ও আমাকে আশ্বস্ত করেছিল যে, ও বার্থকন্ট্রোল পিলস নিচ্ছে এবং আমি সে-ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকতে পারি। আমিও তাই ওসব নিয়ে ভাবিনি। সেই ভ্যালেনটাইন্স ডে-র ছ’মাস পরে একদিন বিকেলে স্বাগতার বাড়ি গিয়ে দেখি ও বেশ লাল টুকটুকে একটা শাড়ি পরেছে, সঙ্গে গয়নাও পরেছে। এমনিতে বেশিরভাগ সময় ও সালোয়ার কামিজ বা জিন্স, অথবা স্কার্ট আর টপ পরে থাকে। খাবার ঘরে গিয়ে দেখি আমার পছন্দের সব রান্নাও করেছে। বড় বড় মোমবাতি জ্বালিয়ে মৃদু গানের শব্দে খেতে বসার সময় আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী ব্যাপার, আজ এত আয়োজন? কারও জন্মদিন নাকি?’ আমার নয় সেটা অবশ্য জানতাম।
স্বাগতা অল্প হেসে বলল, ‘না, না, আমার জন্মদিন তো জানুয়ারি মাসে, কবে হয়ে গেছে! আবার আসছে বছর হবে।’
‘তাহলে এত সব?’
‘একটা ভালো খবর আছে।’
‘কী খবর?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।
‘খেয়ে নাও তারপর বলছি।’
‘তুমি এখনও চিনলে না আমায়? যতক্ষণ না তুমি বলবে ততক্ষণ আমি খেতেই পারব না!’
স্বাগতা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘আই অ্যাম প্রেগনেন্ট!’
আমি তড়াক করে উঠে দাঁড়ালাম। পিছনের চেয়ারটা উলটে পড়ে গেল। রাগে আমার সারা শরীর তখন কাঁপছে।
‘তুমি বলেছিলে তুমি প্রিকশান নিচ্ছ!’
‘যখন বলেছিলাম তখন নিচ্ছিলাম, তারপর বন্ধ করে দিয়েছিলাম!’
‘হাউ ডেয়ার ইউ! এনিওয়ে, তোমাকে অ্যাবর্সন করাতে হবে।’
‘না!’
স্বাগতা ওই একটা কথা বলে নিজের ‘ডেথ ওয়ারান্টে’ সই করে ফেলল।
আমি আর খেলাম না। বাড়ি চলে এলাম। সারাটা পথ ভাবলাম, কী করব। শ্রেয়াকে ডিভোর্স করে স্বাগতাকে বিয়ে করার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। এত কিছু করে যে বাড়ি আর কোম্পানি আমার হাতে এসেছে তার একচুলও আমি ছাড়তে রাজি নই। বাড়িটা তো ইনফ্যাক্ট শ্রেয়ার নামে, আর ও কোনো চাকরি করে না বলে ওকে যে পরিমাণ খোরপোশ দিতে হবে সেটা ভাবলেই আমার মুখটা বিস্বাদ হয়ে উঠছিল। শুধু তাই নয়, যে স্ক্যানডালটা হবে সেটা কোম্পানির পক্ষে মারাত্মক ক্ষতিকারক হবে। শৌভিক সেন তার সেক্রেটারির সঙ্গে ফুর্তি করে বেড়িয়েছে— কাগজে ওইসবো বেরলে আমার মানসম্মান ধুলোয় মিশে যাবে! আর সবচেয়ে বড় কথা, স্বাগতার সঙ্গে বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে সংসার করার কোনো বাসনাই আমার নেই।
পরদিন স্বাগতা অফিসে এল না। টেনশানে আমি সারাদিন কোনো কাজ করতে পারলাম না। তখনই ঠিক করে ফেললাম— নাহ, এভাবে চলতে পারে না! ওকে আরেকবার বুঝিয়ে দেখব, না বুঝলে অন্য ব্যবস্থা নিতে হবে, কারণ যত দিন যাবে লোক জানাজানি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
স্বাগতাকে ফোন করে ওর খবর নিলাম। ও বলল, ওর শরীরটা ভালো লাগছিল না তাই ও অফিসে আসেনি।
বিকেলে ওর বাড়িতে গিয়ে ওকে অনেক বোঝাতে চেষ্টা করলাম, কিন্তু মেয়েটা এতটাই বোকা যে, কিছুই শুনল না। এই প্রথম আমার স্বাগতাকে বুদ্ধিহীন মনে হল। খুব দৃঢ় গলাতেই ও বলে চলল, ‘অ্যাবর্শান আমি করাব না! তুমি শ্রেয়াদিকে ডিভোর্স করে আমাকে বিয়ে করবে কিনা সেটা তোমার ব্যাপার!’
