‘তুমি দার্জিলিং ফ্যাক্টরিতে গিয়েছিলে তো? কাছাকাছি কোনো পাহাড়ের খাদে বেচারি মেয়েটার দেহ পড়ে রয়েছে নিশ্চয়ই। নাও, লেখো। তোমার মতো কীটের বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই! আর চালাকি করার চেষ্টা কোরো না— আমি কিন্তু রিভলভার চালাতে জানি, তোমার পায়ে গুলি করে পুলিশকে বলব যে স্বাগতার ব্যাপারটা বলতে তুমি আমাকেও খুন করার চেষ্টা করছিলে তাই আত্মরক্ষার জন্যে আমাকে গুলি চালাতেই হয়েছে!’
আমি কোথায় গন্ডগোলটা করে ফেললাম সেটা ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। হয়তো শ্রেয়াকে আমি তেমন সময় দিইনি বলে ওর মনে আমার প্রতি ক্ষোভ জন্মেছিল। নাকি ওর বাবার তৈরি কোম্পানিকে খানিক অসৎ উপায়ে অনেক বেশি বড় করে তুলছিলাম বলে— কী জানি! পেনটা হাতে নিয়ে একটা সুইসাইড নোট লিখে ফেললাম। শ্রেয়া কঠিন মুখে রিভলভারটা আমার কপালে ঠেকাল, ঠিক ডানহাতি মানুষ আত্মহত্যা করলে যেখানে গুলি লাগা উচিত সেখানে! তারপর…।
.
পুলিশকে ফোন করার আগে শ্রেয়া সরকার সেন আর একটা ফোন করল, ‘অনিল চাচা, তোমার পুলিশের অভিনয় ফাটাফাটি হয়েছিল। তুমি আর বাবলু বাড়তি বকশিশ পাবে। তবে কিছুদিন এদিকটায় এসো না, পুলিশের কারবার চলবে তো। আমি সময় সুযোগ মতন তোমার সঙ্গে দেখা করে নেব।
ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে বার করা মেয়েলি জুতোর ওই একপাটি নিজের জুতোর র্যাকে অন্য পাটিটার পাশে রেখে দিল শ্রেয়া। ভাগ্যিস শৌভিক মেয়েদের জুতো-টুতোর প্রতি নজর দিত না! হ্যাংগারে আসলে তো কিছুই পড়ে ছিল না, তাই এই জুয়াটা খেলতে হল। একটা প্রচ্ছন্ন হাসি শ্রেয়ার ঠোঁটে খেলেই মিলিয়ে গেল কি?
মর্তুকাম – বাণী বসু
দীপ্তটা মারা গেল। আমার ঘনিষ্ঠতম বন্ধু দীপ্ত, আজকাল যাকে বলছে ‘ভালো বন্ধু’। কোনো অসুখে—বিসুখে স্বাভাবিক মৃত্যু নয়, এমনকী দুর্ঘটনাও নয়। মার্ডার। কোনো মৃত্যুরই কোনো সান্ত্বনা নেই। কিন্তু মাত্র বছর দুয়েক আগেই দীপ্তর ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়া হয়েছিল। এমনও হয়েছে ছ—সাত রাত ওর জন্যে নীলরতনে ঠায় বসে আছি। মশার কামড় খাচ্ছি আর চমকে চমকে উঠছি। এই বুঝি কোনও খারাপ খবর এল…এই বুঝি…। এক এক সময় এমন হয় না? বাড়িসুদ্ধু আপনজন বন্ধুবান্ধব ভেতরে ভেতরে কাঁটা হতে হতে মড়াকান্না কাঁদতে তৈরি হয়ে যায়? তখন যদি দীপ্তটা সত্যি—সত্যি মারা যেত, বোধহয় তৈরি ছিলাম বলেই মেনে নিতাম। বুকের ভেতরটা কিছুদনি হা—হা করত, চায়ের দোকান, ধাবা, মাঠ—ময়দান যেসব জায়গায় দুজনে কত ঘুরেছি সেখানে স্মৃতি হাঁ করে থাকত। ওর বাড়িতে থেকে থেকে খোঁজখবর নিতাম—মাসিমা কেমন আছেন? কোনও দরকার হলে নিশ্চয়ই বলবেন…ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু দীপ্ত দিব্যি ফিরে এল। সেই হালকা—পলকা দীপ্ত, কথায় কথায় হঠাৎ চুপ করে যাওয়া, নিচু গলায় খিস্তি।
