—কী হল? সামন্ত ঝুঁকে বসেছে, চুপ করে রইলেন যে?
—এটা ভাবা যেতে পারে—আমি অন্যমনস্কভাবে বলি।
—এটাই ভাবতাম জয়বাবু…যদি না দীপ্তবাবুর ভিসেরায় একটু স্ট্রং বার্বিচ্যুরেটের সন্ধান পাওয়া যেত। নিজেকে ঘুম পাড়িয়ে কি ব্লেড দিয়ে নিজের গলার নলি কাটা যায়? সেইজন্যে সব দিক ভেবে—চিন্তে আমরা এক দ্বিতীয় ব্যক্তির খোঁজ করছি, সে ঠিক দীপ্তবাবুর মতো, যার পরিস্থিতি ঠিক দীপ্তবাবুর মতো, দীপ্তবাবুর মতোই যার আত্মবিনাশ করতে প্রবল ইচ্ছে হয়, কিন্তু যে… আসলে আপনি নিজেকে মারতে চেয়েই দীপ্তবাবুকে মেরেছেন, তাই না জয়বাবু?
—এগজ্যাক্টলি—আমি ক্লান্ত গলায় বলি এবং হা—ক্লান্ত চোখে কানাইলাল সামন্তর মুখের দিকে তাকাই। তাকিয়ে থাকি।
যে মেয়েটি মোহময়ী হতে চেয়েছিল – স্বপ্নময় চক্রবর্তী
দুটি মানবদরদি রাজনৈতিক দলের পারস্পরিক বোমাবাজির মধ্যে ঢুকে পড়েছিল কাশীনাথের বাবার প্রাচীন হারকিউলিস সাইকেলটি। ব্রেক কষার মুহূর্তে একটা বোমা ফেটেছিল তাঁর গায়ে। হাসপাতালে যখন নেওয়া হল, তখন তিনি মৃত। ময়নাতদন্তের জন্য পুরো বডি দরকার, তাই খোঁজাখুঁজি করে নয়ানজুলিতে পাওয়া গিয়েছিল তাঁর বাঁ হাত ও বাঁ পায়ের অংশ। পায়েতে তখনও স্যান্ডাকের জুতোটা আটকে ছিল।
এরপর দুটি মানবদরদি দলই দাবি করল হত্যাকারীর শাস্তি চাই। কিন্তু হত্যাকারীকে পাওয়া গেল না, ওরা বলল পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। ওরা বলল পরিবারের একজনকে চাকরি দিতে হবে। রাস্তা অবরোধ হল, যা হয় আর কী, মন্ত্রী এসে জানালেন চাকরি দেওয়া হবে। কিন্তু চার বছর হয়ে গেল, কিছুই হয়নি, যদি জানতে চান।
অনাথ কাশীনাথের দিকে মদতের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল উত্তম চোংদার। উত্তম তখন হাটখোলায় নতুন মার্কেট—কমপ্লেক্স—এ ওষুধের দোকান দিয়েছে। ওই দোকানের কর্মচারী করে নিল কাশীনাথকে। কাশীনাথ তখন সবে বি কম পরীক্ষা দিয়েছে। ওর বাবা ছিল পালিশ মিস্ত্রি। হাবড়ার একটা ফার্নিচারের দোকানে কাজ করত। কাশীনাথ ওর বাবার কাজ শেখেনি। ওর ইচ্ছে ছিল চাকরি—করা—ভদ্রলোক হবে।
ও ওষুধের দোকানে চাকরি পেল। সকাল সাড়ে সাতটা থেকে রাত সাড়ে দশটা। দুপুরে একটা থেকে চারটে বন্ধ। তখন বাড়ি গিয়ে খাওয়া দাওয়া। এর মধ্যেই অন্য কাজও কিছু করতে হয়, যেমন বিকলে পাঁচটায় খাটাল থেকে গোরুর দুধ কিনে চোংদার বাড়ি পৌঁছে দেওয়া, চোংদারের চার বছরের মেয়ের বেলা এগারোটার সময় কিন্ডারগার্টেন ইস্কুল ছুটি হলে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া এইসব।
