পথে হঠাৎ মনে হল, আমি একটা নয়, দুটো খুন করলাম! যদিও ওই রক্তমাংসের পিণ্ডের প্রতি আমার কোনো অনুভূতিই নেই।
ফ্যাক্টরি থেকে কিছুটা দূরে জঙ্গলের মধ্যে হেলিকপ্টার নামিয়ে স্বাগতা, ওর হাতব্যাগ, স্কুটি সব কিছু একটা গভীর খাদে ফেলে দিলাম। অতল গভীরে সব মিলিয়ে গেল। একবার মনে হল, স্বাগতা কি ওর কোনো আত্মীয় বা বন্ধুকে আমার কথা বলেছিল? ওর মা-বাবা নেই সেটা জানতাম, আর ও ছিল একমাত্র সন্তান…যাক, ওসব ভেবে এখন লাভ নেই।
ফ্যাক্টরি পরিদর্শন শেষ করে সব কিছু সেরে যখন বাড়ি ঢুকলাম তখন অনেক রাত। শ্রেয়া ঘুমিয়ে পড়েছে। আমিও ঘুমিয়ে পড়লাম। মনটা বেশ হালকা লাগছিল।
.
পরদিন অফিসের কাজকর্ম দিব্যি চলছিল, এমন সময়, বিকেল পাঁচটার সময়, শ্রেয়া আমার অফিসে এসে হাজির হল। আমি একটু চমকেই উঠলাম— ও তো কোনোদিন এইভাবে অফিসে আসে না।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী ব্যাপার, তুমি এখানে?’
‘স্বাগতা বলেছিল অনাথ-আশ্রমের বাচ্চাদের দেখতে আজকে ও আমার সঙ্গে যাবে। ও বলেছিল, ও ভলেন্টিয়ারি করবে, তা কোথায় সে?’
আমি আমতা আমতা করে বললাম, ‘স্বাগতা তো দিন তিনেক হল আসছে না— জানি না শরীর খারাপ হয়েছে হয়তো।’
‘সে কী! একটা মেয়ে তিনদিন ধরে কাজে আসছে না আর তোমরা ওর কোনো খোঁজখবর নাওনি! কেমন অফিসের কলিগ তোমরা! দেখি, আমার কাছে ওর মোবাইল নম্বরটা আছে, আমিই কল করি?,’ বলে ডায়াল করতে শুরু করে দিল।
স্বাগতার মোবাইল ফোন তো পাহাড়ের অতল খাদে, তাই কারো তোলার কথা নয়। শ্রেয়া কিছুক্ষণ চেষ্টা করে বলল, ‘হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে। যাই ওর বাড়িতে একবার ঢুঁ মেরে আসি।’
ওর বাড়িতে শ্রেয়া একবার গিয়েছিল কী একটা পুজোতে। আমি রাগ চাপতে চাপতে বললাম, ‘যাও, তবে যদি কারো শরীর খারাপ থাকে তাকে ডিস্টার্ব করা কি ঠিক?’
শ্রেয়া অকাট্য যুক্তি দিয়ে বলল, ‘যদি বেশি শরীর খারাপ হয়ে অজ্ঞান-টজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকে তাহলে? একা একা থাকে মেয়েটা!’
শ্রেয়া চলে গেল। আমি গোঁজ হয়ে বসে রইলাম। শেষে কিনা আমারই বউ পরোপকার করার ঠেলায় আমাকে ধরিয়ে দেবে? যাক, বেশি ভেবে লাভ নেই, এই ভেবেই বসে রইলাম।
শ্রেয়ার ফোন এল ঘণ্টা দুয়েক বাদে। বলল, ‘স্বাগতা মনে হয় বাড়িতে নেই। পাশের বাড়ির মহিলাকে জিজ্ঞেস করলাম, উনিও কিছু জানেন না। আমরা দুজনে দরজা ধাক্কা দিলাম, কিন্তু কেউ খুলছে না দেখে আমি পুলিশে খবর দিয়েছি।’
‘সে কী!’ আমি আঁতকে উঠলাম, ‘ও যদি কয়েক দিনের জন্যে কোথাও গিয়ে থাকে তাহলে? ফিরে এসে দেখবে দরজা ভাঙা!’
