কিন্তু কেক কাটার ছুরিটাকে সামলাতে পারলাম না।
মনের উচ্ছলিত তরঙ্গের কারণে শরীরটা কুঁকড়ে গেল। আরে অপরিমেয় সংকোচে ভার হয়ে ছুরিটা ছোবল মারল আমার ঠোঁটে। ঠোঁট কাটল। রক্ত চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছিল সেখান থেকে।
তুমি তখন আমার কোয়ার্টারের কিচেন আর ডাইনিং রুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে। দেখে এনজয় করছিলে আমার রক্তাক্ত ঠোঁট।
তারপর মিলন হল আমাদের।
তীব্র মিলন…
আমার রক্তাক্ত ঠোঁটে তোমার ঠোঁট প্রতিষ্ঠিত হল। আর তারপর…
ব্ল্যাক উইডোর মতো…শেষ যৌন সংসর্গের পর…আমার শরীরের সমস্ত রক্ত চুষে তুমি খুন করেছিলে আমাকে…
আচ্ছা, মান্ডিদের সেই কুৎসিত ছেলেটিও কি খুন হয়েছিল এই ভাবে?
মরীচিকা – অনন্যা দাশ
আমার নাম শৌভিক সেন। আমার একটা পরিচয় হল আমি একটা খুন করেছি, তবে আমার সেই পরিচয়টা কেউ জানে না, অন্তত আমি তাই মনে করি। আমার যে পরিচয়টা সবাই জানে সেটা হল আমি গার্মেন্টস ইন্টারন্যাশনালের মালিক। আমি সমাজে প্রতিষ্ঠিত, সবাই আমাকে সমীহ করে। আসলে যে আমি খুব একটা হিংস্র প্রকৃতির তা কিন্তু নয়, তবে আমি একটু বেশি পরিমাণে স্বার্থপর। অনেকেই হয়তো সেটা মানতে পারবে না কারণ আমি বহু অনাথাশ্রম, মহিলা সংস্থা ইত্যাদিতে প্রচুর পরিমাণে অর্থ দিই— কিন্তু সেটাও স্বার্থের কারণে। আসলে কাগজে আমার নাম বড় বড় হরফে বেরোলে আমার খুব ভালো লাগে। আর ছবি বেরোলে তো কথাই নেই! আমি একটা বিলাসবহুল বাড়িতে থাকি, অনেকেই আমাকে টাকার কুমির বলে। আমি অবশ্য তাতে রাগি না, বরং আমার ভালোই লাগে, কারণ অনেক কষ্ট করে এই অর্থ আমি উপার্জন করেছি!
আমার বাবা ছিল সাধারণ এক কারখানার কর্মী। মোটামুটি সংসার চলে যেত আমাদের। আমার যখন আট বছর বয়স তখন একদিন অন্যমনস্ক হয়ে কাজ করতে গিয়ে মেশিনে বাবার ডান হাতটা কাটা যায়। ব্যস, তারপর থেকেই শুরু হয়ে যায় আমাদের চরম দুঃখের দিন। বাবা চাকরি তো হারালই এবং মানসিক দিক থেকেও এতটাই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ল যে, আর কিছুই করতে পারত না। মা বাড়িতে বাড়িতে বাসন-মাজা, কাপড়-কাচা, রান্না-করা শুরু করল। যদিও মার এত কষ্ট সত্ত্বেও স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়নি আমার। মা বড়লোকদের বাড়িতে কাজ করতে যেত— কোনো কোনোদিন শরীর খারাপ হলে আমাকে দিয়ে বলতে পাঠাত। ওদের গাড়ি, আসবাবপত্র, ওদের ছেলেমেয়েদের খেলনা দেখে আমি মনে মনে ভাবতাম আমাকে বড় হয়ে এইরকম বাড়িতে থাকতে হবে, গরিবের জীবনে আমি বেশিদিন থাকব না। মাকে জিজ্ঞেস করলে মা বলত, ‘মন দিয়ে পড়াশোনা কর বাবা, তাহলেই অনেক দূর যেতে পারবি।’ আমি তাই করতাম। একটা বস্তিতে থাকতাম আমরা। আশপাশের অন্য ছেলেমেয়েরা যখন গালাগালি, খিস্তিখেউড় করত আমি তখন দাঁতে দাঁত চেপে পড়াশোনা করতাম। নিজেকে বারবার বলতাম, আমি ওদের মতো নই, আমাকে অনেক দূর যেতে হবে। আর গেলামও, স্কুলে ভালো রেজাল্ট করে কলেজে ঢুকলাম। এম কম পাশ করে গার্মেন্টস ইন্টারন্যাশনালে চাকরিতে ঢুকলাম, আর সেটাই হল আমার জীবনের যাকে বলে ‘টার্নিং পয়েন্ট’। গার্মেন্টস ইন্টারন্যাশনাল একটা ছোট প্রাইভেট কোম্পানি ছিল। মালিক আলোময় সরকার নিজের হাতে সেটাকে গড়ে তুলেছিলেন। আমি প্রচণ্ড খাটতাম, রাতদিন এক করে ওখানেই পড়ে থাকতাম। খুব শিগগিরই আলোময়বাবুর নজরে পড়লাম আমি। আমার উচ্চাকাঙ্ক্ষার কথা শুনে খুব খুশি হলেন উনি, নিজের বাড়িতেও নিয়ে গেলেন। সেখানেই আমার আলাপ হল শ্রেয়ার সঙ্গে।
শ্রেয়া আলোময় সরকারের একমাত্র মেয়ে। দেখতে মোটামুটি সুশ্রী কিন্তু আমার কাছে সে যেন জাদুর জগতের চাবিকাঠি। সেই থেকে শুরু হল আমার জীবনের আরেক অধ্যায়— প্রেমকে ঘাড় ধরে আমার জীবনে টেনে নিয়ে এলাম আমি। ফুল, কবিতা, চকোলেট সব কিছু দিয়ে শ্রেয়ার মন কাড়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগলাম। বেশিদিন লাগলও না, তিনমাসের মধ্যেই গলে গেল সে! আরও তিন মাস লাগল ওর মা-বাবাকে রাজি করাতে। শেষ পর্যন্ত তাঁরাও মত দিলেন, কিন্তু একটা শর্তে— বিয়ের পর আমাকে ঘরজামাই হয়ে ওনাদের বাড়িতেই থাকতে হবে। আমি এককথাতেই রাজি। আমার নিজের মা-বাবা ততদিনে গত হয়েছেন, ফলে পিছুটান বলতে কিছু নেই।
শুভ দিনক্ষণ দেখে আমার সঙ্গে শ্রেয়ার বিয়ে হয়ে গেল। শ্রেয়ার সঙ্গে ওদের বাড়িতে থাকতে শুরু করলাম আমি। বিয়ের পর কিন্তু আমি থেমে যাইনি, ঠিক একইভাবে কাজ করে যেতাম আলোময়বাবুর কোম্পানিতে। শ্রেয়া প্রায়ই বলত, ‘এত খাটো কেন? মাঝে মাঝে তো বিশ্রাম নিতে পারো, বাবা কিছু বলবে না!’
আমি হেসে বলতাম, ‘বা রে! নিজেদের কোম্পানির জন্যে খাটব না তো কার জন্যে খাটব?’
দিন গড়িয়ে চলল। বিয়ের পাঁচ বছর বাদে একটা দুর্ঘটনায় শ্রেয়ার মা আর বাবা দুজনেই মারা গেলেন— না, আমার কোনো হাত ছিল না সেটাতে। আমি আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে রাজি ছিলাম। যাই হোক, উইলে দেখা গেল বাড়িটা শ্রেয়ার আর কোম্পানিটা আমার! উত্তেজনায় আমি সেদিন সারারাত ঘুমোতে পারিনি! শ্রেয়া কান্নাকাটি করে ঘুমিয়ে পড়েছিল আর আমি সারারাত জেগে ভেবেছিলাম, এখন কী করব!
পরদিন থেকে আমি গার্মেন্টস ইন্টারন্যাশনালের দায়িত্ব নিজের হাতে নিয়ে নিলাম। কিছু বয়স্ক লোক আমার নেতৃত্বটা ভালোভাবে নিতে পারছিল না। আমি তাদের সসম্মানে রিটায়ার করার প্রস্তাব দিতে তারা মেনে নিল। তাতে আমার লাভই হল, আমি আমার মতন উচ্চাকাঙ্ক্ষী লোকেদের চাকরি দিতে শুরু করলাম, চড়চড় করে বাড়তে লাগল কোম্পানিটা। খুব শিগগিরই আমরা ভারত ছেড়ে বিদেশেও মার্কেটিং শুরু করলাম। কাজের চাপ বেড়েই চলল। শ্রেয়াকে তাই খুব কম সময়ই দিতে পারতাম। ও কী সব ক্লাব, চ্যারিটি ইত্যাদি নিয়ে থাকত, ঠিক খেয়ালও করতাম না। তবে ও যখন যা চেয়েছে কখনও ‘না’ বলিনি। এইভাবেই চলছিল সবকিছু— এমন সময় একদিন স্বাগতার আবির্ভাব হল।