কাশীনাথের ইচ্ছে ছিল পিএসসি, এসএসসি, স্কুল সার্ভিস কমিশন ইত্যাদি পরীক্ষা দেবে। কমপিটিশন সাকসেক—টাকসেস কিনেছিল, খোলার সময় পায়নি।
কাশীনাথের একটা ভাই আছে। ফিটের ব্যারাম। মানে মৃগী রোগ। আগে টোটকা চলছিল, কাশীনাথ এখন ডাক্তার দেখিয়েছে। উত্তম চোংদার বিনে পয়সায় গার্ডিনাল সাপ্লাই করে যায়। কাশীনাথের বোনের বয়েস বারো। খুব মাথা ঘোরে। উত্তম চোংদার মাঝে মাঝে টনিকের শিশি দেয়, পয়সা লাগে না। পুজোর সময় নতুন জামা দেয় উত্তম, ওষুধের দোকানের মধ্যে একটা ডাক্তারের চেম্বার আছে, এমবিবিএস ডাক্তার বসিয়েছে, ওখানে একটা টিভি সেটও রাখা আছে। রবিবার দোকান বন্ধ। মাঝেমধ্যে কোনও রবিবারে ভিসিপি ভাড়া করে ‘ব্লু’ দেখা হয়, উত্তমের বন্ধুবান্ধব থাকে। কাশীনাথকেও থাকতে দেয়। কাশীকে মোটর সাইকেল চালানো শিখিয়ে দিয়েছে। এমনিভাবেই কাশীনাথের বিস্বাদ জীবনে নিমক যুক্ত করছে উত্তম। কাশীনাথ কখনও নিমকহারামি করতে পারবে না।
সোনালি গড়াই কুড়ি বছরের যুবতী মেয়ে। কিন্তু ছেলেরা ওকে নিমাই নাম দিয়েছে, সোনালি সেটা জানে। কোথাও যৌবন শব্দ চোখে পড়লে সোনালি চোখ সরিয়ে নেয়। টিভিতে যখন মেয়েরা বুক কাঁপিয়ে নাচে, কিংবা নানা ছলে বুক দেখায়, সোনালির গা জ্বলে যায়। কলেজে পড়ে ও। সালোয়ার—কামিজ পরে না আর। ওকে শুনিয়ে শুনিয়ে দুটো ছেলে ম্যানচেস্টার সমাসের ব্যাসবাক্য ভেঙে ছিল—যে উওম্যানের চেস্ট ম্যানের ন্যায়। সোনালির নিজের মা নেই। একটা সৎমা আছে। ওর বাবা সকাল আটটা বারোর ট্রেনে কলকাতা যায়, রাত ন’টায় ফেরে। ওর বাবা কি জানে ও কেন সালোয়ার—কামিজ পরে না? সোনালির নিজের মা অনেক দিন আগে মরে গিয়েছে। সৎমাটা কেমন যেন। শোবার আগে পায়ে আলতা দেয়, কপালে দলা করে সিঁদুর মাখে, সোনালিকে কোনওদিন লিপস্টিক কিনে দেয় না, কোনওদিন ময়েশ্চারাইজার কিনে দেয় না। কোনওদিন ডাক্তারের কাছেও নিয়ে যায়নি। পাশের বাড়ির মাসিমা হোমিওপ্যাথির ওষুধ দেয়। একটা মোটা বই থাকে টেবিলের উপরে, চশমা পরে, মাঝে মাঝে বই দ্যাখে, আর ওষুধ দেয়। পাঁচ টাকা করে নেয়। একদিন লজ্জার মাথা খেয়ে ওই মাসিমার কাছে গিয়েছিল সোনালি। বলেছিল মাসিমা, আমার স্বাস্থ্যটা ভালো করে দিন না। মাসিমা বলেছিলেন—এমনিতে তো স্বাস্থ্য তোমার ভালোই, হাত পা তো বেশ মোটাসোটা…
সোনালি বলেছিল—না, সেটা বলছি না, বলে মাথা নিচু করে ছিল।
মাসিমা বলেছিল, বুঝেছি, বুঝেছি। তারপর চোখে চশমা লাগিয়ে বইটা খুলে ছিল।
মেনস ঠিক মতো হয়?
হয়।
শুরু হয়েছিল কবে?
সেবেন থেকে।
মাসিমা কয়েকটা পুরিয়া বানিয়ে একটা খামে ভরে সোনালির মাথায় হাত রেখে বলেছিল, চিন্তা কোরো না, যখন বিয়ে হবে, ঠিক হয়ে যাবে।
