আমি ইচ্ছে করে এদিক-ওদিক চারিদিকে হাত দিয়ে বেড়াচ্ছিলাম, যাতে পরে ফিঙ্গার প্রিন্টিং করে আমার হাতের ছাপ পেলে আমি আজ এখানে আসার ব্যাপারটা ব্যবহার করতে পারি!
শ্রেয়াও এদিক-ওদিক ঘোরাফেরা করছিল। হঠাৎ কী মনে হল ইন্সপেক্টরকে বলল,’মিস্টার শর্মা, আমার একটু কাজ আছে, আমাকে যেতে হবে। এই আমার কার্ড, আমার মোবাইল নম্বর ওতে আছে। কিছু দরকার হলে ফোন করবেন, কেমন?’ বলে সে আমাকে ফাঁসিয়ে দিয়ে কেটে পড়ল।
সারা বিকেল ধরে মিস্টার শর্মা আমাকে এটা-সেটা জিজ্ঞেস করেই চললেন। আমি যথাসম্ভব ঠান্ডা মাথায় সব প্রশ্নের উত্তর দিলাম। এই ফাঁকে আমি দেখতে চেষ্টা করছিলাম যে, স্বাগতার ডায়েরি জাতীয় কিছু রাখার অভ্যাস ছিল নাকি— কিন্তু সেরকম কিছু চোখে পড়ল না।
.
বাড়ি যখন ফিরলাম তখন রাত এগারোটা। তখনও শ্রেয়া ফেরেনি দেখে একটু অবাক লাগল। যাই হোক, মিস্টার শর্মা স্বাগতার বাড়িতে কিছু খুঁজে পাননি, তাই কাল অফিসে আসবেন বলেছেন। সেই কারণে আমি একটু আগে অফিসে গিয়ে স্বাগতার ডেস্ক ড্রয়ার সব দেখে এসেছি, গ্লাভস পরতে ভুলিনি অবশ্য। কিছু নেই সেখানেও। আশ্চর্য, মেয়েটার দরকারি কাগজ, ঠিকানার বই কিছুই পাওয়া যায়নি। অবশ্য সেইসব হ্যান্ডব্যাগেও থাকতে পারে, সেটা তো আমি টেক কেয়ার করেছি। খুব খিদে পেয়েছিল। ফ্রিজ থেকে খাবার বার করে খেয়ে নিলাম।
বারোটা নাগাদ শ্রেয়া বাড়ি ফিরল। উদভ্রান্তের মতন চেহারা তার। ওর চোখের চাহনি দেখে আমার বুকটা ধক করে উঠল। আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী হয়েছে বলো তো? কোথায় গিয়েছিলে? এত রাত হল কেন?’
শ্রেয়া ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে আমার সামনের সোফাটায় বসল। ব্যাগ থেকে কী একটা বার করে আমাকে দেখিয়ে বলল, ‘এটা তোমার হেলিকপ্টার রাখার গুদাম থেকে পেয়েছি!’
আমি তাকিয়ে দেখলাম, এক পাটি মেয়েদের চটি! আমার মুখে ভূত দেখার মতন ভাব দেখে শ্রেয়া বলল, ‘স্বাগতা কোথায়? দেখো, মিথ্যে কথা বলে লাভ নেই। আমি জানি ওর কিছু একটা হয়েছে।’
‘কী করে জানো?’ আমি মরিয়া হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
শ্রেয়া কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল, তারপর বলল, ‘সুইসাইড বম্বার বোঝো?’
আমি কিছু বলছি না দেখে শ্রেয়া বলল, ‘স্বাগতা ছিল সুইসাইড বম্বারদের মতন একজন— যারা নিজেদের প্রাণের তোয়াক্কা না করে একটা উদ্দেশ্যের জন্যে প্রাণ দিতে রাজি হয়!’
আমার মাথা ভোঁ ভোঁ করছিল। শ্রেয়া বলে কী!