‘কী জানি বাবা, আমার ব্যাপারটা ভালো লাগছে না। ও যদি অন্য কোথাও যেত তাহলে তো তোমাকে বলে যেত!”
‘কিন্তু তা বলে এখুনি পুলিশ!’ ঘটনার গতিপ্রবাহ দ্রুত আমার আয়ত্তের বাইরে চলে যাচ্ছিল।
‘তুমিও এখানে চলে এসো, কারণ, পুলিশ এলে ওদের অনেক প্রশ্ন থাকবে— আর আমি একা ওদের সামলাতে পারব না!’
অগত্যা আমি রোজকার মতো অফিস থেকে স্বাগতার বাড়ির দিকে রওনা হলাম। আগেই বলেছি, আমি বিশেষ সাবধানী, স্বাগতার পাড়াতে আমি ওই প্রথম দিন ছাড়া কোনোদিন গাড়ি নিয়ে ঢুকিনি। গাড়ি অন্য পাড়ায় রেখে হেঁটে আসতাম— তা-ও অন্ধকার নামার পর। পাড়ার কেউ যাতে আমাকে না দেখতে পায় সেই চেষ্টাই করতাম— টুপিও থাকত মাথায়। তাই গাড়ি নিয়ে স্বাগতার পাড়ায় ঢুকতে আমার ভয় ছিল না। আমার গাড়ি এখানে কেউ চিনতে পারবে না, সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত।
স্বাগতার বাড়িতে যখন পৌঁছলাম তখন পুলিশ এসেছে। একজন বৃদ্ধ ইন্সপেকটর, যাকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি নিতান্ত অনিচ্ছার সঙ্গে এসেছেন। তাঁর মুখে অসংখ্য বলিরেখা আর বেশ ঝুলো একজোড়া পাকা গোঁফ। সঙ্গে একটা ছোকরা হাবিলদার। দরজার তালা ভাঙা হয়ে গেছে।
আমাকে দেখে বুড়ো ইন্সপেক্টার বলে উঠলেন, ‘আপনি কে?’
‘আমার নাম শৌভিক সেন। আমি স্বাগতার বস। আমার মিসেসই আপনাদের ডেকে পাঠিয়েছে। আমি বারবার বলেছিলাম কয়েকটা দিন অপেক্ষা করতে— হয়তো কোনো আত্মীয় বা বন্ধুর বাড়ি গেছে।’
‘আগেও কি এইরকম ভ্যানিশ হয়েছেন স্বাগতাদেবী?’ লোকটা বুড়ো হলে কী হবে, চোখের দৃষ্টি অসম্ভব তীক্ষ্ন। ‘না’ বলতে বাধ্য হলাম আমি।
‘দেখুন স্যার, আমার মনে হয় আরও কয়েকটা দিন দেখে তারপর…’
আমার মুখ থেকে কথা প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে উনি বললেন, ‘আমার নাম অনিল শর্মা— আপনি আমাকে মিস্টার শর্মা বলে ডাকতে পারেন, আর এই হল অরিজিৎ কর্মকার, বাচ্চা ছেলে, নতুন কাজ শিখছে। ও, কী যেন বলছিলেন আপনি… ও হ্যাঁ, কিছুদিন অপেক্ষা করতে? সে না হয় করা যাবে। আমাদের সব কিছুতে এমনিতেই অনেক সময় লেগে যায়। ওই যে হিন্দি ফিলিমে দেখেন না সব কিছু হয়ে যাওয়ার পর পুলিশ আসে— সেইরকম আর কী! তা স্বাগতা ম্যাডাম কি আপনাকে কিছু বলেছিলেন কোথায় যাচ্ছেন বা কিছু?’
‘না, ও তিনদিন ধরে অফিসে আসছে না— আমাকে কিছুই বলেনি।’
‘সিঙ্কে দুধের গেলাস নামানো রয়েছে, খুব বেশি পুরনো তো মনে হচ্ছে না। হুঁ! আচ্ছা, উনি অফিসে যাতায়াত করতেন কীভাবে?’
‘ঠিক বলতে পারব না, বাসে-ট্রামে যেত মনে হয়। ও হ্যাঁ, একটা স্কুটিও ছিল ওর।’
‘ও আচ্ছা, সেটাকেও তো দেখছি না,’ বলে শর্মা চারিদিক দেখে বেড়াতে লাগলেন।
