আলোময়বাবুর সময় থেকে মিসেস জোসেফ চেয়ারম্যানের সেক্রেটারি ছিলেন। অ্যাংলো ইন্ডিয়ান মহিলা, খুবই এফিশিয়েন্ট এবং নিখুঁত কাজ। ওনাকে নিয়ে আমার কোনো সমস্যা ছিল না, কিন্তু ওনার ষাট বছর বয়স হতে উনি রিটায়ার করবেন ঠিক করলেন। ওনার মেয়ে নাকি বিয়ে হয়ে নাগপুরে সেটল করেছে, ওখানে কিছুদিন কাটাতে চান, ইত্যাদি ইত্যাদি! কী আর বলব? রাজি হলাম। তবে বললাম, ‘আপনাকে আমি যেতে দেব মিসেস জোসেফ, তবে নতুন সেক্রেটারি কিন্তু আপনাকেই ঠিক করে দিয়ে যেতে হবে। ওসব শ-য়ে শ-য়ে লোককে ইন্টারভিউ আমি করতে পারব না। স্মার্ট, চৌকশ একজন কাউকে আপনার জায়গায় বসিয়ে আপনার কাজগুলো শিখিয়ে দিলেই আপনার ছুটি!’
মিসেস জোসেফ আমার কথাতে রাজি হলেন। সত্যি বলতে কী আমাকে একেবারেই বিরক্ত করেননি। ওনাকে কথাটা বলার দু-মাস পর উনি স্বাগতার সঙ্গে আমরা আলাপ করিয়ে দিলেন। ভালোই লাগল ওর সঙ্গে কথা বলতে। স্বাগতা চলে যাওয়ার পর মিসেস জোসেফ আমাকে বললেন, ‘এই মেয়েটাকেই আমি বেছেছি— আপনার যদি আপত্তি না থাকে তাহলে একে অফার লেটার পাঠিয়ে দিতে পারি।’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমার কোনো আপত্তি নেই, আপনি পাঠিয়ে দিন। আপনি যদি মনে করেন ও যোগ্য, সব কাজ হ্যান্ডেল করতে পারবে, তাহলে আজই ওকে অফার লেটার পাঠিয়ে দিন, ও জয়েন করলেই আপনার ছুটি!’
এইভাবেই স্মার্ট, সপ্রতিভ ঝকঝকে ছাব্বিশ বছরের স্বাগতা আমার সেক্রেটারি হয়ে আমার অফিসে ঢুকল।
স্বাগতা সত্যি খুব কাজের মেয়ে। মিসেস জোসেফের অভাব ও আমাকে একদিনের জন্যেও বুঝতে দেয়নি। সব সময় মুখে হাসি লেগেই আছে। ওর হাসি দেখলে যেন আমার দিনগুলো বেশি ঝলমলে হয়ে উঠত। কোনো কাজে ‘না’ বলত না স্বাগতা, সব কাজ শিখে নিতে রাজি।
শ্রেয়ার সঙ্গেও একদিন আলাপ করিয়ে দিলাম স্বাগতার। আমি কাজপাগল বলে দুর্নাম আছে, কিন্তু ব্যভিচারী দুর্নামটা নেই, কারণ আমি খুব সাবধানী, তাই শ্রেয়া স্বাভাবিকভাবেই স্বাগতার সঙ্গে কথাটথা বলল। ওহ, বলা হয়নি, এর মধ্যে আমার আরও অনেক উন্নতি হয়েছে। আমি গাড়ি আর হেলিকপ্টার দুটোই চালাতে শিখেছি এবং নিজস্ব দুটো কার আর একটা হেলিকপ্টারও কিনেছি। যখন-তখন সেগুলো নিয়ে বিভিন্ন ব্রাঞ্চে আর ফ্যাক্টরিতে পৌঁছে যাই। লোকে বেশ চমকে টমকে যায়, তাতে আমার খুব মজা হয়। ওই যে কথায় আছে না, ‘দা সিপ অফ পাওয়ার ইজ ভেরি অ্যাডিকটিভ।’
