এই দৃশ্যগুলো আমরা লোলুপ চোখে দেখতাম, ঠিক যেমনভাবে কাঙালরা সুখাদ্য দেখে— শিককাবাব, গলদা চিংড়ির কালিয়া, মটন দো পিঁয়াজা। দীপ্ত বিড়বিড় করত—ঠিকই, এর চেয়ে বোধহয় ভালো। আমি বিড়বিড় করতাম—আমাদের চেয়েও খারাপ।
দীপ্ত বলত—টপ করে লাল আলোটা সবুজ হয়ে গেলে আর সব গাড়িগুলো একসঙ্গে ছেড়ে দিলে, এইসব ভিখিরিগুলো তো পিষে যাবে রে জয়!
আমি বলতাম—রাস্তা ভর্তি ধর থকথকে রক্ত…
—রাস্তা ভর্তি ধর থ্যাঁতলানো মড়া…
—কেউ কি বাঁচবে?
—অসম্ভব। কেউ না।
—আর গাড়িগুলো?
—কয়েকটা পড়ি—মরি করে পালিয়ে যাবে ঠিকই, কিন্তু বাকিগুলোতে জনগণ নির্ঘাত আগুন ধরিয়ে দেবে। টেনে নামাবে ড্রাইভারগুলোকে। মার মার বেদম মার।
পুলিশ আসার আগেই ফুটে যাবে।…হাসতাম আমি।
—শুধু ড্রাইভার? মালিকগুলো!
—ঘাবড়াচ্ছিস? বেশির ভাগই নিজেরা ড্রাইভ করে। আর পিছনে হেলান দেনেওয়ালারা? পার পাওয়া অত সোজা নয়! রেমন্ডের সুট, এক্সকালিবারের শার্ট, নাইকির শু…কিস্যু করতে পারবে না। গণ—পিটুনির পর কে বড়সাহেব আর কে ছোটসাহেব ধরতেই পারবি না। পেট্রল ট্যাংকে কেউ ধর একটা বিড়ি ফেলে দিল। ব্যস সব কাঠকয়লা। ছুঁ মন্তর ছুঁ মন্তর ছুঁ মন্তর/ছুঃ।
দুজনে খ্যা খ্যা করে হাসি।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, ওরকম কিছু ঘটে না। ভিখিরিগুলো ম্যাজিক জানে, কিংবা ওদের বডিগুলো হাওয়া দিয়ে তৈরি। এ গাড়ির বনেট, ও গাড়ির বাম্পার, সে গাড়ির বডির পাশ দিয়ে ভানুমতীর খেল দেখাতে দেখাতে ঠিক বেরিয়ে আসে সব। গাড়িগুলোও এঁকেবেঁকে, কায়দা করে পাশ কাটিয়ে আবার অন্য কোনও মোড়ে সিগন্যাল খাবার জন্যে হুশ হয়ে যায়। ঠিক যেমন ম্যালিগন্যান্ট বা অ্যাকসিডেন্ট টপকে বেঁচে থাকে দীপ্ত, বেঁচে থাকি আমি।
দীপ্ত আসে শ্রীরামপুর থেকে, আমি শ্যাওড়াফুলি। নিজেদের মধ্যে আমরা বলি বিশ্রীফুলি, আর শ্যাওড়াপেতনিপুর। কারখানায় যাই, খোঁচা—দাড়ি খাড়া চুল হাজিরাবাবুর খেরোর খাতায় সই করি—দীপ্ত সমাদ্দার, রফিক আসলাম, বিহারীলাল পাণ্ডে, মহম্মদ বেণু, ইসমাইল ফাকির শেখ…।
এই মাসে মান্থলি আমার, পরের মাসে দীপ্তর। একজনই পকেট থেকে একটু বার করি, বলি—আমরা একসঙ্গে দাদা, ডেলি।
এখন চিনে গেছে। কেউ আর ওসব দেখা—টেখার ঝামেলায় যায় না। দীপ্ত বলে ‘পুরনো পাপী’ বুঝলি তো? দাগি হয়ে গেছি।
ট্রেনে কারও হাতে বাংলা কাগজ থাকলে তাক বুঝে ছোঁ মারি। —দাদা ওই মাঝের পাতাটা, পাঁচ নম্বর, পাঁচের পাতা।
বিরক্ত হয়, তো হোক, বয়ে গেল। কাগজ খুলে খুঁজে খুঁজে দেখি—জমজমাট খবরাখবর আছে কি না। যেমন ধরুন নস্কর লেনে দোতলা বাড়িতে গৃহিণী—হত্যা, রক্তগঙ্গা, আলমারি খোলা, উদ্দেশ্য ডাকাতি। কিংবা বেহালা পর্ণশ্রীতে গৃহবধূর আত্মহত্যা, গলায় দড়ি। দড়ির দাগ বসেনি, জিভ ঝোলেনি, সন্দেহ—খুন। মহিলার স্বামী ও তাঁর বান্ধবীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। বোবা—কালা কিশোরী পুলিশব্যারাকে