মাঝে অবশ্য ফলো—আপ নিউজ বেরিয়েছিল পুলিশ নাকি কিছু সূত্র পেয়েছে। তদন্তের স্বার্থে সেসব গোপন রাখা হচ্ছে। কিন্তু ভরসা রাখতে পারছি না। প্রতিদিন হুদো হুদো লোক মার্ডার হচ্ছে। কাগজ ছবি দিয়ে খবর দিয়ে স্টোরি করেই খালাস। মাঝেমাঝেই দেখি বেশ ভারীভুরি লোকদের হত্যারও ‘এখনও কিনারা হয়নি’, ‘অপরাধী শনাক্ত হয়নি’, ‘তদন্ত চলছে’। এবং অবধারিতভাবে ‘তদন্তের স্বার্থে’ সূত্রগুলো গোপন রাখা হল।
ইদানীং মাসিমা বলতে শুরু করেছেন—ও তদন্ত হলেই বা কী! না হলেই বা কী! আমার যা যাবার তা তো গেলই। কে খুনে শাস্তি পেল কি না পেল তাতে কী—ই বা আসে যায়! ফিরে তো পাব না।
—বলেন কী মাসিমা! একটা রাগ, নিদেনপক্ষে শোধ নেওয়ার প্রশ্নও তো রয়েছে।
শিপ্রা বলে—নেই জয়দা, নেই। আমাদের মতো নিরুপায় লোকের নিরাপদে বেঁচে থাকাটাই তো আশ্চর্য। ধরুন মশার ঝাঁক, মাছি, পিঁপড়ে, আরশোলা, হাজারে হাজারে জন্মাচ্ছে। একটা চাপড়, আঙুল দিয়ে একটু পিষে দিন, চটি দিয়ে এক চাপড়— ব্যস থেঁতলে যাবে, কে তার তদন্ত করে বলুন! এই পিঁপড়েই কি আর এক পিঁপড়ের দিকে ফিরে তাকায়? পিঁপড়েজীবন চলতেই থাকে, চলতেই থাকে…চা খাবেন তো?
—নাহ একটু জল দিও বরং, ভেতরটা তেষ্টায় কাঠ হয়ে আছে। মাসিমা বললেন—দুটো বাতাসাও দিস শিপ্রা।
আসল কথা রাগ, প্রতিশোধস্পৃহা এসবের জন্যে একটু জীবনীশক্তি লাগে। সেটুকুও এদের নেই। আমারই কি আছে? জ্বলে উঠতে পারছি কি? অফিস যাই, নাম সই করি, পরেই দীপ্তর নামটা কাটা রয়েছে একটা লাল কলম দিয়ে, হাজিরা খাতার পাতায় যেন মার্ডার। ফেরবার সময়ে কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগে, ট্রেনে উঠে একটু ফাঁকা ফাঁকা হয়ে গেলেই মনে হয় এই কি সেই কামরা…যেখানে আততায়ীর হাতে প্রাণ দিয়েছিল দীপ্ত? এই কামরাতেই কি আমার বন্ধুর রক্ত লেগে আছে! ও আগে নেমে যেত—শ্রীরামপুর, কাচের মুখে ফিরে তাকাত একবার—আবার কাল, জয়। আবার…
—আবার কাল দীপ্ত…আবার…আমি ফিরে জবাব দিতাম। কতটা জবাব দেবার ইচ্ছে থেকে আর কতটা অভ্যেস…বলা মুশকিল। ঝাঁকে ঝাঁকে লোক নামছে। ঝাঁকে ঝাঁকে লোক উঠছে, একভাবে প্রতিদিন একভাবে—এই যে দাদা…ঝাল মুড়ি, কড়াক কড়াক কড়াক ঝাল মুড়ি….ছুরি নিয়ে নিন সাত ফলা ছুরি…নখ কাটুন, পাঁউরুটি কাটুন, কোকাকোলার বোতল খুলুন চ্যাঁক করে কাগজ ফাঁড়ুন, চিঠি খুলবেন তো দাদা…চিঠি খুলবেন না? … ইমপরট্যান্ট চিঠি—চাকরির চিঠি, বাপের অসুখ, শুভবিবাহ, হোল খুলবেন দাদা, হোল, বাড়িতে ডাকাত এলে স্রেফ পেটটা ফাঁসিয়ে দিন—সাত ফলার মাল্টি পারপাস ছুরি দাদা…চা…চা…লেবু চা…দুধ চা…, দুধ চা, লেবু…চা।
আমার ভেতরেও ইচ্ছেটা আস্তে আস্তে মরে আসছে। মাসিমার মতো বা শিপ্রার মতো করে ভাবছি। কী হবে? ফিরে তো পাব না! তবু রুটিন করে থানায় হাজিরা দিয়ে যাই। কী স্যার, হল কিছু?
