বিপুল সরকারের ইশারায় আটজন কনস্টেবল তাঁবুর চারপাশ ঘিরে দাঁড়িয়ে গেল ৷ বিপুল আর মৃদুল মুস্তাফি ঢুকলেন তাঁবুর ভেতরে ৷ দেখা গেল বুড়ো আর বুড়িই কেবল বসে বসে তামাক টানছে ৷ বাকি সবাই পুতুল নাচাতে ব্যস্ত ৷ বুড়ো আর বুড়ি বহুদর্শী ৷ দুই প্লেনড্রেসের অফিসারকে দেখে চিনতে পারল এবং সম্মান জানিয়ে বসতেও বলল ৷ তবে খুব একটা যে ভয় পেয়েছে এমন ভাব দেখাল না ৷
কৌশিক হালদার বলে একটা ছেলে এই তাঁবুতে ঢুকেছিল ৷ সে গেল কোথায়? সরাসরি প্রশ্ন করলেন মৃদুল মুস্তাফি ৷
বেদে বুড়ো শান্তভাবে জবাব দিল, আমাদের দলের বাইরে আর একজন লোকই এখানে আছে ৷ তার নাম কৌশিক নয়, রঞ্জন ৷ ওই যে, বোবা রাজপুত্রের পুতুল নিয়ে খেলা দেখাচ্ছে ৷ এ ছাড়া আর কোনো বাইরের লোক এই তাঁবুতে ঢোকেনি ৷ আপনি ইচ্ছে করলে সার্চ করে দেখে নিতে পারেন ৷
অগত্যা তাই-ই করতে হল দুই পুলিশ অফিসারকে ৷ তারা দুজনে মিলে তন্ন তন্ন করে তাঁবুর প্রতিটি কোণা, প্রতিটি প্যাকিং বাক্সের অভ্যন্তর, পর্দার আড়াল খুঁজে দেখলেন ৷ তাঁবুর ভেতর থেকে সরাসরি টিনের ঘেরাটোপের ভেতরেও ঢোকা যায় — যেখানে দাঁড়িয়ে আটজন বেদে আর রঞ্জন পুতুল নাচাচ্ছে ৷ সেখানেও ঢুকলেন দুই অফিসার ৷ ভালো করে চেয়ে দেখলেন প্রত্যেকের মুখের দিকে ৷ না, কোথাও নেই কৌশিক হালদার ৷
মৃদুল মুস্তাফি বাইরে বেরিয়ে এলেন ৷ দর্শকদের মধ্যে দাঁড়িয়ে মন দিয়ে কিছুক্ষণ পুতুলনাচ দেখলেন ৷ অদ্ভুত এক পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে এই মঞ্চের সামনে ৷ হেমন্তের মাঠের মধ্যে থেকে গুঁড়ি মেরে এগিয়ে আসছে ঘন কুয়াশা ৷ সেই কুয়াশা ধীরে ধীরে উঠে যাচ্ছে মঞ্চের ওপরে ৷ হ্যাজাকের হালকা সবুজ আলোয় সেই কুয়াশা এক অতল দিঘির সবুজ জলের মতন নড়াচড়া করছে; মনে হচ্ছে জলের নীচেই যেন অভিনীত হচ্ছে ইরানী রাজকুমারীর দুঃখের পালা ৷
সবথেকে আশ্চর্য লাগছে পুতুলগুলোকে ৷ বার্নিশ দিয়ে পালিশ করা তাদের মুখ হ্যাজাকের আলোয় চকচক করছে৷ নিষ্পলক চোখগুলো সুখে-দুঃখে হর্ষে-বিষাদে সমান বিস্ফারিত ৷ যেহেতু বেদেদের তেমন কারিগরি দক্ষতা নেই তাই পুতুলদের হাত পায়ের জোড়ও ভালো করে বানাতে পারেনি ওরা ৷ অতএব নাচের পুতুলদের মুভমেন্ট বলতে কেবল দেহকাণ্ডের ঝটকা মেরে ঘুরে যাওয়া — যেভাবে নিচ থেকে তাদের ঘোরানো হচ্ছে আর কি ৷ তারা ঠোঁট না নেড়েই কথা বলে ৷ টিনের আড়াল থেকে তাদের হয়ে কথা বলছে বেদে নারী- পুরুষেরা ৷
শুধু বোবা রাজপুত্রের কোনো ডায়ালগ নেই ৷ আড়ষ্ট অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিয়ে, বিস্ফারিত চোখের দৃষ্টি নিয়ে, ঝলমলে আলখাল্লা আর একমাথা কোঁকড়া চুলের বোঝা নিয়ে সে কেমন করুণভাবে যেন দাঁড়িয়ে রয়েছে মঞ্চের একটা কোনায় ৷ তার মানে দাঁড়িয়ে রয়েছে রঞ্জন নামে সেই ছেলেটাও, যার হাতে ওই পুতুলের শরীর ৷ মৃদুল মুস্তাফি তার লোকেদের হাতের ইশারায় গাড়িতে ফিরে যেতে বললেন ৷ মুখে বললেন, চলো গোষ্ঠ ৷ এখানে কেউ নেই ৷ তোমরা ভুল লোককে ঢুকতে দেখেছ ৷
.
