যাঁদের পড়াশোনা বেশি, তাঁরা বলেন ইরানী তুরানী লোককথার গল্প ওসব ৷ এই বেদেরাও আদিতে ইরানী ৷ মনে হয় কথাটা সত্যি ৷ এত দারিদ্রের মধ্যেও এই বেদে নারী-পুরুষদের শরীরের সৌন্দর্য দেখবার মতন ৷ ওদের পাকা গমের মতন গায়ের রং, টানা টানা নাক চোখ, আর ঈষৎ বাদামি চুলের মধ্যে মধ্য-এশীয় লক্ষণাবলি ভারী স্পষ্ট ৷ অবশ্য ওদের এ ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞেস করলে ওরা বলে, ওরা না কি রাজা ভোজের বংশধর — সেই রাজা ভোজ, যাঁর নাম থেকে ম্যাজিকের আরেক নাম ভোজবাজি ৷ সেই অর্থে পুতুলনাচ দেখানোটা ওদের ধর্ম ৷ ওরাও একধরনের সাধক ৷ এবং তুষকাঠিতে আগত অন্যান্য গৌণ ধর্মের লোকেদের মতন ওরাও ভারী রহস্যময় ৷
যেমন ধরা যাক এই ব্যাপারটাই যে, শরীর নিয়ে ওদের কোনো ছুঁৎমার্গ নেই ৷
বেদে পরিবারের যুবতীরা মেলায় আগত রসিক পুরুষদের কাছে বহুদিন ধরেই আনন্দের উৎস ৷ অবশ্য শুধু রসিক হলেই হবে না, অর্থবানও হতে হবে ৷ সুন্দরী এবং কামকলায় নিপুণা ওই মেয়েদের একধরনের স্বর্গবেশ্যা বলা চলে৷ ওদের জন্যে বিগত যুগে বহু শ্রেষ্ঠী এবং সামন্তরাজা রাতের অন্ধকারে ছদ্মবেশে মেলায় এসেছে বলে শোনা যায় ৷ যারা সোনার মোহরে তাদের মূল্য চোকাতে পারে তেমন কেউ কেউ আজও আসে ৷
রঞ্জন অবশ্য শরীরের টানে আসে না, আসে মনের টানে ৷ তার ভালো লাগে, বসে বসে বেদে বুড়োর মুখে অস্পষ্ট ভাষার নানান অলৌকিকের কথা শুনতে ৷ শুনতে শুনতে তার মনে হয় এই দৃশ্যমান জগতের বাইরে সমান্তরাল অন্য এক জগৎ আছে ৷ এই দুই জগতের মধ্যে বেদেদের হামেশাই যাতায়াত ৷ মাঝে মাঝে রঞ্জন সন্ধেবেলা অবধি থেকে যায় বেদেদের তাঁবুতে ৷ পালা শুরু হলে সেও বেদে পুরুষদের সঙ্গে পুতুলগুলোকে মাথার ওপর চাগিয়ে তুলে এদিক-ওদিক ছুটে ছুটে তাদের নাচিয়ে বেড়ায় ৷ তখন তার মধ্যে পাগলামির কোনো লক্ষণ খুঁজে পাওয়া যায় না ৷ এই সব কারণে রঞ্জন বেদেদের দলের দারুণ প্রিয় ৷ সাধারণত ওরা গৃহী সমাজকে এড়িয়ে চলে ৷ তবে রঞ্জনকে দেখেই ওরা বোঝে যে এ ঘরে থাকলেও গৃহী নয় ৷ এর ঘর পুড়ে গেছে ৷ নেহাত দুবেলা দুমুঠো ভাতের টানে বাঁধা পড়ে আছে তুষকাঠিতে ৷ না হলে এই ছেলেটাও মনে মনে তাদেরই মতন যাযাবর ৷
হঠাৎ পেছন থেকে কে যেন রঞ্জনের কাঁধে হাত রাখে ৷ রঞ্জন চমকে ওঠে ৷ ফিরে তাকায় ৷ দেখে, যার কথা ভাবছিল সে-ই এসে দাঁড়িয়েছে—মুনিয়া ৷
রঞ্জন দেখে, মুনিয়ার মুখটা কাগজের মতন সাদা ৷ চোখদুটো বিস্ফারিত ৷ এক মুহূর্তে রঞ্জনের মাথার মধ্যে থেকে মেঘ কেটে যায় ৷ সে লাফ দিযে দাঁড়িয়ে উঠে মুনিয়াকে জড়িয়ে ধরে ৷ বুঝতে পারে, মুনিয়া থরথর করে কাঁপছে ৷ রঞ্জন দুহাতে মুনিয়াকে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে জিজ্ঞেস করে, কী হয়েছে মুনিয়া? এত ভয় পেয়েছিস কেন? কী হয়েছে?
