নবজীবনের ডাক্তারের ফাঁকা চেম্বারে এই রবিবার একটা সুন্দর ছিমছাম কিউট বাক্স এসেছে। ওই বাক্সে পুরো প্যাকেজটাই আছে। ডায়লেটেশন অ্যান্ড কিউরেটিং মেশিন উইথ সাকশান। নবজীবন ফার্মেসি রবিবার বন্ধ থাকে। আজ রবিবার। বাইরে তালা ঝুলছে। ভিতরে রয়েছে হেলাবটতলার মাতৃমঙ্গল ক্লিনিকের ডাক্তার গণপতি মণ্ডল। হাবড়া, অশোকনগর, গোবরডাঙা অঞ্চলের রেলস্টেশনে, বাসটার্মিনাসে, বাজারের পেচ্ছাপখানায় এই ডা. মণ্ডলের টাইপদের গোঁপওলা ছবি দেখতে পাওয়া যায়। আর আছে সোনালি।
উত্তম চোংদার আর কাশীনাথ নবজীবনের ভিতরে বসে আছে। সমস্ত দরজা জানলা বন্ধ, নবজীবনের ভিতরে টিউব লাইটের আলো। এখন বেলা এগারোটা। ঘরের ভিতর প্রচুর ধোঁয়া, কাশীনাথ ও উত্তম সিগারেট খেয়ে চলেছে। ইলেকট্রনিক দেয়াল ঘড়িটার কাঁটা নড়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে, পাশের চেম্বার থেকে গণপতি মণ্ডলের গলা শোনা যাচ্ছে মাঝে মাঝে—কোনও ভয় নেই, পনেরো মিনিটের ব্যাপার। মেয়েটার ভয়—পাওয়া কাতর কণ্ঠ মাঝে মাঝে শোনা যাচ্ছে, কিন্তু কী বলছে বোঝা যাচ্ছে না। গণপতি মণ্ডল একবার বাইরে এলেন। বললেন, ও কাশীনাথবাবুকে একটু ডাকছে।
কাশীনাথ ঘরের পর্দা সরিয়ে উঁকি দিতেই তুলোর বান্ডিল থেকে এক মুঠো তুলো খামচে নিয়ে সোনালি ওর দুই ঊরুর মাঝখানে ফেলে দিল। আড়াল করতে চাইছে ও, একটু আড়াল। কাশীনাথের চোখের দিকে চাইল। কাশীনাথ ওর চোখের ভাষা পড়তে পারল। কাশীনাথ ঘাড় নাড়ল। এবং মনে মনে বলল, কথা দিচ্ছি দু’বছর পরে। সোনালি মৃদু হাসল। আবার কী যেন বলছে চোখ। কাশীনাথ বলল, কোনও ভয় নেই, আমি পাশের ঘরেই আছি। সোনালি হাউহাউ করে কেঁদে উঠল। গণপতি মণ্ডল বলল, আবার কান্না? সাউন্ড বাইরে যাচ্ছে, বলেই এক দলা তুলো সোনালির মুখের মধ্যে পুরে দিল, ঠেসে দিল। কাশীনাথকে বলল, বাইরে যান।
গণপতি মণ্ডল টিউবে লুব্রিকেটিং জেলি মাখাতে মাখাতে সোনালিকে জিজ্ঞাসা করল, একচুয়ালি ফাঁসিয়েছে কে? কাশীনাথ?
সোনালি মাথা ঝাঁকাল।
উত্তমবাবু?
সোনালি চুপ।
নাকি দুজনেই কাজ করেছে?
সোনালির চোখে জল। মুখের আওয়াজ শুষে নিচ্ছে তুলোর দলা।
গণপতি মণ্ডল টিউবের মাথায় কিউরেটিং—এর যন্ত্রটা বসিয়ে দিল। ওটাই ধারালো দাঁতে ভ্রূণটা চাঁচবে। বাইরে থেকে ওই দাঁতের শক্তি বাড়ানো কমানো যায়, সরানো যায়, নড়ানো যায়। গণপতি মণ্ডল যন্ত্র বসানো টিউবটাকে ঠেলে দিলেন। দুর্গা দুর্গা।
পাশের বন্ধ ঘরে চুপচাপ বসে থাকা উত্তম দুটো ধূপকাঠি জ্বালিয়ে মাকালীর ছবির ফ্রেমে গুঁজে দিল। কাশীনাথ এসে টুলে বসল। উত্তম কাশীনাথকে বলল, তোকে এত করে বললাম, ওকে বিয়েটা করে নে, মাইনে বাড়িয়ে দিতাম, শুনলি না।
.