দুর্ঘটনায় মারা যাওয়াও ওর অসম্ভব ছিল না। কেননা শ্যামবাজার—শ্রীরামপুরে বাসে ও বালি থেকে উঠত, একদিন জি.টি. রোডে সেটা একটা লজঝড়ে বাসের সঙ্গে লেগে যায়। ঘ্যাচাং। ডান সাইডে যারা ছিল তাদের মধ্যে দু—তিনজন স্পট ডেড, বেশ কয়েকজন মারাত্মক জখম। দীপ্ত বসেছিল ডান দিকেই, শেষ সিটে। তেমন কিছুই হয়নি। একটু ফার্স্ট এড দিয়ে ছেড়ে দিল। সবাই বলল— লগনচাঁদা ছেলে, মঙ্গল খুব স্ট্রং, তা নয়তো আগে জখম, পাশে জখম, ওইভাবে বেঁচে যায়? ভাবাই যায় না।
আজকাল লোকে বাসে—মিনিবাসে ওঠে প্রাণ হাতে করেই। ভালো করে চালাতে না শিখেই লাইসেন্স পেয়ে যাচ্ছে সব, হাত দুরস্ত হতে না—হতেই বাস—ট্রাকের স্টিয়ারিং ধরছে। তা তখন যদি মারা যেত, বিরাট একটা কান্নাকাটি, দৌড়াদৌড়ি, বুক চাপড়ে ভাগ্যকে অভিসম্পাত, মর্গ… এইভাবে শেষ হয়ে যেত ব্যাপারটা। বাস কোম্পানি থেকে ফ্যামিলিকে ক্ষতিপূরণ দিত কিংবা দিত না। ফ্যাক্টরিতে ওর বোনকে একটা চাকরি পাওয়াবার জন্যে তদবির করতাম। মেয়েটা সবে সাবালক হয়েছে, কোনও ট্রেনিং নেই বলে ওরা গাঁইগুঁই করত। আমরা লড়ে যেতাম। কিন্তু মঙ্গল স্ট্রং। বেঁচে গেল। সবাই বলল—ছেলেটা দীর্ঘায়ু হবে। আমার মনে আছে, দীপ্ত বলেছিল — দীর্ঘায়ু না দ্রিঘাংচু? মাঝেমাঝেই মাসিমাকে বলত—অত হাঁকপাক করো কেন বলো তো? দেখলে তো শালা ম্যালিগন্যান্ট আমার কিস্যু করতে পারল না। অ্যাকসিডেন্ট? সিনে নেই। কী রে জয়, কী বুঝছিস গুরু?
মুখে কিছু আটকায় না? মাসিমা রাগ করে বলতেন—ওভাবে বলতে নেই। গ্রহ কুপিত হন।
মাসিমার সামনে এই। আমাদের সামনে আবার দীপ্ত অন্য মানুষ। তখন বলত—কী করা যায় রে জয়, কিছু বল?
—কীসের কী?
—দেখছিস তো চারদিকে কী অবস্থা একেবারে নো—হোয়্যার হয়ে আছি। এক মুহূর্ত ভাল্লাগছে না। শালারা বাবাটাকে ফুটিয়ে দিলে। মাথার ওপরে কেউ থাকার সোয়াস্তি কী জীবনে জানলাম না। মুখ—শুকনো বিধবা মা, বোনটা কালো, কত দূর পড়াতে পারব, পারলেও কোনও হিল্লে হবে কি না…তুই কিছু ভাবিস? তোর অবশ্য বাপ আছে।
—তেমনি দুটো বোন, একটা ভাই এখনও স্কুলে। তবে কী জানিস, আমরা যা হোক করে চালিয়ে নিচ্ছি। চারপাশে লোক দ্যাখ—ধুঁকছে। তাদের তুলনায়…
এটুকুই আমাদের সান্ত্বনা। ধরুন চৌরঙ্গি এলাকায় সার সার গাড়ি দাঁড়িয়ে গেছে। জ্যাম—জমাট একেবারে। আমরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছি। সড়সড় সড়সড় করে কিছু ভিখিরি এঁকেবেঁকে গাড়িগুলোর মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ায়। কার কোলে রিকেটি ছেলে, কার একটা হাত কাঠের মতো, কার গাল এমন ভাঙা, চোখ এমন গর্তে ঢোকা যে মনে হয় এই বুঝি শ্মশান থেকে উঠে এল। বাচ্চচা ছেলে, করুণ মুখে পয়সা চাইছে, একটা গাড়ির কাচ নেমে গেল, কোনও মহিলা কিছু দিলেন। গাড়ি চলে যেতেই ছেলেটা ষাট—বছুরে বুড়োর মতো মুখ করে ভেঙালে, ভিক্ষে পছন্দ হয়নি।
