চিহ্ন পাওয়া যায়নি তো ছবি দে! বিরক্ত হয়ে বলি। একটা কাজ যদি এরা সুষ্ঠুভাবে করতে পারে! যখন পচে—গলে যাবে তখন দিবি বোধহয়। আরও কতকগুলো খুন, সুইসাইড, ধর্ষণের ঘটনা পড়ি নিয়মমাফিক। তারপর অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাড়ি চলে যাই। কেননা যাবার পথে বাজারটা করে নিয়ে যেতে হবে। বেশি সকাল সকাল গেলে মাছ আগুন, বেশি বেলা করে গেলে বেগুন। অর্থাৎ পচা—পাচকো।
দেখেশুনে গোটা দুই ফলুই মাছ কিনি। কড়া করে ভাজলে কাঁটা টের পাওয়া যায় না। রোজ রোজ মাছের তেল—কাঁটার চচ্চচড়ি কিংবা তেলের বড়া খেতে খেতে মুখ পচে গেছে।
আপিসের দিনে কাক—চান, জলও থাকে না তেমন। আজ একেবারে গলির মোড়ে টিউবওয়েলের তলায় বসে পড়ি, লাল সাবান মেখে জব্বর চান। বাড়ি গিয়ে এখন একটু আয়েশ করব, গায়ে পাউডার ছড়িয়ে একটা ফতুয়া আর লুঙ্গি, তেল—মাখা চুলে যত্ন করে টেরি কাটব। তারপর ফলুই মাছের কড়া করে ভাজা মাখো—মাখো ঝাল দিয়ে মুসুর ডাল আর আলুপোস্ত দিয়ে একথালা ভাত, তারপর বাড়ির একমাত্র তক্তপোশটা দখল করে নিয়ে দিবানিদ্রা। তা সেই দিবানিদ্রারই আয়োজন করছি এমন সময়ে রুখু চুল, শুখো মুখ, লাট খাওয়া সালোয়ার—কামিজ আর হাওয়াই চপ্পল পায়ে শিপ্রা এসে হাজির।
ভাই খুলে দিয়েছিল। এসে বলল—দাদা, কে এসেছে, একজন মেয়ে, বাইরে এসে দেখে যাও!
মেয়ে? আমার কাছে? মেয়ে—টেয়ে আমার কাছে আসবার মতো তো কেউ নেই! আওয়াজ—ফাওয়াজ দিলে অনেক সময়ে মেয়েরা খুব পটে যায়। ওটা এক ধরনের খোসামোদ। ওরা জানে। আমার তোমাকে খাসা লাগছে, বুঝলে মেমসাব, তো সেই পুলকটাই এইভাবে ঘুরিয়ে নাক দেখিয়ে দেখাচ্ছি। এটা বোঝে বলেই রাগতে রাগতে ঠোঁটের কোণে একটু প্রশ্রয়, চলাফেরার একটু ময়ূরী ময়ূরী ভাব ফুটে ওঠে। তো আওয়াজ—ফাওয়াজ দেওয়া তো অনেক দিন ছেড়ে দিয়েছি। এখন আবার রোববারের দুপুরটা মাটি করতে কোন মাধুরী এলেন!
উঠে দাঁড়িয়েছি, শিবানী আমার বড় বোন, শিপ্রাকে নিয়ে ঢুকল।
—আরে শিপ্রা? কী ব্যাপার? হঠাৎ? এখন?
শিপ্রা লালচে চোখ মেলে বলল—দাদা কাল বাড়ি ফেরেনি।
—বাড়ি ফেরেনি? দীপ্ত? সে কী! কালকে ওর ওভারটাইম ছিল অবশ্য, তা কোনও খবরও দেয়নি?
—আপনি…মানে আপনারও তো ওভারটাইম…আমরা ভেবেছিলাম আপনার কাছ থেকে কোনও খবর পাব।
—আমি কালকে ওভারটাইম করিনি শিপ্রা। ছুটি হতেই ডাক্তারখানা, এইসা ভিড় না। মায়ের জ্বর হচ্ছিল…। দ্যাখো, আরও কিছুক্ষণ…হয়তো কোথাও আটকে গেছে। হয় এসে যাবে, নয় খবর দেবে।
—কী করে খবর দেবে? পাশের বাড়ি থেকে আজকাল আর আমাদের মেসেজ দেয় না। আর আটকে কোথায় যেতে পারে! তেমন কোনও জায়গা আছে? বলুন না, তাহলে খোঁজ নিই।
কী করে আর বন্ধুর বোনকে বলি রাত্তিরে আটকে যাওয়ার একটাই জায়গা আছে আমাদের মতো আত্মীয়—বন্ধুহীন ছোকরাদের। হয়তো দীপ্তটা সেখানেই…
—আমার বড্ড ভয় করছে জয়দা, আমার সঙ্গে একটু যাবেন?
