আমার বাবা খুব সুপুরুষ ছিলেন। তার ওপর ওইরকম চাকরি। বিয়ের আগে কোথায় ওঁদের আলাপ হয়েছিল জানি না, কিন্তু পরে মায়ের মুখেই শুনেছি বাবার ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়ে বিন্দুমাত্র খোঁজখবর না করে তিনি বিয়ে করতে রাজি হয়ে যান।
বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে এসে উঠলেন। ঠাকুমার সঙ্গে প্রথম মনোমালিন্য গয়না পরা নিয়ে। প্রথম কথা, মা খুব বেশি গয়না বাপের বাড়ি থেকে আনতে পারেননি। দ্বিতীয়ত, তিনি গয়না পরা খুব একটা পছন্দ করতেন না। কিন্তু ঠাকুমার সেই এক কথা, বাড়িতে আরও তিনটে বউ আছে (আমার বাবা ছিলেন বাড়ির ছোট ছেলে। তাঁর উপরে তিন ভাই), তারা যখন পরে, তুমি পরবে না কেন? আর তুমি এমন মুখে মুখে তর্কই বা করছ কেন? আমি তোমাকে গয়না পরে থাকতে বলেছি, তুমি পরবে—ব্যস মিটে গেল ঝামেলা।
কিন্তু মা বাড়ির নতুন বউ হওয়া সত্ত্বেও ঠাকুমার কথায় কর্ণপাত করেননি। এই ইগনোর করার ব্যাপারটা ঠাকুমা সহজে ভোলেননি। রাগ পুষে রেখেছিলেন। তাই দ্বিতীয় মনোমালিন্য বা অশান্তি হতে বেশি দেরি হল না।
ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল এইভাবে—আমার মা যে একজন পেইন্টার তা ঠাকুমা শুনেছিলেন অনেক পরে। যখন শুনলেন, ডেকে পাঠালেন মা—কে। নিজের শোওয়ার ঘরের একটা ফাঁকা দেওয়াল দেখিয়ে বললেন, একটা বড় ছবি এঁকে দিতে হবে। মা কালীর ছবি। ছবিতে বিগ্রহের পায়ের দু—ধারে বসে আছেন শ্রীরামকৃষ্ণ ও মা সারদা। মায়ের কাছে একটা চার ফুট বাই তিন ফুট ক্যানভাসে এই ছবি এঁকে দেওয়া কোনও কঠিন কাজ ছিল না। এঁকেও ছিলেন তিনি। ঠাকুমা খুব খুশি হয়েছিলেন। সুতরাং বাড়ির অন্য তিন বউমা অ—খুশি। তাঁরা ঈর্ষার চোখে তাকাতেন মায়ের দিকে।
কিন্তু মা এইসব ঠাকুর—দেবতার ছবি আঁকা পছন্দ করতেন না। তাঁর আগ্রহ ছিল অন্য রকমের কাজে। তিনি নিজস্ব একটা পেইন্টিং স্টাইল খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন—ভারতীয় অঙ্কনশৈলীর সঙ্গে আধুনিক ইউরোপিয়ান শৈলী মিশিয়ে।
একদিন কী একটা কাজে বাড়ির বাইরে বেরিয়েছিলেন। দুপুর নাগাদ কাজ মিটিয়ে বাড়ির দিকে ফিরছেন, দেখলেন, ফুটপাথের একদল ছেলে—মেয়ে রাস্তার ওপর ছুটোছুটি করে খেলছে। খাতা—পেনসিল সঙ্গেই ছিল, ব্যস, মা ফুটপাথেই বসে পড়লেন স্কেচ করতে। আমার মেজোজ্যাঠা ধারেকাছেই ছিলেন। পড়বি তো পড়, এ দৃশ্য তাঁর নজরে পড়ে গেল।
বাড়িতে সেদিন তুমুল হল্লা। অশান্তি। সন্ধেবেলা ঠাকুমা ডেকে পাঠালেন মা—কে। রুক্ষস্বরে বললেন, ‘তুমি ফুটপাথে বসে কী করছিলে?’
মা সিন্থেটিক গলায় উত্তর দিলেন, ‘আঁকছিলাম।’
‘তোমার লজ্জা করে না, মিত্রবাড়ির বউ হয়ে ফুটপাথে বসতে? সত্যি সত্যি বলোতো, তুমি সুস্থ না অসুস্থ?’
