ঘরে ফিরে রাজকুমারী তার বাবা—মায়ের কাছে সব কথা খুলে বলল। তখন রাজকুমারীর প্রতিজ্ঞা রক্ষার্থে দিকে দিকে লোক পাঠানো হল এবং পরিশেষে মান্ডি পরিবারের সেই কুৎসিত যুবকটির সন্ধান পাওয়া গেল। রাজকন্যার সঙ্গে যুবকটির বিয়ে হল ঠিকই, কিন্তু বনিবনা হল না। কন্যার বাবা—মা মেয়েকে শ্বশুরবাড়ি পাঠাতে রাজি হলেন না।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কিস্কুদের সঙ্গে মান্ডিদের বিবাদ শুরু হয়েছিল এবং তা নাকি টিকে ছিল বহুদিন।
কিন্তু জনশ্রুতি অন্য কথা বলে। জনশ্রুতি বলে, ওই বিয়ের পর থেকে মান্ডি যুবকটি কোথায় যেন হারিয়ে যায়। তাকে আর কেউ কোনওদিন দেখেনি।
এই ছিল তোমার বলা গল্পটি। কিন্তু সেগুনী, এই গল্প তুমি আমায় বলেছিলে কেন? কী ছিল তোমার অভিপ্রায়?
.
আর রক্ত!
আমার রক্ত দেখলে তুমি অপ্রত্যাশিতভাবে উতলা হয়ে উঠতে সেগুনী। বাছুরডোবায় তোমাদের বাড়ির সামনে গিয়ে আমার গাড়িটা থামল। কিন্তু অসাবধানে গাড়ির দরজা খুলতে গিয়ে আমার বাঁ—হাতের বুড়ো আঙুলটা থেঁতলে যায়। রক্ত চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়তে থাকে। তখন তোমার চোখ বিস্ফারিত। ক্ষুধার্ত দৃষ্টিতে তুমি তাকিয়েছিলে চুঁইয়ে পড়া রক্তের দিকে। যন্ত্রণায় তখন আমার ভিতরটা তীব্রভাবে মোচড়াচ্ছে। আমার কষে ঝুলে পড়া জিভ মুখগহ্বরে ঢুকে স্থিত হচ্ছিল না। শরীরের কাঠামোয় বল ফিরে আসছিল না। অথচ তখনও তুমি যেন সম্ভোগ—পাগল ক্ষুধার্ত! আমার কষ্টের কথা বুঝতে চাইছিলে না।
তখন বুঝিনি। আজ বুঝি—তুমি কেন আমার রক্ত দেখে শীৎকৃত হয়ে উঠতে…
উঁচু ডাঙ্গাল জমিতে তোমাদের ঘর। তারপর থাকে—থাকে নীচে নেমে গেছে উদ্ভিদ—সবুজ জমি। সেখানে ফুলের চাষ হয়। তোমাদের শস্যাগার আছে। তার পাশে প্রশস্ত ভূমি। সেখানে গাড়িটাকে নিয়ে গিয়ে পার্ক করলাম।
শস্যাগার থেকে আদিম বুনো গন্ধ ভেসে আসছিল। আমার গা গুলিয়ে উঠল। জিজ্ঞেস করলাম, ‘ওখানে কী আছে?’
‘কুকুর’, তুমি বলেছিলে।
‘ওদেরকে ওখানে ঢুকিয়ে রাখা হয়েছে কেন?’
‘কেননা ওরা হিংস্র’, তুমি নিভৃত কণ্ঠে বললে।
তারপর তোমার বৃদ্ধ বাবার সঙ্গে পরিচয় হল। তিনি যুধিষ্ঠির কিস্কু।
আমি অবাক হয়ে লক্ষ করলাম তাঁর ডান হাতটা কাঠের। সেখানে অনেক ছিদ্র।
জিজ্ঞেস করলাম, ‘হাতটা কাঠের কেন?’
‘এক দুর্ঘটনায় হাতটা কাটা যায়।’
‘আর ছিদ্রগুলো কীসের জন্য?’
একটু পরে মনে হল, আমার এমনধারা প্রশ্ন শুনে যুধিষ্ঠির কিস্কু যেন অবাক হলেন। ঘুরে দাঁড়ালেন তোমার দিকে। তারপর অভিশপ্ত স্বরে বললেন, ‘তুমি আমাদের পারিবারিক ইতিহাস এই ছোকরাকে বলোনি?’
