—আপনি আমরা—আমরা করছেন কেন? দীপ্তবাবুর তো আলাদা সার্কল, আলাদা মন থেকে থাকতে পারে! ধরুন কোনও ড্রাগ—পাচারকারীর সাগরেদ হয়ে গেছেন পাকেচক্রে। এটা কিন্তু আমি একটু ভাবি, তারপর বলি—আপনি বললেন তাই ভাবলাম, ভেবে দেখলাম, খুব হচ্ছে।
—নাহ। ছোটবেলা থেকে বন্ধু, ইস্কুলে, কলেজে, দুজনেই পি ডিভিশন। দুজনের এক চাকরি, ঝগড়া—কাজিয়া এড়িয়ে চলতাম, বোথ অভ আস। এ নিয়ে আমাদের অনেক কথাও হয়েছে। ও আমার সঙ্গে একমত ছিল উই ক্যানট অ্যাফোর্ড টু প্রোটেস্ট, টু কোয়ার্ল। উই ক্যানট অ্যাফোর্ড টু পাচার ড্রাগ।
—ইউনিয়নের দিক থেকে কোনও প্রেশার? আমার এবার হাসি পেয়ে যায়। তেতো হাসি।
—আরে দাদা—ইউনিয়নের সঙ্গে আমাদের কী? ইউনিয়ন প্রেশার দেবে আমাদের মতো চুনোপুঁটিকে? আমরা প্রেশারের মধ্যেই বাস করতাম। বুঝলেন? জলে মাছ যেমন জলের প্রেশারে বাস করে!
—আপনি জয়বাবু ভারী চমৎকার কথা বলেন। এত সুন্দর কথা বলতে আমি অনেকদিন কাউকে শুনিনি। অথচ…অথচ…
—অথচ কী? আমার কিছু হল না?—আমি হো হো করে হাসি।
—দেখুন কানাইদা, আপনার কতটুকু অভিজ্ঞতা আমি জানি না, ধৃষ্টতা মার্জনা করবেন—কিন্তু একটু লাগসই কথা বলার ক্ষমতা, লাগসই কাজ করা ক্ষমতা হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ লোকের আছে। তো কী?
খুব অপ্রস্তুত হয়ে যায় ভদ্রলোকের মুখ।
—ঠিক। ঠিকই বলেছেন জয়বাবু। একটা লাক—ফ্যাক্টর থেকে যায়। না থাকলে…ক্যাঁচাল ভাল লাগে না সন্ধে ঝোঁকে। পাখাটা ওপরে বাঁই বাঁই করে ঘুরছে কিন্তু গরমে গ্যাদগেদে হয়ে যাচ্ছি।
বললাম—কী যেন বলছিলেন সম্ভাবনা নাম্বার ওয়ান…
—হ্যাঁ হ্যাঁ, সরি। সম্ভাবনা নাম্বার টু—লাভ—মানে লভ—অ্যাফেয়ার। ধরুন কারও সঙ্গে লভ হয়েছে, কিন্তু তার একটি আগের লাভার আছে, ধরুন স্বামীই। এই এক্সট্রা ম্যারিটাল বা দাম্পত্য—বহির্ভূত প্রেম বলুন, প্রেম, সম্পর্ক বলুন, সম্পর্ক…এটা এখন রাজনৈতিক খুনেরপরেই প্রায়রিটি পাচ্ছে মোটিভে…বুঝলেন? স্যাটিসটিক্স বলছে।
এতক্ষণ ধৈর্য ধরে শুনছিলাম, এবার ঠান্ডা গলায় বলি—আপনার বন্ধু ওসি বাবুও এই সন্দেহটির কথা বলছিলেন। যট্টুকু জানি বলছি সামন্তবাবু, সরি, মিঃ সামন্ত।
—আরে না না, সামন্তবাবু ইজ অল রাইট। মিস্টার—টিস্টার নয়। বলুন বলুন, কী বলবেন!
—যদি বলি হ্যাঁ। বাস—স্ট্যান্ডের পাশে দোতলা বাড়িটার আড়তদার বরটার রসবতী বউটার সঙ্গে দীপ্তর আশনাই ছিল…বিশ্বাস করবেন?