‘মিসেস জোসেফের সাহায্যে স্বাগতাকে তোমার অফিসে আমিই ঢুকিয়েছিলাম। স্বাগতা আমারই চ্যারিটির অনাথ আশ্রমে বড় হওয়া একটি মেয়ে। বাবার কোম্পানি হাতে পেয়ে তুমি যে নানান দু-নম্বরি পথে সেটাকে বাড়াচ্ছিলে, মিসেস জোসেফ সেসবই আমাকে বলেছিলেন। কিন্তু ওনার বয়স হয়েছিল। ঝুঁকি নিয়ে প্রমাণ জোগাড় করার ইচ্ছে বা ক্ষমতা কোনোটাই ওনার ছিল না, তাই আমরা দুজনে মিলে স্বাগতাকে সব কথা জানাই। ও রাজি হতে ওকে কোচ করি আমরা দুজনে। ওর কাজ সহজ হবে না আমরা জানতাম। ঝুঁকিও প্রচুর—সেটাও ওকে বলেছিলাম। কিন্তু ওই বয়সে যা হয়, ওর ভয়ডর তেমন ছিল না।’
শ্রেয়ার কথায় আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল— মহিলা বলে কী! তার মানে আমি বেমালুম না বুঝে সুঝে ওদের ফাঁদে পা দিয়েছিলাম।
শ্রেয়া বলে চলল, ‘তাড়াতাড়ি কাজ সারতে গিয়ে ও তোমার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়— হ্যাঁ, আমি সবই জানি। তোমাকে ঘেন্না করি আমি। ওর ওই বাড়ি, স্কুটি সব আমিই কিনে দিয়েছিলাম। ও অনেক প্রমাণও জোগাড় করে ফেলেছিল। তাই আমি ওকে বলেছিলাম ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নিতে, কিন্তু ও বলেছিল যে, স্বার্থের জন্যে তুমি যে মানুষ খুনও করতে পারো সেটাও ও প্রমাণ করে ছাড়বে। প্রেগনেন্সির ব্যাপারটা সম্পূর্ণ ওর বানানো। ও অনাথ আশ্রমে বড় হওয়া মেয়ে— মা-বাবা ছাড়া বড় হওয়া যে কত কষ্টকর সেটা ও জানত। ও কোনোদিনই অবাঞ্ছিত কোনো বাচ্চার জন্ম দিত না। আসলে তুমি যে এত তাড়াতাড়ি কিছু একটা করে ফেলবে সেটা আমরা আন্দাজ করতে পারিনি। আমাদেরই ভুল। প্রতিপক্ষকে তার প্রাপ্য গুরুত্ব দিইনি আমরা! স্বাগতা তোমার ফন্দি ধরতে পারেনি, ও ভেবেছিল সত্যি বুঝি কাজ আছে সাইটে।’ শ্রেয়া থামল, ব্যাগ থেকে একটা জলের বোতল বার করে ঢকঢক করে খানিকটা জল খেল। বোতলটা ব্যাগে রেখে ও যে জিনিসটা বার করল সেটা ওর হাতে দেখে আমি বেশ চমকে উঠলাম— একটা রিভলভার!
‘তোমাকে আমি সম্মানের সঙ্গে মরার একটা সুযোগ দিচ্ছি— এক্ষুনি একটা সুইসাইড নোট লেখো যে, তোমার মৃত্যুর জন্যে কেউ দায়ী নয়, আর তারপর এই রিভলভারটা দিয়ে গুলি করে আমি তোমাকে মুক্তি দেব। স্বাগতার কথা কারও মনে থাকবে না। আমি বলে দেব, ও চাকরি নিয়ে অন্য শহরে চলে গেছে। সাধারণ লোকেরা অতশত মনে রাখে না। কী? রাজি তো? নাহলে এক্ষুনি ইন্সপেক্টর শর্মাকে ফোন করে সব বলে দেব— আর চটির প্রমাণ তো আছেই! কোম্পানিতে অসৎ কারবার ধরে ফেলার জন্যে স্বাগতাকে খুন করার অভিযোগে তোমার দশ বছরের জেল তো হবেই। আর যা ঢিঢি পড়বে নামে সেটা না হয় আর নাই বা বললাম!’
শ্রেয়াকে আমি নিরীহ মেয়ে বলেই জানতাম, আর ওর পেটে পেটে কিনা এত বুদ্ধি!