দুদিন বাদে বিকেলবেলায় মুনিয়ার আসানসোলের ফ্ল্যাটের দরজায় কলিং- বেল বেজে উঠল ৷ দরজা খুলে মুনিয়া দেখল, মৃদুল মুস্তাফি দাঁড়িয়ে রয়েছেন ৷ সে তাঁকে ভেতরে এনে বসাল ৷
রুমাল দিয়ে মুখের ঘাম মুছে মৃদুলবাবু একবার ছন্নছাড়া ঘরটাকে চোখ দিয়ে জরিপ করলেন ৷ তারপর জিজ্ঞেস করলেন, কৌশিক হালদার কোথায় গিয়েছে আপনি জানেন?
মুনিয়া ঘাড় নাড়ল ৷
সত্যিই জানেন না? রঞ্জনবাবু আপনাকে কিছু বলেননি?
মুনিয়া সচকিত হয়ে তাকাল মৃদুল মুস্তাফির দিকে ৷ তারপর আবার ঘাড় নাড়ল ৷
মৃদুলবাবু তার অ্যাটাচির মধ্যে থেকে একটা ছোট ডিজিটাল-ক্যামেরা বার করলেন ৷ বললেন, সেদিন বেদেদের তাঁবুর ভেতর থেকে এটা কুড়িয়ে পেয়েছিলাম ৷ কাউকে জানাইনি ৷ তবে এখান থেকেই জানলাম, আপনি রঞ্জনবাবুর কাছে মুক্তি চেয়েছিলেন ৷
মুনিয়া মাথা নিচু করল ৷
রঞ্জনবাবু আপনাকে মুক্তি এনে দিয়েছেন ৷ কৌশিক হালদার আর কোনোদিনই ফিরবে না ৷ জানেন সেকথা?
মুনিয়া দুহাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে উঠল ৷ বলল, আমি জানি না, সত্যিই কিছু জানি না ৷
মৃদুলবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, আমি বিশ্বাস করি আপনার কথা ৷ সেই মুক্তি কীভাবে এসেছে তা রঞ্জনবাবু কোনোদিনই আপনাকে জানাবেন না ৷ জানাবার মতন নয় সে কথা ৷ বড় বীভৎস … বড় বীভৎস … ৷
মৃদুলবাবুর কথা মাঝপথেই থেমে গেল ৷ তিনি হঠাৎই যেন মনে-মনে অন্য কোনো জায়গায় চলে গেলেন ৷
নিস্তব্ধ ঘরে শুধু মুনিয়ার ফোঁপানির শব্দ শোনা যাচ্ছিল ৷
মৃদুলবাবু একটু বাদে গা-ঝাড়া দিয়ে বসলেন ৷ তারপর বললেন, এই কেসটা আমি ক্লোজ করে দিচ্ছি ৷ রিপোর্টে বলব, দ্যা কালপ্রিট ইজ অ্যাবস্কন্ডিং ৷ দুটো জীবন নষ্ট হয়েছে ৷ এখন এটাকে নিয়ে নাড়াঘাটা করা মানে আপনার জীবনটাও নষ্ট করা ৷ আশা করি আপনি তুষকাঠিতে ফিরে যাবেন ৷ চারবছর আগে যে ভুলটা করেছিলেন সেটাকেও এবার শুধরে নেবেন ৷ মনে হচ্ছে রঞ্জনবাবুর সন্ন্যাসের পথ খুব সহজেই ঘরের দিকে ফিরে আসবে ৷ আর আমার একটা পরামর্শ মনে রাখবেন ৷ কৌশিক কোথায় সেটা কখনোই জানার চেষ্টা করবেন না ৷ আপনি সহ্য করতে পারবেন না ৷
হতবাক মুনিয়াকে দরজায় দাঁড় করিয়ে রেখে মৃদুল মুস্তাফি আসানসোলের ভিড়ে ঠাসা রাস্তায় নেমে এলেন ৷ আপনমনে হাঁটতে হাঁটতে ভাবলেন, এই মুহূর্তে বেদেদের দল হয়তো পৌঁছে গেছে কোনো ধু ধু প্রান্তরের মধ্যে এক জলার ধারে ৷ সন্ধে নামছে ৷ শরঘাসের জঙ্গলের আড়ালে, কালো নরম মাটির বুকে, বেদে যুবকদের কোদালের কোপে কোপে একটা কবর খোঁড়া হচ্ছে ৷