—কোন বাড়ি? কোন আড়তদার? কোন বউ? যদি কাইন্ডলি একটু ডিটেল বলেন।
—কোন বাড়ি, কোন আড়তদার, কোন বউ জানি না। ওরকম হরদম আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। আপনি যেমন সম্ভাবনার কথা বলছিলেন আমিও তাই বলছিলুম। কিন্তু আপনিই বলুন এই আমার দিকে তাকিয়ে বলুন—গালে ব্রণর গর্থ, চোখে মাছ, বুকে পায়রা, গলায় বেড়াল আর পকেটে বিরাজ করছেন সাক্ষাৎ মা ভবানী। আপনার গোয়েন্দা মনটা কী বলে? এরকম ফেকলু পার্টি দিয়ে এক্সট্রা—দাম্পত্য হয়?
খুব লজ্জা পেয়ে সামন্ত বিড়বিড় করে বলতে লাগল—বড্ড বিনয়ী আপনি জয়বাবু। বড্ড বিনয়ী! ওসব ফেকলু টেকলু…নাঃ—দ্যাট ইজ টু মাচ। আফটার অল ইয়াং ম্যান! যারা এক্সট্রা—দাম্পত্য করে তাদের দেখেছেন? কেউই ময়ূরছাড়া কার্তিকটি নয়। কেউই একেবারে তাগড়াই ভীম পালোয়ান বীরসিংগিও নয়।
—বেশ তো, তাহলে এই থিয়োরিটাই বসের কাছে পেশ করুন। উনি পিঠ চাপড়ে দেবেন।
—আপনি জানেন না জয়বাবু, এভাবে কেসহাজির করলে…আমার চাকরিটা চলে যাবে। যতক্ষণ না আড়তদার বা রসবতী…কোনও সবুদ হাজির করতে না পারি…আমার নিস্তার নেই।
—তাহলে আপনি খুঁজতে থাকুন। আমি উঠি।
—আর একটু টাইম যদি দয়া করে দেন জয়বাবু, নইলে আবার আর একদিন বসতে হবে। কোথায় বাড়ি গিয়ে মাথায় দু’ঘটি জল ঢালবেন, তা না একটা টিকটিকির টিকটিকুনি শোনা। —খুব চিকচিকে চোখে চেয়ে মন্তব্যটি করে সামন্ত, ওর ধারণা একটা দারুণ মজার কথা বলেছে।
আমার যে সত্যিই বাড়ি গিয়ে মাথায় জল ঢালতে ইচ্ছে করছে সেটা ব্যাটা বুঝতে পেরেছে ঠিক।
বলল—ধরুন এ—ও তো হতে পারে জয়বাবু, দীপ্তবাবুর যে বোনটি আছে কোনও মস্তান তার পিছনে লেগেছে, দীপ্তবাবু তাকে ঠান্ডা করে দেবেন বলে শাসিয়েছেন…
আমি এবার হেসে ফেলি—শুনুন সামন্তবাবু, এই মস্তান—টস্তানরা একটু রক্তমাংস চায় বুঝলেন? দীপ্তর বোন শিপ্রাকে একবার দেখে আসুন। তারপর এ বিষয়ে কথা হবে। দ্বিতীয় অধিবেশন।
—প্লিজ প্লিজ দীপ্তবাবু, স্যরি জয়বাবু আর এ—কটু। তাহলে কি আপনি বলছেন সেদিন দীপ্তবাবুর পকেটে বাই চানস অনেকগুলো টাকা ছিল? ট্রেন ডাকাতি?
—শুনুন দাদা, পকেটে একটা মান্থলি আর দু—পাঁচ টাকা ছাড়া আমাদের পকেটে আর কিচ্ছু থাকত না। হাতঘড়িটা ডিজিট্যাল, ফুটপাত থেকে উনপঞ্চাশ টাকায় কেনা।
—সে ক্ষেত্রে এ—ও হতে পারে, দীপ্তবাবু ডিপ্রেশনে ভুগতে ভুগতে, নিজেকে অযুগ্যি ভাবতে ভাবতে, একঘেয়েমির শিকার হতে হতে আত্মবিনাশ…মানে জিঘাংসা একটা…নিজেরই ওপর…?
এইবারে আমি বসে পড়ি। এতক্ষণ পাতি বকবকানির পর এটা তো লোকটা খারাপ বলেনি। সত্যিই তো! নিজেকে ঘেন্না করতে করতে, আরও তিরিশ চল্লিশ কি পঞ্চাশ বছর এইভাবে বেঁচে থাকতে হলে…এ কথা মনে করে…এ তো আমারও কথা। আমারও। সামন্তর মতো একটা পাতি টিকটিকির মাথায় এটা আসতে পারে ভাবিনি তো!
