চারটে—পাঁচটা নাগাদ ইদানীং আমার শরীরটা ক্লান্তিতে ভেঙে আসছে। কেন জানি না। গরম প্রচণ্ড। ঘামে যেন গঙ্গাজল বয়, — বড্ড ঘামছ—মদন শূর বলে—একটু নুন—চিনির শরবত খেয়ে নাও বুঝলে? শরীর থেকে নুনটা বেরিয়ে যায় তো! বিরাট গোল হাঁড়ি লাল ভিজে কাপড়ে জড়িয়ে শরবতঅলারা দাঁড়িয়ে থাকে।
আশেপাশে থাকে লেবু, চিনি লবণ। সব মিলিয়ে বেশ ঠান্ডা—ঠান্ডা গা—জুড়ানো শরবত করে দেয়। খেয়ে সত্যিই একটু আরাম পাই। মদন শূর বলে—কে জানে আবার কলেরা খাচ্ছি, টাইফয়েড খাচ্ছি না হেপাটাইটিস বি খাচ্ছি।
—কেন, ইনজেকশন নেন না? আজকাল হেপটাইটিস বি—র তো ভ্যাকসিন বেরিয়েছে।
—তুমিও যেমন। আমি নেব ভ্যাকসিন? তুমি নিয়েছ? নাও?
—আমি না নিলেও কিছু হবে না। আমি হাসি—আমাদের কিছু হয় না। হবে না…যতক্ষণ না খুন হচ্ছি, অনন্ত আয়ু শূরদা।
—যা বলেছ, মদর শূর তার গেলাসে চুমুক দেয়।
তারপরেই মনে পড়ে যায়—আরে আজ কফি হাউজ যাবার কথা নয়?
গুচ্ছের পয়সা খরচা করে কে আবার বাসে যায়! আর একটু সময় থাকলে হেঁটে মেরে দিতাম। কিন্তু সময় নেই হাতে। ট্রামগুমটি থেকে গুঁতোগুঁতি করে ট্রাম ধরি। রাস্তাময় থিকথিকে পিঁপড়ের মতো দলা পাকিয়ে আছে মানুষজন। কিংবা চিটে গুড়ে আটকে থাকা ভিনভিনে মাছি। কেমন ঘেন্না করে। ঘিনঘিন মতন। এমন নয় যে আমি এর বাইরে, কোনো মহান বিশিষ্ট। নিজেকেও দেখতে পাই ওইসব মাছি—ভিনভিনে ঘিনঘিনে ভিড়ে। বাসে—ট্রামে একটু পা রাখার জন্যে গুঁতোগুঁতি, বাজারে আনাজ—তরকারি একটু কম পয়সায় পাবার জন্যে ঝুলোঝুলি, হাসপাতালে পেচ্ছাবখানার পাশে মেঝেতে একটু জায়গা করে দেওয়ার জন্য ওয়ার্ড মাস্টারকে ধরাধরি, আপিস—ফ্যাক্টরিতে বাদুড়ঝোলা ঝুলতে ঝুলতে প্রাণ হাতে করে লেটে পৌঁছন, গালাগাল খাওয়া, ইউনিয়ন—সর্দারদের গা—জ্বালানি চালবাজি শুনতে শুনতে প্রাণপণ চেষ্টায় ভুরু সোজা করে রাখা…টিউবওয়েল থেকে জল আনতে ঠেলাঠেলি, রাত্রে মশারির মধ্যে চটাস—চটাস…ঘেন্না, খুব ঘেন্না… দীপ্তটা বেঁচে গেছে এক রকম, মরে বেঁচে গেছে।
একটা পা ট্রমের পা—দানিতে। এইভাবে হাওড়া ট্রামগুমটি থেকে মহাত্মা গাঁধী রোড হয়ে কলেজ স্ট্রিট পৌঁছই। মহান ইউনির্ভাসিটি পাড়া, শতবার্ষিকী বিল্ডিং, মহান প্রেসিডেন্সি কলেজ, মহান হিন্দু স্কুল—হেয়ার স্কুল, সংস্কৃত কলেজ, আর মহান মহান সব দোকান, ফুটপাতে, বারান্দার রেলিং—এ, স্টল—এ দোকানে শিক্ষার্থী, বিদ্বান। ইনটেলেকচুয়েলদের পাড়া। মাড়িয়ে চলে যাই। পাঠমন্দির, এঁরা আবার অধ্যাত্মচর্চা করে থাকেন। সমর্পণ করো, প্রশ্নহীন বিশ্বাস, ফেথ…কিছু আশা কোরো না, শুধু ডেকে যাও, কিছু