রঞ্জনের ডাকে দুজন মানুষ তাঁবুর দরজার পর্দা সরিয়ে বেরিয়ে এল ৷ একজন বুড়ো, মুখের চামড়ায় তার অজস্র ভাঁজ, চুলগুলো তুলোর মতন সাদা, কিন্তু শরীরটা পাকা বাঁশের মতন ছিপছিপে আর সটান ৷ আরেকজন বুড়ি ৷ বুড়োর সম্বন্ধে যা যা বলা হল সেই সবই এর সম্বন্ধেও বলা যায় ৷ অর্থাৎ বয়েস হয়েছে প্রচুর, কিন্তু বয়সের ভার কাবু করতে পারেনি ৷
দুজনেরই জামাকাপড় নানা রঙে ছোপানো ৷ বুড়ির পরনে ঘাঘরা জাতীয় পোশাক ৷ বুড়োর লুঙ্গি আর ফতুয়া ৷ দুজনেরই গলায় ছড়ার পর ছড়া রঙিন পাথরের আর পুঁতির মালা ৷ বুড়োর কানে মাকড়ি, বুড়ির গায়ে মোটা মোটা রুপোর গয়না ৷ উপরন্তু বুড়ির হাতে, পায়ে এমনকী গালে আর চিবুকে অবধি অজস্র উলকির ছাপ ৷
ওরা বেদে আর বেদেনি ৷ বেদেদের তাঁবু এটা ৷
বুড়ো আর বুড়ি দলের সর্দার সর্দারনী ৷ রঞ্জনকে যেমন আদর করে ওরা তাঁবুর ভেতরে নিয়ে গেল, তাতে বেশ বোঝা গেল ওদের আলাপ এক-আধ বছরের নয় ৷
বাইরের উজ্জ্বল আলো থেকে তাঁবুর ভেতরে অন্ধকারে ঢুকেই রঞ্জনের চোখে ধাঁধা লেগে গেল ৷ কিছুক্ষণ চোখ পিটপিট করে দৃষ্টিকে সইয়ে নেওয়ার পর সে দেখতে পেল ভেতরের সুপরিসর মাটির মেঝেয় ছেঁড়া কার্পেটের ওপর শুয়ে আছে আরো আট-ন’জন নারী-পুরুষ ৷ সকলেই নিদ্রাতুর ৷ এদের পক্ষে এত বেলা অবধি ঘুমনোটা অস্বাভাবিক নয় ৷ ওরা পেশাগত কারণেই অনেক রাতে ঘুমোয় ৷
রঞ্জন ভয়ঙ্কর উত্তেজিত গলায় বেদেবুড়োর কাছে বলে চলল মুনিয়ার কথা, কৌশিকের বদমাইশির কথা ৷ বুড়ো রঞ্জনের গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে তাকে শান্ত করে প্রশ্ন করল, তুমি কি মুনিয়াকে চাও?
রঞ্জন সংক্ষেপে সম্মতি জানাল ৷
বেদেবুড়ির মুখ হাসিতে ভরে উঠল ৷ সে বলল, চিন্তা কোরো না ৷ ব্যবস্থা হয়ে যাবে ৷
.
রঞ্জন বেদেদের তাঁবুতেই রয়ে গেল ৷ সন্ধে নামল ৷ আগামী বছরের তিনশো পঞ্চান্নখানা অন্ধকার একঘেয়ে সন্ধের কথা ভেবেই যেন মেলার শেষ সন্ধ্যায় দ্বিগুণ তেজে জ্বলে উঠল হ্যাজাক বাতি, গ্যাসের আলো, কুপি আর লণ্ঠন ৷ তবু হেমন্তের কুয়াশা আর পান্ডুর জ্যোৎস্না সমস্ত আলোকেই কেমন যেন নিষ্প্রভ করে দিল ৷ আলোর চেয়ে অনেক বেশি ছায়া ঘুরে বেড়াচ্ছিল মেলার মাঠ জুড়ে — মানুষের ছায়া, গাছের ছায়া, দোকানঘরের চতুষ্কোণ ছায়া, নাগরদোলার ঘূর্ণ্যমান ছায়া ৷
সেই অগণিত ছায়ার মধ্যে ছায়া হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল কৌশিক হালদার ৷ সে খুঁজছিল রঞ্জন নামে ওই গাধাটাকে, যে তার বউয়ের সঙ্গে আজ দুপুরে আশনাই করছিল ৷ বাগানের লেবুগাছের নীচে কেমন জোড়া-পায়রার মতন বসেছিল দুটোতে ৷ ওর কাঁধে মাথা রেখে বসেছিল মুনিয়া ৷ কী আমার সাধের নাগর রে! শালা চুমুটা খেল না কেন? সাহস পেল না?