‘না, বলা হয়ে ওঠেনি।’ তুমি বলেছিলে।
‘বাহ! চমৎকার! ও—সব কথা না বলেই বন্ধুত্ব করা হয়ে গেছে?’
.
সেদিন সন্ধেবেলা বাড়ির ছাদে বসে গল্প হচ্ছিল। যুধিষ্ঠির কিস্কুও ছিলেন সেখানে। তখনই কথায় কথায় জানতে পারলাম পুরো ঘটনাটা—
তোমার একটা ছোট বোন ছিল। নাম—বেদিনি। পুকুরের জলে সাঁতার কাটতে গিয়ে একদিন ডুবে মরে সে। তারপর কিছুদিন বাদে বেদিনি এসে হাজির হয় তোমার বাবার কাছে। বলে, ‘আমি একা একা আর ঘুরে বেড়াতে পারছি না। আমার আশ্রয় চাই।’
যুধিষ্ঠির জিজ্ঞেস করলেন, ‘কীভাবে আশ্রয় দেব?’
‘তোমার কাঠের হাতে আশ্রয় দেবে। ওখানে অনেকগুলো ছিদ্র তৈরি করো, যাতে আমি ঢুকতে—বেরোতে পারি। এইভাবে আমি তোমার শরীরে আশ্রয় নেব।’
অনেক রাত অবধি ছাদে বসেই গল্প হল। যুধিষ্ঠির কিস্কু চলে গেছেন অনেকক্ষাণ। আকাশে তখন শুভ্র পূর্ণশশী। তুমি কাঁদছিলে সেগুনী। রাত ক্রমশ গভীর হয়। তুমি আমার কানের কাছে মুখ এনে অর্ধস্ফুটে আবার জিজ্ঞেস করলে—
‘তাহলে তাড়াতাড়ি বলো, আমি, না আমার ভালবাসা?’
‘মানে?’ আমি আবার শুধোলাম। ‘মানে, আমি, না আমার প্রেম, কাকে ছাড়া তুমি বাঁচবে না?’ ‘কেন দুটোই একসঙ্গে পাওয়া যায় না?’ যথারীতি তুমি আমার এ প্রশ্নের কোনও উত্তর দাওনি।
অথচ তুমি ক্রমাগত প্রবল কান্নায় ভেঙে পড়ছিলে। বলছিলে, ‘এ আমি কী ভুল করলাম সবিতাব্রত! ভুল! ভুল! সবই ভুল!’
‘কেন? কেন এ—কথা বলছ?’ আমি কাতর কণ্ঠে জিজ্ঞাস করলাম।
‘তোমার সঙ্গে আমার কোনও সামাজিক সম্পর্ক গড়ে উঠবে না, মানে বিয়ে হবে না!’
‘কেন?’
‘আমার বাবার বয়স হয়েছে। বৃদ্ধ হয়েছেন তিনি। আমার বোন, বেদিনি, তাকে আর ক্যারি করতে পারছেন না। এখন আমাকে সেই দায়িত্ব নিতে বলছেন। তাই আমাকে এখন এগিয়ে আসতে হবে… আমার বোনের দায়িত্ব নিতে হবে…’
‘সেটা কীভাবে সম্ভব?’
‘একটা অ্যাক্সিডেন্ট হবে। আমার একটা হাত বা পা কাটা যাবে। তারপর সেই প্রত্যঙ্গের কাঠের অবিকল নকল তৈরি হবে। যেমন আমার বাবার কাঠের ডান হাত। সেখানে অনেকগুলো ছিদ্র থাকবে। আর তখনই আমার বোন বেদিনি এসে আশ্রয় নেবে সেখানে। বুঝলে?’
‘বুঝলাম।’
‘না বোঝোনি।’
‘কেন?’
‘আমি তোমার স্ত্রী হতে পারলাম না। কিন্তু ভেবো না অন্য কোনও নারীকে তোমার স্ত্রী হতে দেব…’
‘সেটা কীভাবে সম্ভব?’
‘দেখতে পাবে, সবিতাব্রত…দেখতে পাবে…’
ঘটনার অপ্রত্যাশিত অবাক করা পীড়নে আমার চোখে জল এসে পড়তে চাইছিল…।
পরের দিন ঝাড়গ্রামে ফিরে এলাম।
তারপর অনেকদিন…অনেক মাস কেটে গেল…
নভেম্বর মাসের তেরো তারিখে তোমার জন্মদিন। তোমার জন্য বার্থ—ডে কেক কিনে আনলাম সেলিব্রেট করব বলে। সঙ্গে তিরিশখানা মোমবাতি।
