অথচ আমার মনে পড়ছিল, একটু আগেই আমি বিছানায় চিত হয়ে শুয়েছিলাম। কিন্তু বেশিক্ষণ এভাবে শুয়ে থাকতে পারলাম না। চারপাশের গভীর আঁধার থেকে তখন দুটো কালো হাত এগিয়ে আসছে আমার দিকে। রক্তজবার আভা সেখানে স্পষ্ট, তীব্র এবং স্থায়ী। ভয়ঙ্কর পশুদের আর দেখা যাচ্ছে না। সহসা তারা বাতাসে মিলিয়ে গেছে। পশুকুল যেন শান্ত হয়েছে এবার।
কিন্তু তারপরেও চতুর্দিকে মহানিশার গাঢ় নিশুতি। কেউ কোথাও জেগে নেই। স্বর্গের পরিরাও যেন ঘুমিয়ে পড়েছে পাশ ফিরে। আর ঠিক তখনই তিনদিক থেকে তিনটি আলোর রশ্মিরেখা ফুটে উঠল অন্ধকারে। তলস্থ জমিতে সর্বস্ব গোপন করে রাখা সুন্দর আলো। এক—একটি আলোর শরীরে পরিপূর্ণ রূপ পেল এক—একটি মানুষের অবয়ব। তিনটি মানুষ। তারা হাসছে।
মধ্যিখানের মানুষটি বলছে—মনের অন্ধকার প্রবৃত্তির ছায়ায় ঢাকা। সেখানে দিনে রাতে পশুজগতের উৎপাত। বাইরের হিংস্র পশু ভিতরেই তো বাসা বেঁধে রয়েছে। নিধনযজ্ঞে বাইরের হাত থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব কিন্তু ভিতরের পশু থেকে উদ্ধার পাওয়া প্রায় অসম্ভব! তখন প্রয়োজন কনট্রোলড পাওয়ার…।
ডানপাশের আলোর মানুষটি কিছু বলছিল, কিন্তু তা ভালোভাবে কানে এল না— তাই বোধগম্য হল না।
এরপরই কয়েক পা আমি হাঁটলাম জঙ্গুলে ঝোপ সরিয়ে সরিয়ে। আমি বুঝতে পারছিলাম, আমাকে চড়াই পথ ভাঙতে হচ্ছে—এইরকম বড়ই অসম্ভব অন্ধকার আমি আগে কখনও দেখিনি। এটা কি আমারই কোয়ার্টার? তাহলে কি আমি যখন অতল নিদ্রায় দ্রবীভূত হয়েছিলাম তখন কারেন্ট চলে গিয়েছিল? আজকাল তো এ—সব এলাকায় সেভাবে কারেন্ট যায় না! তাহলে?
কোথা থেকে একটা মৃদু আওয়াজ আসছে না? নাকি কেউ মৃদু স্বরে মন্ত্র পড়ছে!
সর্বে চ পশবঃ সন্তি তলবদ ভূতলে নরাঃ।
তেষাং জ্ঞান—প্রকাশায়ঃ বীরভাবঃ প্রকাশিতঃ।
সামনেই শ্মশান। সেখানে চিতা জ্বালানো হয়েছে। লকলকে আগুনের শিখা আকাশ ছুঁই—ছুঁই করছে। ধোঁয়া পাক খেতে খেতে উপরে উঠছে, তারপর ভেঙে খান খান হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে আশেপাশে সর্বত্র। শিমুল অশ্বত্থের মাঝখানে অনেকটা ফাঁক, সেখান থেকে চিতার আগুন পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। আগুনের সে কী ভয়ানক দাপাদাপি! একটা মানুষকেও দেখা যাচ্ছে। তিনি লালচেলি পরে উত্তরমুখো হয়ে মন্ত্র পড়ছেন। কী যেন একটা পৈশাচিক কাণ্ড ঘটতে চলেছে…।
কীসের একটা শব্দে ঘুমটা পাতলা হয়ে এল, আর স্বপ্নটা ভেঙে যেতে ধড়মড়িয়ে বিছানার ওপর উঠে বসলাম আমি। সারা শরীর ঘামছিল। দ্রুত পায়ে বিছানা থেকে নেমে বাথরুমে গিয়ে বেসিন খুলে চোখে—মুখে ঠান্ডা জলের ঝাপটা দিতে শরীর শান্ত হল যেন। মন হল স্থির।
বুঝলাম, এখন আর চট করে ঘুম আসবে না। তবু ঘরের আলো জ্বাললাম না আমি। খাটের মাথার কাছে টেবিলে সিগারেট আর দেশলাই রাখা ছিল। অন্ধকার হাতড়ে সেগুলো হাতে নিলাম। তারপর একটা সিগারেট ধরিয়ে গিয়ে দাঁড়ালাম খোলা জানলার সামনে। গরমের রাত। আকাশে কুসুমরঙা চাঁদ। চারপাশ অসম্ভব রকমের গুমোট। তবু একটা ফুলের বুনো গন্ধ উড়ে এসে উতলা করছে রাতের মৃদু বাতাসকে। দূরে, অনেক দূরে, একটা নাম—না—জানা পাখি অবিরত করে চলেছে টকটক শব্দ।
এই ছিল স্বপ্ন ও তার পরবর্তী অংশ। আশ্চর্য! সেদিনও ছিল ১৩ তারিখ—১৩ মে—২০১৩…
.