‘ঠিক আছে, আমি একটু ভেবে দেখি। ও হ্যাঁ, কালকে একটা সাইট ভিজিট আছে। তুমি হেলিকপ্টারে যেতে পারবে, না অন্য কাউকে বলব?’
‘আমি পারব!’
‘ঠিক আছে, তাহলে তোমাকে তুলে নেব সকাল সকাল।’
এর আগেও স্বাগতা অনেকবার আমার সঙ্গে সাইট ভিজিটে গেছে, তাই ও কিছু সন্দেহ করল না। ওকে যেটা জানালাম না সেটা হল এই ভিজিটে শুধু আমরা দুজন যাব, পিল্লাই বা শর্মা কেউ থাকবে না!
স্বাগতার বাড়ি থেকে বেরিয়ে আমার হেলিকপ্টারটাকে দেখতে গেলাম। জরুরি কিছু জিনিস হেলিকপ্টারে রেখে এলাম। রাতে যখন বাড়ি ফিরলাম দেখলাম শ্রেয়া ঘুমিয়ে পড়েছে। সারারাত আমার ঘুম হল না— প্ল্যানটা বারবার মাথায় ঝালিয়ে নিচ্ছিলাম— কোথাও কোনো ফাঁকফোকর থেকে যাচ্ছে না তো?
পরের দিন, খুব ভোরবেলা অফিসে পৌঁছে স্বাগতাকে ফোন করলাম। ওকে বললাম, ওকে বাড়ি থেকে তুলতে একটু অসুবিধা হবে, তাই ও যদি সোজা যেখানে হেলিকপ্টার থাকে সেখানে চলে আসে তাহলে আমার খুব সুবিধা হবে।
স্বাগতা রাজি হল।
আমি অফিস থেকে বেরিয়ে গাড়ি নিয়ে সোজা হেলিকপ্টারের হ্যাংগারে পৌঁছে গেলাম। সেটা আর কিছুই নয়, শহর থেকে কিছুটা দূরে একটা খালি জায়গায় একটা গুদামঘর মতন। ঝড় বৃষ্টি থেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে হেলিকপ্টারটা ওই গুদামঘরটার মধ্যে রাখি। জায়গাটার আশেপাশে কোনো লোকবসতি নেই।
কিছুক্ষণ পর স্বাগতা এল। স্কুটিটাকে বাইরে পার্ক করে গুদামের ভিতর চলে এল। এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখে বলল, ‘পিল্লাই আর শর্মাজিরা যাচ্ছেন না?
আমি গ্লাভস-পরা হাত দুটোকে পকেটে ঢুকিয়ে রেখে বললাম, ‘নাহ, আজ শুধু আমি আর তুমি!’
ও মনে হয় একটু ভয় পেল, কী একটা বলতে যাচ্ছিল। তার আগেই আমি পকেট থেকে তারটা বার করে ওর গলায় পেঁচিয়ে একটা টান মারলাম। জলজ্যান্ত সুন্দরী মেয়ে থেকে একটা কুৎসিত মৃতদেহে পরিণত হয়ে যেতে স্বাগতার বেশিক্ষণ লাগল না। কুৎসিত, কারণ, ওর মুখটা নীলচে-বেগুনি মতন হয়ে গিয়েছিল, জিভ, চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসছিল, নাঃ,আর তাকাতে পারছিলাম না আমি।
গাড়ির পিছন থেকে ত্রিপলটা বার করে সেটা দিয়ে ওর দেহটাকে গোল করে পাকিয়ে মুড়ে ফেললাম। স্বাগতার ত্রিপলে মোড়া দেহ, ওর হাতব্যাগ, ফোন, স্কুটি সব কিছু হেলিকপ্টারে তুলে রওনা দিলাম দার্জিলিংয়ে আমাদের ফ্যাক্টরির পথে। ফ্লাইট প্ল্যান? ওসব কে দেবে! আমি প্রায়ই কোনো ফ্লাইট প্ল্যান জমা দিই না— হেলিকপ্টার তো!