‘আমি সম্পূর্ণ সুস্থ। আর মিত্রবাড়ির বউ হওয়া সত্ত্বেও আমার আর একটা পরিচয় আছে জানবেন। সেই পরিচয় আমি পরিবার থেকে পাইনি। নিজের ক্ষমতায় অর্জন করেছি। আমি আর্ট কলেজের গ্র্যাজুয়েট। একজন পেইন্টার।’
‘শোনো মেয়ে, বাড়িতে বসে ঠাকুর—দেবতার ছবি আঁকলে আঁকো। না হলে এ বাড়িতে তোমার কোনও জায়গা নেই। বুঝলে?’
মা এরপর মাস দুই—তিন শ্বশুরবাড়িতে ছিলেন। তাঁর ওপর এই মানসিক অত্যাচার সত্ত্বেও তাঁর স্বামী, মানে, আমার বাবা, মেনিমুখো নিরুত্তর ছিলেন—এ উনি মেনে নিতে পারেননি। ততদিনে উনি আমাকে কনসিভ করেছেন। ইজেল, ক্যানভাস, রং—তুলি আর আমাকে গর্ভে নিয়ে চলে এলেন নিজের বাপের বাড়িতে। আর ফিরে যাননি। আশ্চর্য, বাবা নাকি এরপর কোনওদিন আসেননি আমাদের দেখতে। এমনটাও হয়?
যাই হোক, উত্তর কলকাতার এঁদোগলির মিত্রবাড়ির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ঘুচে যায় এরপর থেকে…।
জীবন চড়াই আর উতরাই—এর যোগফল। কী একটা কথা সেগুনী বলতে গিয়ে মায়ের কথা বলে ফেললাম। পৃথিবীর সমস্ত মা উতরাই—এর কথা বলে। আজ যখন পুরোনো কথা ভাবি, মনে হয় মায়ের কথা মানে, উতরাই—এর কথা। আ স্টোরি অফ ইউনিভার্সাল মাদারহুড। আসলে এত কথা বুকের মধ্যে জমে ছিল! জানবে, উতরাই মানে গা ছমছমে রাত অথবা, গভীর সন্ধে।
সেগুনী, তোমাকে বুক খালি করে এ—সব কথা বলছি কেন কে জানে! তাহলে আমি কি তোমার সমীপে নিঃস্ব হতে চাই? যাক সে যাক, এখন অন্য কথা বলি সেগুনী?
তুমি যে দুপুরে নিস্তব্ধ কলেজ লাইব্রেরিতে আমাকে প্রোপোজাল দিলে বাছুরডোবায় তোমার বাড়িতে নিয়ে যাবে বলে, সে রাতে আমি এক স্বপ্ন দেখেছিলাম। দুর্বোধ এবং ভয়ঙ্কর এক স্বপ্ন। এই স্বপ্ন দেখার কথা তোমাকে কোনওদিন বলিনি। আজ বলব।
তবে, তার আগে অন্য কথা। এক জীবন জিজ্ঞাসা। তাই প্রশ্ন, প্রশ্নের পর প্রশ্ন। আচ্ছা, মায়ের কথা বলতে গিয়ে উতরাইয়ের কথা এল কীভাবে? তাহলে কি উতরাই মানে সমস্ত সংযোগ—ছিন্ন—জীবনের কথা? কিছু হারানোর কথা? কিন্তু মন তো হারানোকে হারাতে চায় না। ‘নেই’ কথাটা মেনে নিতে পারে না। শুধু বিশ্বাস—অবিশ্বাসের দোলনায় দুলতে থাকে। এরই মধ্যে এমন অনেক ঘটনা ঘটে যা শুধু স্বপ্নে ঘটে। কল্পনায় ঘটে। অবিশ্বাস্যভাবে সে—সব ঘটনা ঘটে যায় একের পর এক। তাদের অস্বীকার করা দায়।
কী দেখেছিলাম সেই স্বপ্নে? শুনবে? শোনো তাহলে—
আকাশের নিকষ কালো অন্ধকার তখন লুটিয়ে পড়েছে ডাঙ্গাল জমির বুকে। আর সেই অন্ধকারে যেন চলছে তাণ্ডব নৃত্য। হিংস্র পশুদের উন্মত্ত উল্লাস। সেই হানাহানির যন্ত্রণা কী বীভৎস!