বাছুরডোবায় তোমাদের বাড়িতে প্রথম যাওয়ার দিন এক অদ্ভুত প্রশ্ন করেছিলে তুমি। তারপর শুনিয়েছিলে অদ্ভুত এক গল্প—
কেন? কেন শুনিয়েছিলে?
তুমি বলোনি কোনওদিন আমাকে।
প্রশ্নটা করার আগে এক অবাক করা আলো খেলে বেড়াচ্ছিল তোমার চোখের সবুজাভ মণিতে।
আমার কানের কাছে মুখ এনে অস্ফুটে জিজ্ঞেস করলে— ‘তাহলে তাড়াতাড়ি বলো, আমি, না আমার ভালবাসা?’
‘মানে?’
‘মানে আমি, না আমার প্রেম, কাকে ছাড়া তুমি বাঁচবে না?’
‘কেন দুটোই একসঙ্গে পাওয়া যায় না?’
তুমি উত্তর দাওনি। দাওনি, আমার প্রশ্নের উত্তর তুমি সেদিন দাওনি!
বাছুরডোবার পথে গাড়িটা নিজেই ড্রাইভ করছিলাম। তুমি বসেছিলে পাশে। প্রথমে সামান্য অন্তরঙ্গ হলে, তারপর শুরু করলে তোমার সেই গল্প…
কিস্কুরা সাঁওতাল জাতির মধ্যে রাজবংশ। মান্ডিরা জমিদার বংশ। মান্ডিজাতির এক যুবকের চেহারা ভালো ছিল না। কিন্তু তার চুলগুলি ছিল খুবই লম্বা এবং চিক্কন কৃষ্ণ বর্ণ। এই যুবকের মাথার একটি চুল হঠাৎ করে খসে পড়ল। তাতে সমস্যার পর সমস্যা। যুবকটি ভাবল, সে যদি তার এতবড় চুলটি ডাঙায় রেখে দেয় তবে এই চুলে জড়িয়ে অনেক পাখপাখালির প্রাণহানি হবে। আবার, যদি সে এই চুলটি জলে ফেলে দেয় তবে এতে জড়িয়ে বহু মাছের প্রাণনাশ হবে।
অকারণে বহু প্রাণী হত্যার পাপ এড়ানোর জন্য যুবকটি চুলটিকে একটি শালপাতার মধ্যে মুড়ে নদীর জলে ভাসিয়ে দিল।
নদী ক্রমশ বয়ে চলে নিম্নদিকে। কিস্কু পরিবারের এক রাজকুমারী সেই নিম্নগামী বহতায় স্নান করতে গেল। দেখতে পেল শালপাতার সেই পুঁটলিকে। তখন সে তার সইকে পুঁটলিটা তুলতে বলল। পুঁটলি খুলে রাজকুমারী দেখল একটি চিক্কণ কৃষ্ণবর্ণ বারো হাত লম্বা চুল। এত বড় আর এত সুন্দর চুল দেখে রাজকুমারী বলল, সই, এই চুল যদি কোনও মেয়ের হয় তবে আমি তার সাথে সই পাতাব, আর, যদি কোনও ছেলের হয় তবে তাকে আমি বিয়ে করব।
