবি?
কাশী ওর প্রভুর দিকে তাকিয়ে বলল, পারব।
কাশীনাথ, ভিতু কাশীনাথ, নিজে হাতে কোনওদিন মুরগিও কাটেনি। হাতে করাত তুলে নিল। মেয়েটার মুখের দিকে তাকাল না, ভুল করে উচ্চচাভিলাষী হতে যাওয়া বুকের দিকেও নয়, শুধু গলাটার দিকে তাকিয়ে ওখানে করাতটা চালাতে লাগল। হচ্ছে, আলগা হচ্ছে, এই প্রভু, পারলাম। চেয়ারে বসে থাকা উত্তমের দিকে তাকাল কাশীনাথ। কাশীনাথ দেখল উত্তমদার মাথাটা ঝুলে গেছে, চেয়ার থেকে পড়ে যাচ্ছে উত্তমদা। কাশীনাথ দৌড়ে গিয়ে উত্তমকে ধরে ফেলল। উত্তম অজ্ঞান হয়ে গেছে। কাশীনাথ উত্তমকে শুইয়ে দেয় মেঝেতে। জলের ঝাপটা দেয় চোখে মুখে। উত্তম একটু পরে চোখ খোলে। বলে—হঠাৎ মাথাটা ঘুরে গেল কাশী। তা হলে একটু মানুষ আমি এখনও আছি বল?
