সেদিন সন্ধের খবরেই দু—তিনটে চ্যানেলে ছবিটা দেখাল। চোখ বুজে শুয়ে আছে দীপ্ত। গলত্রার কাছটা জমাট রক্ত। মুখটা ইতিমধ্যেই একটু ফুলে গেছে। যেন মৃত্যুর মধ্যেই দীপ্তর স্বাস্থ্য ফিরে গেছে।
ছোট্ট সাদা—কালো টিভিতে ছবিটা দেখাতেই আঁক করে উঠলেন মাসিমা আঁক—দ্বিতীয়বার, তারপর একেবারে অজ্ঞান। শিপ্রা যেন পাথরের মূর্তি, ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রয়েছে। ইতিমধ্যে আমি শিপ্রাকে নিয়ে লোকাল থানাতে ঘুরে এসেছি। ও.সি. আশ্বাস দিয়েছেন—খোঁজখবর করছেন, কতকগুলো রুটিন প্রশ্ন করে নিয়েছিলেন।
—কোনও পার্টি, মানে পলিটিক্যাল পার্টিতে…
—না স্যার, ফ্যাক্টরিতে থাকলে একটা ইউনিয়নে চাঁদা দিতে হয়, ব্যস।
—কোনও শত্রু?
আমার অত দুঃখেও হাসি পেয়ে যায়, দীপ্তর শত্রু? আমার শত্রু? তার চেয়ে যদি জিজ্ঞেস করতেন—কোনও বন্ধু আছে? —তাহলে সহজে উত্তরটা দেওয়া যেত।
—শুনুন স্যার, আমাদের মতো চুনোপুঁটিদের শত্রুও থাকে না মিত্রও থাকে না।
দেশলাইয়ের কাঠি দিয়ে কান খোঁচাচ্ছিলেন অফিসারটি, এমনিতে মুখটা বিকৃত হয়ে ছিল, এখন একেবারে খিঁচিয়ে উঠলেন—যা জিজ্ঞেস করছি তার উত্তর দেবে ছোকরা।
হাসি পায়, এই তো পথে এসেছ, যুবা—টুবা তরুণ—ফরুণ নয়। ছোকরা। স্রেফ ছোকরা। শিপ্রা থাকায় আমি যথেষ্ট সংযত থাকি।
—রাগ করছেন কেন স্যার, আমরা বড্ড উদ্বিগ্ন।
—উদ্বিগ্ন লোকেরাই এখানে আসে। খিঁচোতে হলে পাড়ার এম.এল.এ—কে খিঁচোও, কাউন্সিলরকে খিঁচোও। আমরা তোমাদের কাছে ভোট চাইতে যাব না, বুঝলে হে? ছ্যাঁচড়া একটা চাকরি করি। মাইনে পাই, ডিউটি করি, ডিউটি মাঝরাত্তিরে কলার ধরে টেনে আনে। বুঝলে?
—বুঝেছি, স্যরি স্যার।
শিপ্রার দিকে তাকিয়ে বললেন—লভ অ্যাফেয়ার! পিরিত নাকি? ট্রায়াংগুলার?
শিপ্রা কেঁদে ফেলে। আমি বলি— ও নিরুদ্দিষ্ট ব্যক্তির আপন বোন, বাড়ি ফেরেনি বলে আমাকে ডেকে নিয়ে এসেছে। আর কেউ তো নেই!
এমন করে বলি, যেন আমার অস্তিত্বের জবাবদিহি দিচ্ছি। তাতে লোকটি খুশি হয়।
যাই হোক, দীপ্তর মুখটা দেখব আশঙ্কা করেই টিভি—টা খুলেছিলাম। সন্দেহ ভঞ্জন হয়ে গেল। খাকি প্যান্ট আর ছেয়ে শার্ট হাজারও লোক পরতে পারে, কিন্তু এই খাকি—ছেয়ে নির্ভেজাল আমাদেরই।
জমাদারদের নগদ পাঁচশো টাকা দিয়ে লাশ ছাড়াতে হল। কী অদ্ভুত যুক্তি ওদের। জিনিসপত্তরের দাম হু হু করে বাড়ছে বাবু, দিতে বলছি ভালয় ভালয় দিয়ে দিন।
—আ রে। এটা তো তোদের পাওনা—ই নয়।—জয়ন্তদা বলল?
পাওনা? পাওনার কপালে ঢ্যাঁড়া।
—খুশি হয়ে দ্যান সবাই।
—খুশি হয়ে? ঘনিষ্ঠ আত্মীয়—বন্ধু অপঘাতে মারা গেছে, খুশি হয়ে? বলছিস কী?
