সেই কবরে ওরা শুইয়ে দেবে বোবা রাজপুত্রের পুতুলটাকে ৷
ব্ল্যাক উইডো – দেবার্চন বসু
এখন আমি মধ্যরাতে এই পার্কে এসে বসি। কখনও ঘুরে বেড়াই পার্কের এখানে—সেখানে। অথচ একটা সময় ছিল যখন আমি আমার কোয়ার্টারে বিছানায় শুয়ে ঘুমোতাম আর স্বপ্ন দেখতাম। প্রতি মাসের তেরো তারিখেই স্বপ্নটা দেখতাম। দেখতাম এক নারীকে, যদিও তার মুখ দেখতে পেতাম না।
সেই নারীর হাতে থাকত একটা লম্বা ছুরি। ধারালো এবং তীক্ষ্ন। সে তাই দিয়ে আমার হৃৎপিণ্ডের একটা অংশ কেটে নিচ্ছে। তারপর মুখে পুরে নিচ্ছে হৃৎপিণ্ডের সেই টুকরোটা। টসটস করে রক্ত গড়িয়ে পড়ত তার ঠোঁট থেকে। আর সে যখন চিবোতে থাকত আমার হৃৎপিণ্ডের অংশটিকে, আমার মনে হত আমার বুকে ভীষণ ব্যথা—আমি নিশ্বাস নিতে পারছি না। কোনও এক নাম—না—জানা পাখির অস্পষ্ট ডাকে প্রতিবার আমার ঘুম ভেঙে যেত। খাটের পাশে মাথার কাছে একটা টেবিল। তার উপর একটি ডিজিটাল ক্লক। তা জানান দিত—সময় ভোর সাড়ে চারটে—শনিবার—১৩ ফেব্রুয়ারি —২০১৩ সাল।
কবে থেকে আমার এই স্বপ্ন দেখা শুরু হয়েছিল?
যেদিন তোমার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয়েছিল…।
আমি তখন ঝাড়গ্রামে একটা কলেজে অ্যানথ্রপোলজি পড়াতাম। তুমিও সেগুনী একই কলেজে পড়াতে। একই বিষয়। আমাদের দেখা হয়েছিল কলেজ লাইব্রেরিতে। মনে আছে সেগুনী?
প্রথমবারেই তোমাকে দেখে মনে হল, তুমি আমার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা। তোমার শরীরে কালিদাসীয় স্পেসিফিকেশানস। গুরু বক্ষ। গুরু নিতম্ব। ক্ষীণ কটি। আর অদ্ভুত সুন্দর তোমার দুটি চোখ। চোখের মণি সবুজাভ।
সুতরাং আমি প্রেমে পড়লাম।
একটা বই—এর মধ্যে মুখ গুঁজে ছিলে তুমি। হঠাৎই মুখ তুলে আমার দিকে তাকালে। হাসলে। বললে, ‘তুমি আমায় ভালবাসতে চাও? আমার রূপমুগ্ধ তুমি?’
আমার মনের মধ্যে তখন অতলসাগর। আমি তলিয়ে যাচ্ছিলাম ক্রমশ। তবু আমার মনের মধ্যে অযাচিত এক আততিবিততি—আমি কি তাহলে স্কিজোফ্রেনিক হয়ে যাচ্ছি?
পরে আর একটা প্রশ্ন যোগ হল মনের মধ্যে।
প্রেমে কি শুধু আমি পড়েছিলাম সেদিন? তুমি পড়োনি?
পড়েছিলে। না—হলে এত সহজে শরীর দিয়েছিলে কীভাবে?