ও.সি. কান খোঁচাতে খোঁচাতে বলেন—হলেই হল দীপ্তবাবু, স্যরি জয়বাবু? —এ যে কী ছ্যাঁচড়ার চাকরি! ডিউটি করো, বাড়ি যাও, একটু পেট আলগা করে খেতে বসেছি…বাস কল, এখুনি যেতে হবে। এ—শালার চাকরি তো আর করেননি!
সেদিন ওইরকমই গেছি। ও.সি. পাশের চেয়ারে বসা এক সাদা শার্ট আর কালো জিনস পরা ভদ্রলোককে বললেন—এই যে এঁর কথাই বলছিলাম স্যার। মা ছাড়ল, বোন ছাড়ল, ইনি কিন্তু লেগেই আছেন, এই দীপ্ত চম্পটি, মৃত জয় সমাদ্দারের প্রাণের বন্ধু। স্যরি জয় চম্পটি আর দীপ্ত সমাদ্দার।
বিবরণ শুনে আমি একটু হাসি। শুকনো, বিরস কঠিন হাসি।
—আর জয়বাবু, ইনি আই.বি. থেকে আসছেন। কেসটা হ্যান্ডল করছেন। কানাইলাল সামন্ত।
ভদ্রলোক ইয়াং ম্যানই বলা যেতে পারে। মেরেকেটে পঁয়ত্রিশের এদিক—ওদিক। আমাদের থেকে বড় হলেও তেমন কিছু নয়। মুখটা ভালমানুষ—ভালমানুষ।
—মাফ করবেন, জয়বাবু কেমন কাঁচুমাচু হয়ে বললেন কানাইলাল—আপনাদের মতো ঘনিষ্ঠ ক’জনের সহযোগিতা না পেলে…আই মিন…মুখ দেখাতে পারছি না ডি.আই. জি—র কাছে।
আমি অবাক হয়ে বলি—সহযোগিতা ছেড়ে, আমি তো জোঁকের মতো লেগে আছি দাদা। তা এনারা তো যে তিমিরে সে তিমিরেই। এক বছর পুরো পার হয়ে গেল।
—মার্ডার জয়ন্তী—ও.সি. বললেন।
ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকাই। কোনো লাভ নেই অবশ্য। যেমন অসাড় তেমন অসাড়ই থেকে যাবে এই লোকগুলো।
কানাই সামন্ত বললেন—কোথায় একটু বসা—টসা যায় বলুন তো?
ও.সি. বলেন—ওই তো ওদিকের ঘরটা খুলে দিচ্ছি। জেরা ঘর। চলে যান। এখানেও বসতে পারেন, তবে এখানে নানান কিসিমের লোক তো অনবরত আসছেন, আপনাদের ব্যাঘাত হবে।
—না, না। এখানে একেবারেই নয়।
আমি বললাম—এখানে ছোটখাটো চায়ের দোকান আছে, কাছাকাছি দেখে আমরাও বসতাম…আমি দীপ্ত…
—না, না। ওখানে একেবারেই নয় জয়বাবু। আপনাকে সবাই চেনে, আমার আইডেনটিটি সম্পর্কে একটা কৌতূহল…না, না তাতে আমার অসুবিধে আছে।
—দীপ্তর বাড়িতে যাবেন?
—কে কে আছেন?
—ওর বোন তো চাকরিতে বেরিয়ে গেছে। মা হয়তো ফিরে এসেছেন…
—না, না।
সবেতেই যদি এত না—না তাহলে উনিই বলুন। আমি চুপ করে যাই। ভেবে—চিন্তে উনি বললেন—কলেজ স্ট্রিট কফি হাউসে যাতায়াত আছে?
—নাহ এখন আর…
—আইডিয়াল প্রেস বুঝলেন। আপনি কাল বিকেলে ধরুন সাড়ে পাঁচটা নাগাদ ওখানেই চলে আসুন। অফিসের পর। কী, ঠিক আছে? আমি তিনতলাটাতে অপেক্ষা করব, ওখানে আমাকে বা আপনাকে কেউ চিনবে না।