—ওই হল। জেবন আজ আছে কাল নেই। জেবনদারদের তো পেটে খেতে হবে। চাঁদা তুলে কোনওক্রমে পাঁচশো জোগাড় হল। কিছুটা আমার পকেট থেকে। ওই গড়ের মাঠ থেকে যে কী করে এত মাল বেরোল সে আমি জানি, আর আমার পকেট জানে।
কাজ—কর্ম হয়ে গেল। শিপ্রার জন্যে চেষ্টা করছি, তবে নেহাত শুকনো কারখানায় ও কী—ই বা চাকরি পেতে পারে। সবে উচ্চচ—মাধ্যমিক পাস করেছে। এখনও কলেজ—টলেজ শুরুই হয়নি।
একটাই ভালো সব মন্দর মধ্যে। পুলিশ হাল ছাড়েনি। খুনিকে ওরা খুঁজ বার করবেই। আমাদেরও মধ্যে কথা হয়—শিপ্রা, আমি, শিবানী, পাড়ার শঙ্কর, জয়ন্তদা—দীপ্ত? দীপ্তকে কে মারবে? কেন মারবে? জয়ন্তদার উদ্যোগ—উৎসাহ বেশি, বললে—পুলিশ করছে পুলিশের মতো। আমরা ইনভেস্টিগেশন চালাব আমাদের মতো। রাজি জয়?
—রাজি।
তবে আমার এটাই আশ্চর্য লাগে, দীপ্তটা যখন জলজ্যান্ত ছিল, তখন ওর সেই জ্যান্ত শরীর—মনের খবরাখবর কেউ রাখত না। এখন, যে মুহূর্তে ছেলেটা মার্ডারের লাশ হয়ে গেল—দরদ, হাহাকার, বিস্ময়, ন্যায়বিচার পাবার রোখ সব যেন প্রতিযোগিতা করে করে বেড়ে যাচ্ছে এদের মধ্যে। লাশ ছাড়ানোর সময়ে বিশ—পঁচিশ টাকা দ্যাখ না দ্যাখ বেরিয়ে এল এ—পকেট ও—পকেট থেকে। যেন লাশটা দেখবার জন্যে সব হন্যে হয়ে আছে। ব্ল্যাকে টিকিট কাটছে। আমার মনে আছে, দগদগে হয়ে মনে আছে। এই মস্তানরা কখনও একটা চা কি সিগারেটের দাম চুকিয়ে দিয়ে, কিংবা পাঁচটা টাকা ধার দিয়েও আমাদের উপকার করেনি। বলতে কী আমাদের ছোট্ট এরিয়ায় দীপ্ত সমাদ্দার স্রেফ খুন হয়ে একটা সেলিব্রিটি হয়ে গেল। শিপ্রা, মাসিমার শোকে ফোলা মুখের ছবি বেরিয়েছে মেলাই কাগজে। কোনোটাতে কোনোটাতে আমিও এক কোণে আছি, মুখ দেখানোর কমম্পিটিশনে প্রায়ই গোহারান হেরে গেছি। পাশের বাড়ির জবা বউদি, ছায়া মাসিমা, পাড়া—মস্তান মিঠুন, কয়লা, প্রতিবেশী শঙ্কর, জয়ন্তদা—সবাইকার মুখ দিব্যি ফোকাসে এসেছে। শোক থমথম ফটো সব। মহিলারা কেউ মাসিমাকে জড়িয়ে আছেন, কেউ শিপ্রাকে বুকে টেনে নিয়েছেন, ফলে শিপ্রার চুল আর হাত ছাড়া কিছুই আসেনি, এসেছে ছায়া না ফায়া মাসিমার পুরো গোল মুণ্ডুখানা। ঠিক সিরিয়ালের মতো পোজ দিয়েছেন। কাঁধে শিপ্রা মুখ—লুকোনো, ছায়া ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে, ক্লোজ—আপ।
হাসিও পায়। কান্নাও পায়। দীপ্তটা মার্ডার হওয়ার আগে যদি জেনে যেত, এত লোকে ওদের ফ্যামিলির বন্ধু, একটু নিশ্চিন্তে মার্ডার হতে পারত।
মাস তিনেক কেটে গেছে। হাঁফ ছাড়া গেছে একটু কেননা, রেল, ভারতীয় রেল স্বয়ং কী মনে করে শিপ্রা সমাদ্দারকে চাকরি দিয়েছে। মাইনে সামান্যই, কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরি তো! মাসিমা একটা রান্নার কাজ ধরেছেন। আর কী—ই বা একজন আটচল্লিশ—উনপঞ্চাশের গরিব বিধবা করতে পারেন। আমি একটু ক্ষীণ আপত্তি করেছিলাম। মাসিমা বললেন—তুমি বললে ভালো লাগল, কিন্তু ওঁর নামে মিথ্যে অপবাদ যখন রটল, যখন উনি দুম করে চলে গেলেন সেই অকূল পাথারে দুটি ছোট ছোট ছেলেমেয়ে নিয়ে আমি একা। ওঁর পাওনা—গণ্ডা পেতে পেতে পাঁচ বছর! তখন কী করেছি আর কী না করেছি জয়! দুঃখ—ধান্দা করেও যেমন করে হোক দিনগুলো চলে যাচ্ছিল। ছেলেমেয়ে বুকে আছে, মস্ত বড় বলভরসা। তা ভগবানের সইল না। কে যে এমন কাজ করল, কেন যে করল!