ঘড়িতে দেখি দেড়টা। এখনও পর্যন্ত ফিরবে না? যে চুলোতেই যাক!
—মা বড্ড কান্নাকাটি করছে, যদি একটু…যদি পুলিশে খবর দিতে হয়…
—বিকেল অবধি অপেক্ষা করবে না?
—কখনও এরকম হয় না জয়দা। কখনও…এটা কিন্তু একদম শতকরা শতভাগ সত্যি। আমরা একশো ভাগ ভদ্রবাড়ির ছেলে, যেমন করেই হোক বি.এ—টা পাস করেছি। দীপ্তর বাবা ছিলেন লোকাল স্কুলের হেডমাস্টার। শুনেছি ওঁর বিরোধী গ্রুপ ওঁকে কায়দা করতে না পেরে ওঁর বিরুদ্ধে টাকা তছরুপের অভিযোগ আনে। জামিন পাবার আগে দু’দিন হাজতবাস করতে হয় ওঁকে, হাই ব্লাডপ্রেশার ছিলই, স্ট্রোক হয়, এক ঘায়েই শেষ। যখন এ ঘটনা ঘটে, দীপ্ত তখনও স্কুলে। কাজেই যেভাবে লেখাপড়ার কথা ছিল, সেটা হয়ে ওঠেনি, মা—ও খুব শোকগ্রস্ত ছিলেন বহুদিন। তাই বলে ভদ্র হোয়াইট—কলার ছাপটা যাবে কোথায়? আমার বাবা আবার সরকারি আপিসে কলম পেষেন। যতই হোক সরকারি চাকরি। একটা খাতির আছে। সন্তান সংখ্যা একটু কম রাখলে আর একটু স্বচ্ছন্দে থাকতে পারতেন। তবে আমার বোনেরা, ভাই, সব—পড়াশোনা করে, বাজে সঙ্গে মেশে না। একটা নিয়ম—নীতি আছে চালচলনের। যেমন আমরা মা—বাবাকে তুমি করে বললেও অন্যদের কাছে যখন উল্লেখ করি ‘আপনি’ করে বলি। দীপ্ত বলে আমার ‘বাবা মারা গেছেন’ আমি বলি ‘মা ডাকছেন’। খিস্তি—ফিস্তি সব চৌকাঠের বাইরে রেখে বাড়ি ফিরি। বাজার করি, আত্মীয় কারও অসুখ—বিসুখ করলে মা খোঁজ নিতে পাঠান। মুখ মুছে ভিজে বেড়ালটির মতো যাই। বাড়ি ফেরার নির্দিষ্ট সময় আছে। বড়দের সামনে ফুঁকি না। কাজেই শিপ্রা বলতেই পারে—’কখনও এ রকম হয় না জয়দা, কক্ষনো।’ এবং আমিও ওর উদ্বেগ চিন্তা বুঝতেই পারি।
মাকে বলে চটপট জিনসটা গলিয়ে নিই, আর সেই সময়ে হঠাৎ কেন যেন একটা কথা মনে আসে। ‘শিপ্রা—আ’ ঘর থেকে ডেকে জিজ্ঞেস করি—’দীপ্ত কী পরে গিয়েছিল রে কাল?’
—কেন, আপনার মনে নেই?
আছে। কিন্তু রোজ রোজ নিজেদের খাড়া—বড়ি—থোড় জামকাপড় কে—ই বা অত খেয়াল করে। তাই নিশ্চিত হবার জন্যে জিজ্ঞেস করি।
—বলই না।
—খাকি প্যান্ট, আর ছাই—ছাই রঙের শার্ট।
ঠিক, আমারও তাই মনে হচ্ছিল। খাকি প্যান্ট, আর ছাই রঙের শার্ট।
ভেতরটা গুড়গুড় করছে, হঠাৎ কেমন শীত করে কাঁপুনি এল। কাঁপা কাঁপা গলায় শিপ্রাকে বললাম—চল!