মুনিয়া তার আঁচলের আড়াল থেকে কৌশিকের সেল-ফোনটা বার করে ৷ তারপর দেবযানীর ছবিটা রঞ্জনকে দেখায় ৷ বলে যায় কৌশিক নামে এক অমানুষের কাহিনি ৷
শুনতে শুনতে রঞ্জনের মাথার মধ্যে মেঘটা আবার ফিরে আসে ৷ তার চিন্তাশক্তি আবিল হয়ে যায় ৷ এত জটিলতা তার ভালো লাগে না ৷ তার ভালো লাগে অজয়ের বিস্তীর্ণ বালুচরে দুটো কাদাখোঁচা পাখির ভালোবাসাবাসি দেখে দুপুর কাটাতে ৷ তার ভালো লাগে রাতের অন্ধকারে তুষকাঠির কূর্মপীঠে ঘুরে ঘুরে হঠযোগীদের ক্রিয়াকলাপ দেখতে ৷ কিন্তু এসব কোন পৃথিবীর কথা বলে যাচ্ছে এই মেয়েটা? ল্যাংটো ছবি! আত্মহত্যা! রঞ্জনের মাথার মধ্যে এক জ্বলন শুরু হয় ৷ সে বেশ জোরেই বলে ওঠে — মুক্তি চাস? মুনিয়া, তুই কি তোর বরের হাত থেকে মুক্তি চাস?
এ প্রশ্নের উত্তর দেবার জন্যে মুনিয়াকে এক মুহূর্তও ভাবতে হল না ৷ সে উত্তর দিল — চাই ৷
.
রাতের মেলার সঙ্গে দুপুরবেলার মেলার চেহারার মিল খুঁজে পাওয়া দুষ্কর ৷
আলোয়, গানে, হাজার গলার চিৎকারে, নাগরদোলার ক্যাঁচকোঁচ শব্দে, ভেঁপুর ফুঁ-য়ে, জিলিপির কড়াই থেকে ওঠা সস্তা তেলের গন্ধে, কার্বাইড ল্যাম্পের গ্যাসের গন্ধে, আর সর্বোপরি মানুষের পায়ে পায়ে ওড়া ধুলোর মেঘে সন্ধে থেকে রাত যে মেলা ভরে থাকে, এখন এই দুপুরে তার কিছুই নেই ৷
মুনিয়ার শেষ কথাটা মাথায় নিয়ে ভরদুপুরের সেই ঘুম-ঘুম মেলার মাঠ ধরে হেঁটে যাচ্ছিল রঞ্জন — একাই ৷
একটা উন্মাদ ক্রোধ তাকে একরকম ছুটিয়ে নিয়ে চলেছিল ৷ মনে মনে সে জপছিল — খারাপ লোক, খারাপ লোক ওই কৌশিক হালদার ৷ ও আমার মুনিয়াকে কষ্ট দিচ্ছে ৷ ও মুনিয়াকে মেরে ফেলবে ৷
কীভাবে সে কৌশিকের হাত থেকে মুনিয়াকে রক্ষা করবে, তার কোনো ধারণা রঞ্জনের ছিল না ৷ তবে যে-কোনো সংকটে সে যার কাছে যায়, এখনও সে তার কাছেই চলেছিল ৷ তার হয়ে যা কিছু করার সেই করবে ৷ সেই মুনিয়াকে রক্ষা করবে, মুক্তি দেবে সব অপমান আর কষ্টের হাত থেকে ৷
রঞ্জনের হেঁটে যাওয়াটা তাই দিশাহীন ছিল না ৷ দেখলেই বোঝা যাচ্ছিল, লক্ষ্য স্থির রেখেই সে হাঁটছে ৷
হাজার পাগলামির মধ্যেও সে যেমন জল খেতে ভোলে না, খিদে পেলে ভাত খেতে ভোলে না, সেরকমই ভোলে না এই মেলার পথঘাট ৷
অতএব নির্ভুলভাবে সে হেঁটে চলল মেলার পূর্ব-সীমানার দিকে এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে গেল বিরাট এবং অদ্ভুত এক তাঁবুর সামনে ৷ এমন নানান রঙের কাপড়ে বোনা তাঁবু গোটা মেলায় আর একটাও নেই, যদিও বয়সের ভারে রংগুলো জ্বলে গেছে ৷ তাঁবুটার বাইরে, সামনের দিকে, উঁচু একটা স্টেজ বাঁধা রয়েছে ৷