স্বাগতার মায়াজালে আমি ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়তে লাগলাম। ওরও যে আমাকে ভালো লাগে সেটা ও বিভিন্নভাবে বুঝিয়ে দিত। ওর মতন একজন সুন্দরী স্মার্ট মেয়ে আমার মতন ছেচল্লিশ বছরের এক আধবুড়োকে পাত্তা দিচ্ছে সেটা ভেবেই আমি পুলকিত ছিলাম। মেয়েরা যে তাদের বসেদের সঙ্গে প্রায়ই এই রকমটা করে থাকে সেটা আমার জানা ছিল না। যাই হোক, এক ভ্যালেনটাইন্স ডে-তে স্বাগতা আমাকে একটা কার্ড দিল। সেদিন সারাদিন আমি কাজের ফাঁকে ফাঁকে কার্ডটা নিয়ে ভাবলাম। বিকেল সাতটা নাগাদ অফিস থেকে বেরিয়ে কী মনে হল স্বাগতার বাড়িতে গিয়ে হাজির হলাম। একটা ফাইল হাতে নিয়েছিলাম এই ভেবে যে, যদি দেখি ওর সঙ্গে কেউ রয়েছে তাহলে ওকে ফাইলটা ধরিয়ে দিয়ে চলে আসব। ওর বাড়িতে গিয়ে বেল দিতেই স্বাগতা এসে দরজা খুলল। আমাকে দেখে খুব আশ্চর্য হল, ‘স্যার আপনি? আসুন আসুন, কিছু দরকার আছে নাকি?’
‘না, না, তেমন কিছু নয়। এই ফাইলটা তোমাকে দিতে এলাম। তুমি এটা পড়ে রাখলে কালকের মিটিংয়ে তোমার সুবিধা হবে।’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই পড়ে রাখব। তবে আপনাকে একবারটির জন্যে হলেও ভিতরে আসতে হবে, স্যার! আপনি দরজা থেকে চলে গেলে ভীষণ পাপ হবে আমার!’
‘নাহ, মানে আজ তো ভ্যালেন্টাইন্স ডে— তোমার অন্য প্ল্যান ট্যান…’
‘আমার অন্য কোনো প্ল্যান নেই!’ বলে স্বাগতা আমার হাত ধরে আমাকে টেনে নিয়ে গেল বাড়ির ভিতর।
সুন্দর ছিমছাম বাড়ি। প্রচুর গাছপালা রয়েছে ঘরের মধ্যেই। স্বাগতা জল আর মিষ্টি নিয়ে এল আমার জন্যে। আমাকে বলল, ‘আমি কিন্তু আজকে চিংড়ি মাছ রান্না করেছি স্যার, আপনাকে খেয়ে যেতেই হবে!’
আমি এমনিতেও প্রায়ই ক্লায়েন্টদের সঙ্গে হোটেলে খেয়ে বা দেরি করে বাড়ি ফিরি, তাই শ্রেয়া আর আমার জন্যে অপেক্ষা করে না। ও খেয়ে আমার খাবার টেবিলে রেখে টিভি দেখতে চলে যায়— আর বেশি রাত হলে শুয়েও পড়ে। তাই আমি স্বাগতার হাতের রাঁধা চিংড়ি খেতে রাজি হলাম। আর সেইদিন থেকে স্বাগতার সঙ্গে আমার শারীরিক সম্পর্কের সূত্রপাত হল। ওর রূপের মোহিনী ঢেউয়ে আমি একেবারে ভেসে গেলাম।
.
আমি রাতে রোজই দেরি করে ফিরতাম তাই সেটা আর নতুন কিছু নয় বলে শ্রেয়ার সন্দেহের কোনো কারণ ছিল না। অফিসে আমি আর স্বাগতা আগের মতন বস আর সেক্রেটারি হয়েই রইলাম। আমি ওকে সাবধান করে দিয়েছিলাম যে, অফিসের লোক আমাদের নিয়ে গসিপ করুক সেটা আমি চাই না মোটেই, তাই অফিসে এতটুকু অন্তরঙ্গতা দেখানো চলবে না! সেই কারণে অফিসের কেউ ঘুণাক্ষরেও ব্যাপারটা জানতে পারেনি।
ভালোই চলছিল এইভাবে মাস ছয়েক, তারপরই গন্ডগোলটা হল।
স্বাগতাকে আমি খুব পরিষ্কার করে বলে দিয়েছিলাম, ‘দেখো আমি কিন্তু কোনো কমপ্লিকেশান চাই না!’