চেও না প্রে, প্রে, প্রে। কফি হাউজের সিঁড়ি দিয়ে উঠতি ইনটেলেকচুয়েলদের সঙ্গে প্রায় ধাক্কাধাক্কি করে উঠতে হয়। ইনটেলেকচুয়েলও শালা একসেস হয়ে যাচ্ছে। ভাবিসনি সবাই ইনটেলেকচুয়েল হবি, যদ্দিন আসতে পারছিস এসে নে, হেসে নে, যেন পৃথিবীটা কিনে নিয়েছিস এমনি করে গলাবাজি কর। তারপর উট। আড়াই পোঁচ কাটা, বাকি গলা দিয়ে কালো রক্ত পড়ছে, পড়ছে, পড়ছে।
—এই যে ভাই এদিকে। খুব নিচু গলা কিন্তু স্পষ্ট শুনতে পেলুম—কানাইলাল সামন্ত। লোকটাকে এমন সাধারণেও সাধারণ দেখতে যে কালই দেখেছি, আজই ভুলে মেরে দিয়েছি। সত্যি কথা বলতে কী সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে মনে হচ্ছিল— লোকটাকে খুঁজে বার করব কী করে? চিনিই তো না। তা সে সমস্যাটা রইল না। কানাইলাল আমাকে খুঁজে নিয়েছে।
গুছিয়ে বসি।
—একটু লেট হয়ে গেল। রুমালে ঘাম মুছতে মুছতে কৈফিয়ত দিই—বড্ড ভিড়।
—আমি বুঝতে পেরেছি জয়বাবু, টাইমিংটা…আমি দুঃখিত। এত ট্রাবল। খিদে পেয়েছে তো খুব?
—ও তেমন কিছু না…।
—আমি অলরেডি চিকেন স্যান্ডউইচ, চিজ—ওমলেট, আর পেঁয়াজ—পকোড়া অর্ডার দিয়েছি। আর কিছু?
আমি হেসে বলি—ইনাফ। আমাদের ইঞ্জিনিয়ার সাব এটা বলেন—’ইনাফ’।
খাবার আসে। লোকটি দুটো আলাদা প্লেটে খাবার সাজায়। আমার দিকে একটা এগিয়ে দেয়—এই যে ভাই—বেয়ারাকে ডাকে—পকোড়াটা কফির সঙ্গে দিও।
—ঠিক আছে স্যার।
—নিন শুরু করুন। নিজে একটা কাঁটা দিয়ে ওমলেট কেটে মুখে পোরে কানাই সামন্ত। আমি একটা স্যান্ডউইচ তুলে নিই, একটু জল খেয়ে নিই। ভীষণ তেষ্টা। তেষ্টাটাই এতক্ষণ জ্বালাচ্ছিল প্রচণ্ড।
বেশ কিছুক্ষণ দুজনেই নিজের নিজের খিদে মেটাতে থাকি। কানাইলাল একবার বোকা—লাজুক চোখে আমার দিকে চেয়ে বলে—কিছু মনে করবেন না জয়বাবু, বড্ড খিদে পেয়েছিল।
—ঠিকাছে, ঠিকাছে—আমি ওঁকে নিশ্চিন্ত করি।
—আমি আসলে অন্ধকারে হাতড়াচ্ছি।
গ্রোপিং ইন দা ডার্ক, বুঝলেন? নিহত মানুষটির চারপাশটা কেমন ছিল, কাদের সঙ্গে মিশত সেইসব…আমি চেয়ে থাকি।
—দেখুন সম্ভাবনা নাম্বার ওয়ান, আপিসে কারও সঙ্গে গণ্ডগোল। ছোটখাটো হলেও বলবেন কিন্তু স্যার। তুচ্ছ বলে গোপন করে যাবেন না, কোনও ছোটখাটো কাজিয়া? তুচ্ছ কারণে লোকে আজকাল খুনোখুনি করছে।
—দেখুন, আমি ওমলেট ছিঁড়ে মুখে দিই—সেই যে বলে না তৃণাদপি তৃণ! আমরা সেই রকমই। তুশ্চু একেবারে। একটা চাকরি পেয়েছি, সেটাই আমাদের যথেষ্ট। না পেলে, না পেতেই পারতাম, জানি না কী করতাম, হাত পেতে ভিক্ষে নিতেও পারতাম না, আবার গুণ্ডা—হুলিগান হয়ে বোমাবাজি…তা—ও আমাদের দ্বারায় হত না।
