অপ্রস্তুত ভঙ্গিতেই কৌশিক রঞ্জনকে ফের প্রশ্ন করল, কিনতে চাও এই ভিডিও ক্লিপ টা?
কৌশিকের এই কথার উত্তর না দিয়ে রঞ্জন তার দিকে প্রতিপ্রশ্ন ছুড়ে দিল — ওই ক্যামেরাতেই আরো একটা ক্লিপ রয়েছে, তাই না কৌশিকবাবু?
রঞ্জনের এই আচমকা প্রশ্নে থতমত খেয়ে গেল কৌশিক ৷ মুখে জবাব এল না ৷ রঞ্জন একই সুরে বলল — দেবযানী বলে একটা মেয়ের ছবি? রয়েছে না ওই ক্যামেরার মেমারিতে?
কৌশিকের কান থেকে সহসাই মেলার সমস্ত চিৎকার মুছে গেল ৷ মনে হল আকাশ ফাটিয়ে রঞ্জন তাকে প্রশ্ন করছে — সুযোগ পেলে নিজের স্ত্রীর নগ্ন শরীরের ছবিও তুমি বিক্রি করতে পারো, তাই না?
একটা সরু ফিতে পেছন থেকে কৌশিকের গলাকে ঘিরে ধরল ৷ একটা ফাঁস পড়ল রেশমি ফিতেটায় ৷ কৌশিকের চোখের কোণ দিয়ে দেখতে পেল সেই আরব্য-রজনীর হুরি তার চুলের ফিতের দুটো প্রান্ত দু-হাতে ধরে দাঁড়িয়ে আছে ৷ ফিতের আচমকা এক টানে কৌশিকের মাথাটা পেছনদিকে হেলে পড়ল ৷
পৃথিবীতে কৌশিকের শেষ মুহূর্তগুলো ভালো কাটেনি ৷
.
সেই সন্ধেবেলায় মুনিয়া দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়েছিল ৷ তার ঠোঁটের কোণে একটা তেতো হাসি ৷
সে ভাবছিল, আজ দুপুরে কে তাকে মুক্তির কথা জিজ্ঞেস করল?
না, রঞ্জন ভট্টাচার্য ৷ যার নিজেরই আচার-আচরণের কোনো স্থিরতা নেই ৷
কিন্তু কত ভালো হত যদি সত্যিই ওই কৌশিক হালদার নামের ঘৃণ্য লোকটাকে কেউ হাপিশ করে দিত ৷
এইসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতেই মুনিয়ার চোখে পড়ল কতগুলো মোটরগাড়ি তুষকাঠি গ্রামে ঢুকছে ৷ চারটে গাড়ির আটটা হেড-লাইটের আলো লাফাতে লাফাতে দুলতে দুলতে ভাঙাচোরা রাস্তা ধরে তাদের বাড়ির দিকেই এগিয়ে আসছে ৷ রেলিং দিয়ে ঝুঁকে পড়ে মুনিয়া দেখল একদম প্রথমে যে কালো টাটা-সুমোটা আসছে সেটা তার চেনা ৷ ওই গাড়িটায় চড়েই সেদিন তারা আসানসোল থেকে তুষকাঠিতে এসেছিল ৷ পরের তিনটে গাড়িই জিপ ৷ পুলিশের জিপ ৷ প্রত্যেকটাতেই কয়েকজন করে খাকি পোশাকের মানুষ বসে আছে ৷
মুনিয়ার আর কিছু বুঝতে বাকি রইল না ৷ সে প্রায় পাখির মতন উড়ে নীচে নামল, এবং দৌড়তে দৌড়তে গিয়ে রাস্তার মোড়েই পুলিশের কনভয়ের সামনে দুহাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল ৷
দ্বিতীয় জিপে ড্রাইভারের পাশেই বসেছিলেন মৃদুল মুস্তাফি ৷ তিনি গাড়ি থেকে নেমে এলেন ৷ মুনিয়া তার সামনে গিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, আমি সব জানি ৷ আগে জানতাম না ৷ আজ একটু আগেই জেনেছি ৷ আপনারা ওকে ধরুন, যা ইচ্ছে তাই করুন ৷ কিন্তু দোহাই আপনাদের, আমার বাবা যেন কিছু জানতে না পারেন ৷ মুনিয়া মৃদুলবাবুকে তার বাবার শারীরিক অবস্থার কথা জানিয়ে কাকুতি মিনতি করতে লাগল ৷
মৃদুল মুস্তাফির চোখের দৃষ্টি সমবেদনায় নরম হয়ে এল ৷ তিনি বললেন, তাহলে আপনার হাজব্যান্ডকে চুপচাপ বেরিয়ে আসতে বলুন ৷ ও গন্ডগোল না করলে আমরাও করব না ৷
কিন্তু ও তো এখন বাড়িতে নেই ৷
মৃদুল মুস্তাফি এবং তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ও.সি. বিপুল সরকার দুজনেই মুনিয়ার এই কথায় সচকিত হয়ে উঠলেন ৷ প্রশ্ন করলেন, বাড়িতে নেই? কোথায় পালাল?