কৌশিক পকেট থেকে হাতের মুঠোর মাপের ছোট্ট ডিজিটাল-ক্যামেরাটা বার করল ৷ তারপর একটু ফাঁকা জায়গা খুঁজে নিয়ে চোখ রাখল স্ক্রিনে ৷ পেছনদিক থেকে তোলা মুনিয়া আর রঞ্জনের ছবি ৷ আঃ, চুমুটা খেলে কত চমৎকার হত গল্পটা ৷ কপালটাই খারাপ ৷
কৌশিক ভিডিও রেকর্ডিং-এর সাউন্ডটা একটু বাড়িয়ে কানের সঙ্গে স্পিকারটা সেঁটে ধরল ৷ পরিষ্কার শুনতে পেল কথোপকথন—মুনিয়া, তুই কি কৌশিকের হাত থেকে মুক্তি চাস?
— চাই ৷
খ্যাঁক করে কিছুক্ষণ আপনমনে হাসল কৌশিক হালদার ৷ আরে বাবা, মুক্তিপণ না দিয়েই মুক্তি চাইবি? তাই কি হয়?
এই কথাটাই ওই রঞ্জনকে জিজ্ঞেস করবে বলে তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে কৌশিক ৷ তার বউয়ের প্রেমিককে ৷ সে একটা প্রস্তাব দেবে রঞ্জনকে …
কিছুক্ষণের মধ্যেই কৌশিক রঞ্জনকে দেখতে পেল ৷ বেটা একটা বড় রংচঙে তাঁবুর পেছনদিকে দাঁড়িয়ে রয়েছে ৷ সঙ্গে অবিকল আরব্যরজনীর বইয়ের পাতা থেকে উঠে আসা একটা হুরি ৷ সেইরকমই ঢোলা পাজামা, যার পায়ের গোছের কাছটা চাপা; সেইরকমই খাটো কামিজের নীচে বেরিয়ে থাকা সরল তলপেট আর গভীর নাভি; সর্বোপরি সেইরকমই ছুরির ফলার মতন ঝিকমিকে দুই চোখের মণি ৷
কৌশিক নিজের মনে বলল, ওরে বাবা! গুরুদেব তো দেখছি অনেক ওপর তলার মাগিবাজ ৷ দুপুরে মুনিয়া, সন্ধেবেলায় ইরানী বুলবুলি!
আরে, গুরুদেব নিজেই তো আমাকে হাত নেড়ে ডাকছে দেখছি ৷ সঙ্গে মেয়েটাও চোখ মারল মনে হল না? জয় গুরু ৷ দেখা যাক লাক আজকে কোথায় নিয়ে যায় ৷ — কৌশিক ওই বেদে মেয়েটা আর রঞ্জনের পেছনে পেছনে মাথা নিচু করে তাঁবুর ভেতরে ঢুকল ৷
তাঁবুতে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে ঝাঁঝালো একটা গন্ধ যেন হিংস্র জন্তুর মতন কৌশিকের ঘাড়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল ৷ এ যাবৎ চেনা সমস্ত গন্ধের থেকে আলাদা সেই গন্ধ ৷ কীসের গন্ধ এটা? কোনো ফুল? আতর? যাই হোক, সেই গন্ধের দাপটে কৌশিক কেমন যেন ঝিমিয়ে পড়ল ৷ যেভাবে রঞ্জনকে খেলিয়ে ডাঙায় তুলবে বলে ভেবেছিল, কৌশিক সেভাবে কথা শুরু করতেই পারল না ৷ সে সরাসরি ভিডিও ক্যামেরার স্ক্রিনে রঞ্জন আর মুনিয়ার ছবিটা দেখিয়ে রঞ্জনকে প্রশ্ন করল, এই ছবিটা তুষকাঠির লোকেরা দেখলে তোমাকে আর সাধক বলে ভক্তি করবে?
না ৷ করবে না ৷ — ঘাড় নাড়ল রঞ্জন ৷
কৌশিক বুঝতে পারল কোথাও একটা গোলমাল হচ্ছে ৷ রঞ্জনের তো এতটা নির্বিকার থাকবার কথা নয় ৷ তার তো ভয় পাবার কথা ছিল ৷ তার জায়গায় ওর চোখে মুখে যে ভাবটা ফুটে উঠেছে সেটা ঘেন্নার, রাগের ৷
