ওই ওষুধ খেয়েছিল সোনালি, কিচ্ছু হয়নি। যখন বিয়ে হবে ঠিক হয়ে যাবে বলে দিলেই হল? বিয়েটা হবে কী করে? কে করবে? কলেজের দু—একটি মেয়ে মেয়েদের পত্রিকা রাখে। ওগুলোতে মাঝে মাঝে মোহময়ী হয়ে ওঠার কথা পড়েছে সোনালি। ‘পুরুষের কাছে আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠুন’ পড়েছে। পুরুষের চোখে নারীদেহ নামে একটা লেখায় যতসব মান্যগণ্য বিখ্যাত মানুষেরা তাদের মনের কথা বলে দিয়েছে। কিছুদিন পরে আর একটা সংখ্যা বেরোয়, স্তন সংখ্যা। সোনালি কিনে নেয়।
সোনালি টিউশনি করে। ক্লাস ফোরের দুটো মেয়ে। ওদের অঙ্ক করতে দিয়ে বইটা খোলে। লুকিয়ে লুকিয়ে একটু একটু পড়ে। কান লাল হয়, তেষ্টা পায়। চোখে পড়ে খাজুরাহোর পাথরমূর্তির ছবির তলায় লেখা স্তনই নারীর সম্পদ। তারপর একটা বিজ্ঞাপন। স্তন সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য গ্লান্ডিনার।
উত্তম চোংদারের ওষুধের দোকানের নাম নবজীবন ফার্মেসি। দোকানদার সামনে একবার দাঁড়াল সোনালি। দোকানে তখন কয়েকজন খদ্দের ছিল। সোনালি সরে গেল। একটু দূরে দাঁড়িয়ে দেখল দোকান ফাঁকা হয়েছে। তবু যেতে পারছে না। বাজারের মধ্যে যে—ওষুধের দোকানটা, ওখানে একটা বুড়ো লোক থাকে। বরং ওখান থেকে কেনাই ভাল। কিন্তু ওখানে বড্ড ভিড় থাকে। তা ছাড়া মুখও চেনা। ওদের পাড়াতেই থাকতেন। ওর বড্ড লজ্জা করে।
সোনালি রেডি হয়। একটু স্মার্ট হওয়ার জন্য নিশ্বাস নেয়। রেডি সেডি গো। শোঁ করে যেন উড়ে নবজীবনের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। গ্লান্ডিনার কত দাম?
সামনের কাউন্টারে দাঁড়িয়ে ছিল কাশীনাথ। ভিতরে একটা টেবিলে বসেছিল উত্তম। ওখানেই ক্যাশ। কাশীনাথ আলমারি খুলে ফাইলটা বার করে। ফাইলের গায়ের দাম দেখে বলল, সত্তর টাকা।
সোনালির টিউশনির পনেরো দিনের মজুরি। সোনালি ব্যাগ থেকে একটা একশো টাকার নোট বার করে বলল, দিন।
ভিতর থেকে উত্তম চোংদার সোনালিকে দেখল। দেখে বলল, মালিশ করতে হবে কিন্তু। ভালো করে মালিশ করতে হয় জানেন তো। সোনালির কান লাল হয়ে গেল।
উত্তম কাউন্টারের দিকে এগিয়ে এল। বলল, হাবড়া চৈতন্য কলেজে পড়েন না?