শাল—সেগুনের বাগানের মধ্যে আমার কোয়ার্টার। সেখানেই দেখা হত আমাদের। মিলিত হতাম বারংবার। কোয়ার্টারটা ছিল তোমার খুব প্রিয়। তুমি বলতে, এ তোমার গোপন স্বর্গ।
আমি ছিলাম খুব অগোছালো। কোনও কিছুই ঠিকঠাক জায়গায় রাখতে পারতাম না। ঘরে ঢুকেই একটা টেবিল। তার ওপর একটা কম্পিউটার মনিটর। তারপর দেওয়াল ঘেঁষে কাঠের একটা নিচু ডিভান— তার ওপর ধূসর রঙের জমিতে বড় বড় সোনালি ফুলের বেডকভার। ঘরের মেঝেতে এদিকে—ওদিকে বই আর নানান ম্যাগাজিন ছড়ানো। দেওয়ালে আদিবাসী পুরুষ ও মহিলার মুখোশ।
ওই ঘরে দুটো জানলা। সেখানে হলুদ—রঙা পরদা।
আমি আর তুমি যতবার পরস্পরকে পরস্পরের শরীরে নিয়েছিলাম, সবদিনই সেটা ঘটেছে কোয়ার্টারের ওই বেডরুমে। কোয়ার্টারটা যেন নির্জন এক দ্বীপ। গোটা ঝাড়গ্রাম শহর খুঁজেও এরকম নিরিবিলি বাসস্থান হয়তো আর পাওয়া যাবে না, বা হয়তো যাবে, কিন্তু তাতে আমার বা তোমার কোনও ইন্টারেস্ট ছিল না। আমরা নিজেদেরটা নিয়েই খুশি।
সেই দিনটার কথা তোমার মনে আছে সেগুনী—এক বৃষ্টিস্নাত ছুটির দিনের দুপুর! তখন দিগন্তে বিষণ্ণতা। ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল তোমাকে দিয়েই। সচরাচর তুমিই তো অগ্রবর্তিনী হয়ে আমার নিরাবরণ শরীরটাকে অধিকার করতে। আসলে তোমার অন্য একটা উদ্দেশ্যও থাকত।
তখন সে—রস বুঝিনি; কিন্তু আজ বুঝি। আমি তখন শখ করে ‘জান্নাতুল ফিরদৌস নাইন্টিসিক্স’ আতর মাখা শুরু করেছি— আমার রোমশ বুকের জঙ্গলে তুমি খুঁজে বেড়াতে সেই সুগন্ধ। কী, তাই না?
সুতরাং তোমার সামনে আমার আত্মসমর্পণ করা ছাড়া কোনও উপায় থাকত না। পূর্ণমাত্রায় সাড়া দিতে আমার সময় লাগে। অথবা এমনটাও হতে পারে যে আমি হয়তো তোমাকে ‘অ্যাকটিভ’ দেখতে চাইতাম আর, নিজেকে ‘প্যাসিভ’। কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল—আজও জানি না। কিন্তু চরম মুহূর্তে আমি যে ক্রমশই লক্ষ্যভেদী, তা তুমি অস্বীকার করতে পারবে না। মনে পড়ে, সম্পূর্ণ তৃপ্ত ও শান্ত হওয়ার পর ফুল ফুল বেডকভার গায়ে জড়িয়ে শুয়ে থাকতাম আমরা? যেন নিস্তেজ সাপ!
মাঝে মাঝে ঠাট্টা করে আমি জিজ্ঞেস করতাম—অ্যাই, ঘুমোলে নাকি? আর প্রতিবারই তা শুনে তোমার খিল খিল করে হেসে ওঠা…।
আচ্ছা, তোমার এ—সব কথা মনে পড়ে না? বড় নিষ্ঠুর তুমি!
.
তুমি যেদিন বাছুরডোবায় তোমার বাবা’র সঙ্গে আমাকে দেখা করাতে নিয়ে যাবে বললে, বড় অস্বস্তিতে পড়েছিলাম। কারণ, তোমার পরিবার সম্পর্কে তখনও পর্যন্ত আমি খুব কমই। জানতাম শুধু জানতাম, তোমাদের হর্টিকালচারের ব্যবসা আছে। অথচ আমার মুখ দিয়ে কলকাতায় আমার পরিবার সম্পর্কে কত কিছু জেনে নিয়েছিলে। সে—সব কথা তুমি জানো, তবু বলি, কেন না বললে বুকটা হালকা হয়।
আমি মামার বাড়িতে থেকে মানুষ হয়েছি। মা অনেক কষ্টে করে বড় করেছিলেন আমাকে। এর জন্য দায়ী অংশত আমার বাবা, বাকিটা তাঁর পারিবারিক কালচার। উত্তর কলকাতার বনেদি বাড়ির ছেলে ছিলেন তিনি। অয়েল সেক্টরে বড় চাকরি করতেন। অফিসে দাপট থাকলেও বাড়িতে নিজের মায়ের কাছে একদম কেঁচো। ঠাকুমা ছিলেন দাপুটে এবং ষোলো আনা সেকেলে। আধুনিকতার কোনও হাওয়া ওই বাড়িতে বইত কিনা যথেষ্ট সন্দেহ আছে। অন্যদিকে আমার মা দক্ষিণ কলকাতার নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি থেকে উঠে এসেছিলেন। বাড়িতে গান—বাজনা, ছবি আঁকাআঁকি ইত্যাদির রেওয়াজ ছিল। আমার মা বিয়ের আগে আর্ট কলেজ থেকে ফাইন আর্টস—এ গ্র্যাজুয়েশান করেছিলেন।