মনে হয় মেলার দিকে গেছে ৷ সন্ধের পর ওখানেই ঘোরাঘুরি করে তো ৷
দ্রুত পায়ে গাড়িতে উঠতে উঠতে মৃদুল মুস্তাফি ও.সি.-কে বললেন, কাজটা ডিফিকাল্ট হয়ে গেল মিস্টার সরকার৷ মেলার মধ্যে থেকে একটা মানুষকে খোঁজা এবং পাকড়াও করা … এর চেয়ে তো খড়ের গাদায় ছুঁচ খোঁজা সহজ ছিল ৷
বিপুল সরকার একটু ইতস্তত করে বললেন, কাজটা অতটা কঠিন হবে না স্যার ৷
কেন? একটু অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করলেন মৃদুলবাবু ৷
আমি আপনাকে জিজ্ঞেস না করেই একটা কাজ করে ফেলেছিলাম ৷ গতকালই দুজন প্লেন ড্রেসের ইনফর্মারকে তুষকাঠি পাঠিয়ে দিয়েছিলাম কৌশিক হালদারকে শ্যাডো করবার জন্যে ৷ আসলে আমি ভেবেছিলাম আমরা আসার আগেই যদি স্কাউন্ড্রেলটা এখান থেকে ভাগবার চেষ্টা করে … ৷
মৃদুল মুস্তাফি নিজের বিরাট হাতের মুঠোর মধ্যে বিপুল সরকারের হাতটা জড়িয়ে ধরে বললেন, ওঃ, বাঁচালেন ভাই ৷ কীভাবে যে আপনাকে ধন্যবাদ দেব ৷
মুনিয়াদের বাড়ির সামনে থেকে রওনা হয়ে পুলিশের গাড়িগুলো মেলার পরিধি ধরে ধীরে এগিয়ে চলল ৷ চলতে চলতে হঠাৎ এক জায়গায় এসে বিপুল সরকার বললেন, দাঁড়ান স্যার ৷ গোষ্ঠ আর শিবু আমাদের দেখতে পেয়েছে ৷ ওই যে, হাত নেড়ে ডাকছে ৷ তারপরে দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে তিনি দৌড়লেন বেদেদের তাঁবুর দিকে ৷ পেছন পেছন বাকি আটজন পুলিশ এবং মৃদুল মুস্তাফি ৷ একজন রোগা মতন লোক উল্টোদিক থেকে দৌড়ে এসে বিপুল সরকারকে স্যালুট করে কিছু বলবার জন্যে মুখ খুলেও থেমে গেল ৷ তারপর জিজ্ঞাসু চোখে মৃদুলবাবুর দিকে তাকাল ৷
বিপুল সরকার তার ইশারা বুঝে বললেন, আরে গোষ্ঠ, উনিই সি. আই. ডি.র অফিসার, মুস্তাফিসাহেব ৷ যা বলবে ওনার সামনেই বলো ৷
স্যর, অদ্ভুত ব্যাপার ৷ সেই সন্ধের মুখে আমাদের পাখি ওই তাঁবুতে ঢুকেছে ৷ তা প্রায় তিন ঘণ্টা হয়ে গেল ৷ তখন থেকে আমি এই তাঁবুর সামনে আর শিবু পেছনে পাহারা দিয়ে বসে আছি ৷ পাখির কিন্তু বেরোবার নামটি নেই ৷
এইরে ৷ তাঁবুর ফাঁকফোকর দিয়ে পালাল না তো?
কী যে বলেন, স্যার? পেছনে তো ধু ধু মাঠ ৷ ওই মাঠ পেরিয়ে মানুষ কেন, একটা বেড়াল হেঁটে গেলেও নজরে পড়ে যাবে ৷ আর শিবু তো ঠায় ওই পেছনের মাঠের দিকে তাকিয়ে বসে আছে ৷