সোনালি কোনও জবাব দিল না।
উত্তম প্যাকেটটা একটা কাগজে মুড়ে দিয়ে বলল, বছর খানেক ধরে ইউজ করলে উপকার হয়। গাছ—গাছড়া আজও কথা বলে।
সোনালিদের বাড়িটা গোবরডাঙা স্টেশন থেকে একটু ভিতরের দিকেই। মরা যমুনা নদীটা সামনেই। এখনও জোয়ার—ভাটা খেলে। ওখানে ছোটবেলায় স্নান করেছে সোনালি। এখনও মাঝে মাঝে করতে ইচ্ছে হয়। অনেক মেয়ে—বউরা স্নান করে যমুনার জলে, স্নান করে ভেজা কাপড়ের উপর গামছা ঢাকা দিয়ে বাড়ি ফেরে। সোনালির বোনটা, মানে সৎবোনটা, সিক্স—এ পড়ে। ও নদী নেয়ে এলে ফ্রকের উপর গামছা ঢাকা দেয়। সোনালিদের বাড়িতে একটা টিউবওয়েল আছে। ওখানেই স্নান করে। ওর গামছা ঢাকা দিয়ে ঘরে না গেলেও চলে। ওর একদিন ইচ্ছে করল নদীতে নাইবে। নদীতে স্নান করে ঘরে ফিরছিল, পাকা রাস্তা দিয়ে একটুখানি হাঁটতে হয়, তোয়ালে ঢাকা দিয়েছিল বুকের উপর। ওই রাস্তা দিয়ে বাইক চালিয়ে যাচ্ছিল উত্তম চোংদার। সোনালিকে দেখে ব্রেক কষল। বলল, ওঃ লুকিং সো বিউটিফুল! আসবেন, আর একটা দিয়ে দেব। সোনালিদের বাড়ির চারিদিকে আকাশ। আর কাছেই একটা নদী। ওদের ঘরটা গাছের ছায়ায় ঢাকা, ঘর তো নয়, কুটির। সৎমায়ের ঝি, সোনালি যেন রূপকথার মেয়ে হয়ে গেল। মায়া—সরোবরে নেয়ে এসেছে যেন। বাইকের ঢিকঢিক এখনও শোনা যাচ্ছে, পক্ষীরাজ ঘোড়া। দর্পণে মুখ দেখতে চাইল সোনালি। ড্রেসিংটেবিলটা মায়ের ঘরে।
সোনালিদের একটা ঘর পাকা, আর একটা ঘরে এখনও টালির চাল। টালির ঘরে সোনালি থাকে, একটা টেবিলে ওর ভারতীয় দর্শন, ইউরোপের ইতিহাস, জুলিয়াস সিজার, আর কী করে মোহময়ী হয়ে উঠবেন। ওর সঙ্গে শোয় ওর সৎ বোন, সৎ ভাই। বাবা—মা অন্য ঘরে। ওর ভাইবোনরা শুয়ে পড়লে, সোনালি পড়ার টেবিলে বসে থাকে, তারপর রাত নিশুতি হলে, ও অন্ধকারে একা একা নিজের বুকে আয়ুর্বেদ মালিশ করে।
সোনালি একদিন নবজীবন ফার্মেসিতে গেল। তখন বিকেল। কাশীনাথ গিয়েছিল খাটালে। দুধ আনতে। উত্তম চোংদার একা দোকানে, এবং ডাক্তারের চেম্বারটাও ফাঁকা। সোনালির পদক্ষেপ সেদিন কী স্মার্ট, সোজা দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। উত্তম উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল, আইব্বাস, এসে গেছেন। কথা আছে, এ ঘরে চলুন। ডাক্তারের চেম্বারে গিয়েই বলেছিল, এই তেল মেসেজ করার একটা নিয়ম আছে।
.
গর্ভপাত করার কয়েকটা নিয়ম আছে। সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে ভ্রূণহত্যার কৌশলও পালটাচ্ছে। শুধু ভ্রূণহত্যাই বলি কেন, সভ্যতা যত এগিয়েছে হত্যা ব্যাপারটাও তত সহজ ও সাবলীল হয়েছে। আগে ঘাতককে কাছে আসতে হত। তিরধনুকের পর দূর থেকেও হত্যা সম্ভব হল। বন্দুকে আরও দূর থেকে মেরে ফেলা যায়, কামানে আরও দূর থেকে, এখন ঘরে বসে, স্যান্ডুইচ খেতে খেতে, কমিকস দেখতে দেখতে, হাসতে হাসতে একটা বোতাম টিপে দিলেই হল। গর্ভপাতের জন্য আগে জরায়ুতে শেকড় বা কোনও সরু ডাল প্রবিষ্ট করে দেয়া হত। জরায়ু বাইরের কোনও পদার্থ সহ্য করতে পারে না, সে নিজের মাংসপেশি সংকোচন করে বাইরের জিনিসটাকে ঠেলে বার করে দিতে চায়। যত্নে রাখা ভ্রূণটিও বেরিয়ে যায় তখন। প্রচণ্ড কষ্ট হয় এতে গর্ভধারিণীর। রক্তপাতও হয়। জরায়ুতে নুনজলও ঢুকিয়ে মারা হয় ভ্রূণটিকে, যেভাবে শিঙি মাছ, মাগুর মাছকে নুন মাখিয়ে মারা হয়। নারকোল কোরাবার মতো করে ছোট ভ্রূণটিকে জরায়ুর আধার থেকে চেঁচে কুচিকুচি করে ফেলার মতো যন্ত্রপাতিও এই সভ্যতা দিয়েছে—ডায়লেটেশন অ্যান্ড কিউরেটিং মেশিন। ওই কুচিকুচি ভ্রূণশরীরটিকে জরায়ুর আধার থেকে বাইরে বের করে আনবার জন্য রয়েছে সাকশান মেশিন।