ধর্ষিত, ডাক্তারি পরীক্ষা হচ্ছে। অপরাধী বলে এখনও কাউকে শনাক্ত করা যায়নি। নিরুদ্দিষ্ট ডাক্তারের মৃতদেহ পুকুরধারে, কাদায় মধ্যে পোঁতা, আগের রাতে সহকর্মীর বাড়ি নেমন্তন্ন ছিল। শালবনিতে ডাকিনী সন্দেহে বৃদ্ধাকে খুন। কালাহাণ্ডিতে অপহৃত বালকের ছিন্নমুণ্ড দেহ রঘুনাথপুরে, সন্দেহ নরবলি। প্রকাশ্য রাজপথে গণধর্ষণ ও হত্যা। ফোর্ট উইলিয়ামের পাশে যুবতীর মৃতদেহ, সন্দেহ ধর্ষণ ও হত্যা, বালক—চাকরকে চোরের মার দিয়ে, ঘরে বন্ধ করে রেখে দম্পতি হাওয়া বদলাতে উধাও। প্রোমোটার খুনের চক্রান্তে জড়িত সন্দেহে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনি ফেরার হবার চেষ্টায় ছিলেন।
দীপ্ত আমাকে কনুই দিয়ে ঠেলা মারে—কী রে জয়, খুন—টুন করলেও তো বেশ আপনি—আজ্ঞে পাওয়া যায় রে! খবরের কাগজওয়ালারা তো খুব খাতির করে!
—যা বলেছিস। মহিলার স্বামী ও ‘তাঁর’ বান্ধবীকে গ্রেফতার করা হয়েছে, ‘তিনি’ ফেরার হবার চেষ্টায় ‘ছিলেন’।
আমাদের উল্লাস দেখে পাশের লোক বিরক্ত হয়ে তাকায়। —কাগজটা কি আপনাদের দেখা হয়ে গেছে? —শুকনো গলায় বলে।
—নিশ্চয়, নিশ্চয় সার। চুম্বুক মানে চুম্বকটুকু পড়ে নিয়েছি, নিন, ধনিয়বাদ দাদা।
—ঠিকাছে, ঠিকাছে।
সেই দীপ্তই খুন হয়ে গেল।
খবরটা কাগজেই পড়ি। লোকাল চায়ের দোকানে গিয়ে জম্পেশ করে একটা ডবল—হাফ আর একটা সর্ষের তেলে ভাজা ওমলেট আমার রোববারের মেনু। সঙ্গে কাগজ। কাগজটা হাতবদল হতে থাকে। এই কাগজের লোভেই যে অনেক খদ্দের তার ধরা দুধের চা খেতে আসে চা—ওয়ালা তারক তা বিলক্ষণ জানে। রোববার কাগজে কাগজে ছয়লাপ। লোকে বলে ‘পেপার’। একখানা ‘পেপার’ পেয়ে যাবার কোনও অসুবিধে নেই। প্রথম পাতার বাঁ দিকে লম্বা কলমটায় দেখি ‘ব্যান্ডেল লোকালে যুবা খুন’। আবার ‘যুবা’! আমি শব্দ করে হাসি। যুবাই বটে, যুবা কি এখনও আছে না কি? এখন সব ছেলে—ছোকরা ছ্যামরা মদ্দ, আধবুড়ো, সিকিবুড়ো। ‘যুব্বা!’ তা তিনি কেমন খুন হয়েছেন দেখি। যদি নতুন কিছু হয়।
লাস্ট ট্রেন সাইডিংয়ে নিয়ে যাবার সময়ে কিছু কিছু কর্মী লক্ষ করেন একটি কামরা থেকে লালজল বেরিয়ে আছে। বড্ডই লাল, জমাট মতো, তখন কামরায় উঠে দেখা যায় এক যুবা, পরনে ছাই রঙের শার্ট এবং খাকি প্যান্ট, গলার নলি ও কবজির শির কেটে দেওয়া হয়েছে কোনও সূক্ষ্মধার অস্ত্র দিয়ে। অস্ত্রটি ঘটনাস্থলে পাওয়া গেলে এটি আত্মহত্যার কেস বলে সাবুদ হত। কিন্তু অস্ত্রটি পাওয়া যায়নি। কবজি, গলা কেটে অস্ত্রটা জানলা গলিয়ে ফেলে দেবার সম্ভাবনা অবশ্য উড়িয়ে দিচ্ছে না পুলিশ। বডি পোস্টমর্টেমে যাচ্ছে। আশ্চর্য, যুবাটির পকেটে কিছুই পাওয়া যায়নি, টিকিট—দৈনিক বা মান্থলি, কোনও টাকাপয়সা বা মানিব্যাগ, হাতে ঘড়ি নেই। কোনো ভাবেই শনাক্তকরণের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। দেখে মনে হচ্ছে না, কিন্তু সে কি কোনও কারণে অনেক টাকা নিয়ে যাচ্ছিল?