লোকে বলে আমি উত্তমদার চামচে। আমিও তাই মনে করি। উত্তমদা তখন আমাকে ডেকে চাকরিটা না দিলে না খেয়ে মরে যেতাম। উত্তমদা বলেছে একটা প্যাথলজিকাল ক্লিনিক করে দেবে। উত্তমদা এখন পার্টি করে। টাকা দেয়, পার্টির লোক আসে, আড্ডা মারে, থানাতেও খুব খাতির, ওসির সঙ্গে মাল খায়।
উত্তমদাই আমাকে প্রথম মাল খাইয়েছে, প্রথম ব্লু দেখিয়েছে, সোনালিকে ডাক্তারের চেম্বারে ঢুকিয়ে আমাকে যেতে বলেছিল একদিন। বলেছিল, যা, এক্সপেরিয়েনস করে আয়। আমি যাইনি। আমার খুব ভয়।
উত্তমদা আমাকে দিয়ে বোতলটোতল আনায়, আমি এনে দি। গেলাসেও ঢেলে দি, আমাকে খেতে বলে। প্রথম প্রথম খেতাম না, এখন মাঝে মধ্যে একটু খাই। না খেলে আমার ভয় করে। উত্তমদা আমার সঙ্গে হার্গিস মালিকের মতো ব্যবহার করেনি, বন্ধুর মতো। ওর মেয়ের জন্মদিনের সব বাজার—টাজারের দায়িত্ব ছিল আমার উপর। উত্তমদা বউ আর শালি নিয়ে দিঘা গেল। পুরো দোকানটা আমিই দেখলাম। আমাকে এতটা বিশ্বাস করে। তাই আমি উত্তমদার কোনও কথা ফেলতে পারি না, কিছু করতে বললে না করতে পারি না। একবারই না করেছিলাম—যখন ফেঁসে যাওয়ার পর উত্তমদা বলেছিল, ওকে বিয়ে কর, মাইনে বাড়িয়ে দেব।
কেন করব আমি, ওর পেটে উত্তমদার বাচ্চচা, আর আমাকে বলছে বিয়ে করো। আমি বলেছিলাম, তা হয় না উত্তমদা। বিয়ে করার ছ—সাত মাসের মধ্যে বাচ্চচা হয়ে গেলে সবাই ভাববে বিয়ের আগেই আমি…।
বেশ করেছিস বিয়ের আগে করেছিস। ভাবলে তোর কী যায় আসে!
আমি তো করিনি, উত্তমদা।
করিসনি তো করিসনি। তা এখন বিয়েটা করে নে।
কিন্তু বাচ্চচাটা তো আমাকে বাবা ডাকবে। সারাটা জীবন।
ডাকুক।
না। ক্ষমা করে দিও, উত্তমদা।
তা হলে অন্য ব্যবস্থা নিতে হবে।
এই বলে অনেকক্ষণ চুপচাপ ছিল উত্তমদা। তারপর বলল, আমি এখন পুরো অফ হয়ে যেতে পারি, কিন্তু কী সব জিনেটিক টেস্ট—ফেস্ট হচ্ছে আজকাল। ওটাকে অফ করে দিতে হবে। তুই আমাকে মদত করবি তো?
আমি বলেছিলাম, করব।
করছি তো, আমি তো মদত করছি। মদত না করে কী করব? ডাক্তারখানা বন্ধ হয়ে গেলে আমার যে ভাত বন্ধ হয়ে যাবে।
.
আমি শালা উত্তম চোংদার, বুদ্ধু বনে গেলাম। কেন যে ফাঁসলাম। ঘরেতে শালা পারফেক্ট ফ্যামিলি প্ল্যানিং করছি, একটা মেয়ে, চার বছর বয়স হল—এখনও ফারদার বউয়ের পেট বাধাইনি, এখানেই গড়বড় হয়ে গেল।
ওকে জাস্ট বিনে পয়সায় ফাইলগুলো দিচ্ছিলাম। ওর খুব শখ হয়েছিল যৌবনবতী হবে। ভিটামিন ক্যাপসুলও দিচ্ছিলাম, পয়সা তেমন নিতাম না। ওকে বললাম, নিজে নিজে মালিশ করে লাভ হয় না। অন্যহাতে করাতে হয়, যত করাবে তত ভালো হবে। তাতেই টোপ গিলে ফেলল মেয়েটা, তো আমি কী করব?
